• রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ১০:৩৩ অপরাহ্ন

প্যারেন্ট স্টক আমদানিতে শর্ত: ৫০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি খাতে শঙ্কা

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মুরগির প্যারেন্ট স্টক আমদানিতে শর্ত ও বিধিনিষেধ যুক্ত করে জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা–২০২৬ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে সরকার। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নীতিমালাটি বর্তমান কাঠামোয় চূড়ান্ত হলে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার দেশের পোল্ট্রি শিল্প সীমিত কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়তে পারে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ভোক্তা পর্যায়ে ডিম ও মুরগির মাংসের দামে অস্থিরতা তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং ধাপে ধাপে আমদানিনির্ভরতা কমানোই এ নীতিমালার লক্ষ্য। তবে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব উৎপাদন কাঠামো, বাজার সক্ষমতা এবং রোগবালাই ঝুঁকি বিবেচনায় না নিলে ভালো উদ্দেশ্য থেকেও নেতিবাচক ফল আসতে পারে।

নীতিমালার ধারা নিয়ে প্রশ্ন

গত ২২ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নীতিমালার খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, কেবল একদিন বয়সী গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক ও বাচ্চার সংকট দেখা দিলে বিশেষ ক্ষেত্রে প্যারেন্ট স্টক বাচ্চা আমদানির সুযোগ থাকবে।

তবে ‘সংকট’ বা ‘ক্ষেত্রবিশেষ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, কোন ধরনের প্যারেন্ট স্টক (ব্রয়লার, লেয়ার বা কালার বার্ড) এর আওতায় পড়বে—তা স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতাকেই বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

উৎপাদন কাঠামোয় কেন্দ্রীকরণের আশঙ্কা

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে ব্রয়লার, লেয়ার ও কালার বার্ড উৎপাদন হয়। এর মধ্যে লেয়ার ও কালার বার্ডের প্যারেন্ট স্টক প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। ব্রয়লারের ক্ষেত্রে ১৯টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত থাকলেও বাস্তবে কয়েকটি বড় কর্পোরেট গ্রুপের হাতেই অধিকাংশ উৎপাদন কেন্দ্রীভূত।

বর্তমানে ৫ থেকে ৬টি বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্যারেন্ট স্টকের বড় অংশ সরবরাহ হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই প্যারেন্ট স্টক সংগ্রহ করে তিন শতাধিক ব্রিডার ফার্ম একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন করে। ফলে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে রোগবালাই বা উৎপাদন বিঘ্ন ঘটলে সারাদেশে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে প্রতিযোগিতা সীমিত হলে মূল্য নির্ধারণেও একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হতে পারে। এতে হ্যাচারি ও খামারিদের নির্ধারিত দামে প্যারেন্ট স্টক কিনতে বাধ্য হতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত ডিম ও মুরগির মাংসের বাজারে প্রভাব ফেলবে।

সংকট মোকাবিলায় সময়ের বাধা

প্যারেন্ট স্টক আমদানির পুরো প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদন সক্ষম হতে প্রায় দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগে। ফলে আমদানির পথ সংকুচিত হলে আকস্মিক সংকট দ্রুত মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মত খাতসংশ্লিষ্টদের।

তাদের প্রশ্ন, দেশে উদ্বৃত্ত থাকলে একদিন বয়সী ব্রয়লার বাচ্চার দাম কেন কখনও ৬০–৭০ টাকা এবং লেয়ার বাচ্চা ১০০ টাকায় পৌঁছায়? বাস্তব সরবরাহ ও পরিসংখ্যানের মধ্যে ফারাক থাকায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।

উৎপাদন ও চাহিদার হিসাব

সরকারি তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৮৭ লাখ প্যারেন্ট স্টক উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। মোট চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ। অর্থাৎ ঘাটতি পূরণে আনুমানিক ১৬ লাখ প্যারেন্ট স্টক আমদানি প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমদানিতে সম্পূর্ণ বিধিনিষেধ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

ভারসাম্যপূর্ণ নীতির দাবি

খামারি ও উদ্যোক্তাদের মতে, বাচ্চার দামে স্থিতিশীলতা ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সীমিত পরিসরে হলেও আমদানির সুযোগ রাখা জরুরি। হঠাৎ রোগবালাই বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হলে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।

বিশ্লেষকদেরও মত, আমদানিতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে, তবে ঘাটতি পূরণের বাস্তবসম্মত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা রাখা উচিত। নতুন উদ্যোক্তাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থাও জরুরি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পোল্ট্রি খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, নীতিমালাটি যেন প্রতিযোগিতাবান্ধব, স্বচ্ছ ও বাস্তবভিত্তিক হয়—সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

পোল্ট্রি শিল্প দেশের প্রাণিজ আমিষের একটি বড় উৎস এবং লাখো খামারির জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাজারের ভারসাম্য, উৎপাদন সক্ষমতা ও ভোক্তা স্বার্থ—সবকিছুর সমন্বিত বিবেচনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১