• শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ১২:০০ অপরাহ্ন

সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বেপজার আওতায় আসছে

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) থেকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীকে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে আনার জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি রোডম্যাপ প্রণয়নে কাজ করছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ে আগামী এক মাসের মধ্যে কমিটির সুপারিশপত্র জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা জানান, বিনিয়োগ কাঠামো একীভূতকরণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বেপজা ইতোমধ্যে ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (CETP) সফলভাবে পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে সাভার শিল্পনগরী বেপজার তত্ত্বাবধানে গেলে পরিবেশ সুরক্ষা, প্রশাসনিক সমন্বয় ও রপ্তানিযোগ্য মান উন্নয়নে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কমিটির প্রধান ও বেজা-র নির্বাহী সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “একটি সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি গঠনের কাজ চলছে। এখানে প্রশাসনিক, আইনি, আর্থিক ও পরিচালন—এই চারটি স্তরে বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হবে।” তিনি আরও জানান, কমিটির রিপোর্ট শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হলে মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। সরকারের পক্ষ থেকে বেপজাকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে।

নজরুল ইসলাম জানান, এটি ছিল কমিটির পঞ্চম সভা। “আমরা ইতোমধ্যে অগ্রগতি অর্জন করেছি এবং চলতি মাসেই সুপারিশপত্র জমা দেব,” তিনি বলেন।

বিডার গবেষণা অনুযায়ী, সাভার শিল্পনগরীতে কার্যকর সিইটিপি না থাকায় স্থানীয় ট্যানারি থেকে অনেক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল সংগ্রহ করে না। এতে দেশীয় চামড়া খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং বিদেশ থেকে চামড়া আমদানিতে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়।

প্রায় দুই মাস আগে শিল্প মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ফলো-আপ সভায় এই প্রকল্প হস্তান্তরের রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা বলেন, চামড়া রপ্তানি বাড়াতে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (LWG) সনদ পাওয়া জরুরি, যা কার্যকর সিইটিপি ছাড়া সম্ভব নয়।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, “রপ্তানি ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় যে সংস্থা সিইটিপি দক্ষভাবে পরিচালনা করতে পারে, সেটিকেই দায়িত্ব দেওয়া উচিত।”

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১,১৪৫.০৭ মিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে (ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস, ২০২২) এই খাতের আকার ৪৪০.৬৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৩৮.৬১ বিলিয়নে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতি সহায়তা ও পরিবেশমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করা সম্ভব।

২০০৩ সালে পরিবেশবান্ধব ট্যানারি শিল্প গড়ে তুলতে বিসিক সাভারে শিল্পনগরী স্থাপনের প্রকল্প নেয়। সেখানে সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি), স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) এবং ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ২০০৫ সালে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বারো দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ব্যয় ১৭৫ কোটি থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১,০১৫ কোটি টাকা।

প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও কমন ক্রোম রিকভারি ইউনিট সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হয়নি, আর কঠিন বর্জ্য পুনঃব্যবহারের উদ্যোগও সফল হয়নি। এসব কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র মেলেনি, ফলে এলডব্লিউজি সনদ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি অধিকাংশ ট্যানারি।

বিডার ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ স্থানীয় ট্যানারি পরিবেশ ছাড়পত্র বা এলডব্লিউজি সনদ না পাওয়ায় বিদেশ থেকে ফিনিশড লেদার আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমানে ১৬২টি বরাদ্দপ্রাপ্ত ট্যানারির মধ্যে ১৪০টি চালু রয়েছে, যেখানে ওয়েট ব্লু, ক্রাস্ট ও ফিনিশড লেদার উৎপাদিত হয়।

সনদ না থাকায় ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের কাছে রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না; ফলে ট্যানারিগুলো বাধ্য হচ্ছে চীনসহ অন্যান্য বাজারে ৫০–৬০ শতাংশ কম দামে পণ্য বিক্রি করতে।

এলডব্লিউজির তথ্যমতে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান এই সনদ পেয়েছে—এর মধ্যে রয়েছে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, এবিসি লেদার, রিফ লেদার, এসএএফ ইন্ডাস্ট্রিজ, পাইওনিয়ার সাইমন ট্যানিং বিডি লিমিটেড, সুপারএক্স লেদার, সং শিন লেদার (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড ও অস্টিন লিমিটেড।

সাভার চামড়া শিল্পনগরী বেপজার অধীনে গেলে পরিবেশগত মান, রপ্তানি যোগ্যতা এবং শিল্প ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ফিরে পেতে পারে।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১