• বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৭ অপরাহ্ন

গ্যাস সংকটে নগরজীবন বিপর্যস্ত

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।

সম্প্রতি একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট। ফলে বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। এতে দৈনিক চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ, যা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো প্রায় ৪৫ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) রফিকুল ইসলাম বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। টার্মিনালটি মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। তবে চলতি মাসের মধ্যে এটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই, আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনালটি পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেছেন, তিতাসের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। তবে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বর্তমানে তারা পাচ্ছে মাত্র ১২০ কোটি ঘনফুটের মতো।

তিনি বলেন, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ফলে চাহিদার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং শিল্প, আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে এর প্রভাব পড়ছে।

কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান আরও জানান, বন্ধ থাকা টার্মিনালটির মেরামত কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না। টার্মিনালটি পুনরায় চালু হলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেছেন, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন।

তার মতে, বাংলাদেশে গ্যাসের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিয়ে আমদানিনির্ভর নীতির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার ও এলএনজি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে।

ইজাজ হোসেইন আরও বলেন, সরকার ইতোমধ্যে নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এ ধরনের উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া হলে বর্তমান গ্যাস সংকট অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব হতো। দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়াতে পারলে সরবরাহ ঘাটতি কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হতো বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায়। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে রাজধানীর একের পর এক সিএনজি স্টেশন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে দিনের বড় একটি সময় গ্যাস না থাকায় রান্নাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক স্টেশন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। কোথাও সীমিত পরিসরে সরবরাহ চালু থাকলেও দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।

গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্যাক্সিক্যাব ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও অনেকেই গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে তাদের দৈনিক আয় কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ধানমন্ডির এক সিএনজিচালক বলেন, আগে দিনে একবার গ্যাস নিয়ে সারাদিন গাড়ি চালানো যেত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় গ্যাস পাওয়া যায় না। এতে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ট্যাক্সিক্যাব চালক মিজান বলেন, গ্যাসের অভাবে নির্ধারিত ট্রিপ বাতিল করতে হচ্ছে। যাত্রী ফিরিয়ে দিতে হওয়ায় চালক ও যাত্রী-উভয়ই ভোগান্তিতে পড়ছেন।

গ্যাস সংকটের ফলে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন আবাসিকের গ্রাহকেরা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাস থাকছে না। ফলে রান্নাবান্নাসহ আনুষাঙ্গিক কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা গৃহিণী জলি বলেন, সারাদিনেই চুলায় কোনো গ্যাস থাকে না। উপায় না পেয়ে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। আর যদি রাতে গ্যাস আসে, তখন রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে।

মিরপুরের বাসিন্দা মাহফুজা বলেন, সকালে চুলা জ্বলে না, দুপুরেও একই অবস্থা। রাতে সামান্য গ্যাস এলে তখন রান্না করতে হয়। একটি তরকারি রান্না করতেও অনেক সময় লাগছে।

অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক হিটার, ইনডাকশন চুলা কিংবা এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। এতে বাড়তি ব্যয়ের চাপও বাড়ছে।

গ্যাসের স্বল্পচাপের প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানাতেও। অনেক কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। কোথাও সীমিত পরিসরে উৎপাদন চললেও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এদিকে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলো থেকে রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি কমে গেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন সব শ্রেণির গ্রাহক গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপের মুখে থাকবেন।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দেশের চলমান গ্যাস সংকট স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে।

তিনি বলেন, একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে এলএনজি খালাস ব্যাহত হয়েছে। ফলে দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামতের কাজ চলছে। তবে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এলএনজি কার্গো খালাস সম্ভব হবে না। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রান্নার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাতেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার