• বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২২ অপরাহ্ন

শাওয়াল মাসে মুমিনের করণীয়

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬

রমজান মুসলমানদের জীবনে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের এক অনন্য প্রশিক্ষণের মাস। এক মাস সিয়াম সাধনা, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে একজন মুমিন তার জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ পান। কিন্তু রমজান শেষ হলেই কি সেই ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সাধনা শেষ হয়ে যাবে? কুরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ইবাদত কেবল কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়, বরং তা আজীবনের দায়িত্ব।

সূরা হিজরের ৯৯ নম্বর তথা শেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলার ভাষ্য, ‘আর তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করতে থাকো, যতক্ষণ না তোমার কাছে নিশ্চিত বিষয় (মৃত্যু) আসে।’

এই আয়াত থেকে আমরা ইবাদতের ধারাবাহিকতার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। তা ছাড়া কুরআনের সূরা যারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আমি জ্বিন এবং মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে তৈরি করিনি।’
অর্থাৎ আল্লাহ মানব জাতি এবং জ্বিন জাতিকে কেবল তার হুকুম পালন করার জন্যই তৈরি করেছেন। আর সেটা কখন করবে? জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত।

হাদিস শরীফে আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেই আমল, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

তাই রমজানের পরবর্তী মাস শাওয়াল মূলত সেই ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

ছয়টি নফল রোজা:

ইবাদতের ধারাবাহিকতায় রক্ষায় প্রথমেই সামনে আসে শাওয়ালের ছয়টি রোজার বিষয়। এই ছয়টি রোজা নফল হলেও এর গুরুত্ব অনেক। মহানবী (সা.) এ বিষয়ে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন।

রাসূল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)।

রমজানের এক মাস রোজার সঙ্গে শাওয়ালের ছয় রোজা যুক্ত হলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তাই ঈদের আনন্দের মধ্যেও একজন সচেতন মুমিন সুযোগমতো এই ছয়টি রোজা রাখার চেষ্টা করেন।

তবে আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। অনেক সময় অসুস্থতা, সফর বা বিশেষ কারণে নারীরা রমজানের কিছু রোজা রাখতে পারে না । শাওয়াল মাসে তাদের প্রথম করণীয় হলো সেই কাজা রোজাগুলো আদায় করা। মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, শাওয়ালের ৬ নফল রোজা রাখার আগে ফরজ রোজার কাজা আদায় করে নেওয়া উত্তম। কারণ, ফরজ আমলের গুরুত্ব নফল আমলের চেয়ে অনেক বেশি।

ধারাবাহিকতা রক্ষা করা:

এরপর নিয়মিত নামাজ ও নফল ইবাদতে যত্নবান হওয়া শাওয়াল মাসের গুরুত্বপূর্ণ করণীয়। রমজান মাসে মুসলমানরা মসজিদমুখী হন, জামাতে নামাজ পড়েন এবং নফল ইবাদতে বেশি সময় দেন। কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের মধ্যে সেই আগ্রহ কমে যায়। অথচ মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেই আমল যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়” (বুখারী: ৬৪৬৫)। তাই একজন মুমিনের উচিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা এবং সুযোগমতো নফল নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

কুরআনের হক আদায় করা:

রমজান মাস কুরআন নাযিলের মাস। এই মাসে মুসলমানরা বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করেন এবং এর শিক্ষা উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন। এই মাসে ছোট বড় সবাই কুরআন তিলাওয়াতে কম-বেশ মনোনিবেশ করেন। কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার পর তাদের অনেকেই কুরআনকে ভুলে যান। যা একজন মুমিনের জন্য কখনো সমিচিন নয়। কুরআন আল্লাহর কথা। এর একটি নাম হলো যিকির। এই যিকির ভুলে গেলে আল্লাহর পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ সূরা ত্বহার ১২৪ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘আর যে আমার স্মরণ (কুরআন) থেকে বিমুখ হবে, অবশ্যই তার জীবনযাপন হবে সংকুচিত (সংকীর্ণ) এবং আমি কিয়ামতের দিন তাকে অন্ধ অবস্থায় উঠাব’। এই আয়াতে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা এবং কুরআন থেকে দূরে থাকার ভয়াবহ পরিণতির কথা সতর্ক করা হয়েছে, যার মধ্যে দুনিয়ার দুশ্চিন্তা ও কবরের আযাব অন্তর্ভুক্ত।

তাই কুরআন তিলাওয়াত অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন নিজেই মানুষকে আল্লাহর স্মরণে থাকতে আহ্বান জানায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কুরআন মানুষকে সেই পথ দেখায় যা সবচেয়ে সঠিক” (সুরা আল-ইসরা: ৯)। তাই রমজান শেষ হওয়ার পরেও যদি প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন তিলাওয়াতে ব্যয় করা যায়, তবে তা একজন মুমিনের জীবনে নৈতিকতা ও আল্লাহভীতি জাগ্রত রাখতে সহায়তা করে।

সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ রাখা:
বেশি বেশি জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণে রাখা মুমিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর” (সুরা আল-আহযাব: ৪১)। জিকির মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং তাকে পাপ থেকে দূরে রাখে।

মহানবী (সা.) প্রায়ই আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকতেন এবং সাহাবিদেরও তা করতে উৎসাহিত করতেন। “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” ও “আস্তাগফিরুল্লাহ”—এই ছোট ছোট জিকিরগুলো মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে এবং তাকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে এগিয়ে দেয়।

খোদাভীতি ধরে রাখা:
তাকওয়া বা খোদাভীতি হলো রমজান মাসের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য হাসিল করতে একজন মুমিন রমজান মাসে যে পরিমাণ সময় ও শ্রম দেয় তা রমজান পরবর্তী মাসগুলোতে ধরে রাখাও তাঁর কর্তব্য। শাওয়াল মাসের অন্যতম শিক্ষা হলো রমজানের ভুল ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে আরো বেশি করে মাফ চাওয়া এবং তাক্বওয়ার পথ অবলম্বন করা।

রমজানের রোজার মূল উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহভীতি অর্জন করা। তাই যদি রমজান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পাপ ও অন্যায়ের পথে ফিরে যায়, তবে রোজার প্রকৃত শিক্ষা বাস্তবায়িত হয় না। শাওয়াল মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্য, ন্যায় ও সততার পথে চলাই একজন মুমিনের আসল পরিচয়।

ধৈর্য্য ও সহমর্মিতা:
রমজানের শিক্ষা জীবনে ধরে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রমজান আমাদের ধৈর্য, আত্মসংযম ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করে আমরা দরিদ্র মানুষের দুঃখ বুঝতে শেখায়। মূলত এর মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্র একটা শিষ্টাচারের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখায়। এই শিক্ষা কেবল রমজানের জন্য নয়; বরং সারা বছরের জন্য।

অতএব, শাওয়াল মাস একজন মুমিনের জন্য নতুন এক আত্মিক যাত্রার সূচনা। ঈদের আনন্দের মধ্যেও এই মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইবাদত, নেক আমল ও তাকওয়ার পথ কখনো শেষ হয় না। যদি আমরা শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা পালন করি, নিয়মিত নামাজ ও নফল ইবাদতে মনোযোগ দিই, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করি, বেশি বেশি জিকির ও দোয়া করি এবং তাকওয়ার জীবনধারা বজায় রাখি, তবে রমজানের শিক্ষা আমাদের জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। আর তখনই রমজান প্রকৃতভাবেই আমাদের কাছে সফলতার প্রতীক হিসেবে ধরা দেবে। ব্যক্তি ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন…

লেখক: হাফেজ মাওলানা কামাল হোসাইন


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০