দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় আমানতের অর্থ উত্তোলনের জন্য আবেদন নেওয়া শুরু হয়েছে। কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই প্রায় ১৮ হাজার গ্রাহক আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা উত্তোলনের চাহিদা জানিয়েছেন তারা।
আবেদনকারীদের মধ্যে ২ হাজার ৩৬৭ জন একবারে নিজেদের পুরো আমানত ফেরত চেয়েছেন। তাদের আবেদনে মোট ২৪৪ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। গ্রাহকদের চাহিদা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে আমানত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গত ১ সেপ্টেম্বর থেকেই ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় আমানতকারীদের উপস্থিতি দেখা যায়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি নিজ নিজ হিসাব থেকে কত টাকা উত্তোলন করতে চান, সেটিও আবেদনে উল্লেখ করেন তারা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবেদন যাচাই-বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত শেষে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে।
দীর্ঘদিন ধরে টাকা উত্তোলনে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্বেগে থাকা গ্রাহকদের অনেকেই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি হয়েছে। এক আমানতকারী বলেন, প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি এই ব্যাংকে আমানত রেখে আসছেন। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও ভালোভাবে পরিচালিত হবে বলে প্রত্যাশা তার।
প্রথম দিন শাখাগুলোতে গ্রাহকদের বড় ধরনের ভিড় হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হলেও বাস্তবে তেমন চাপ দেখা যায়নি। সকাল থেকেই বিভিন্ন শাখার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। আবেদন গ্রহণ, তথ্য যাচাই এবং গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়গুলো তারা সরাসরি তদারকি করেন।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে সরকারের ঘোষণার পর গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে। এখন সেই আস্থা ধরে রাখাই ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নির্ধারিত নিয়ম মেনে আবেদন গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমানত ফেরতের প্রস্তুতিও চলছে।
একজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, সরকার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে স্বাভাবিক লেনদেনের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
অন্য এক কর্মকর্তা জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলনের আবেদন নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানত ফেরত দেওয়ার যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকদের চাহিদার ভিত্তিতে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে।
ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা বলেন, নির্ধারিত ফরমে গ্রাহকরা তাদের হিসাব থেকে কত টাকা উত্তোলন করতে চান, তা উল্লেখ করে আবেদন করছেন। আবেদনগুলো প্রক্রিয়াজাত করার পর ৭ সেপ্টেম্বর থেকে অর্থ পরিশোধ শুরু হবে। কোন গ্রাহক কোন তারিখে টাকা পাবেন, তা পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে জানিয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে, গ্রাহকদের আবেদনের ভিত্তিতে কত অর্থের প্রয়োজন হবে, তা নিরূপণ করবে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অর্থের চাহিদা নির্ধারণের পর সেই অনুযায়ী জোগানের পরিকল্পনা করা হবে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া আবেদনের ভিত্তিতে যে পরিমাণ অর্থের চাহিদা তৈরি হবে, সেই অনুযায়ী জোগানের পরিকল্পনা করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সহায়তার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তাই জনগণের স্বার্থ ও আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যাংকগুলোকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। গ্রাহকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিও যথাযথভাবে রক্ষা করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা ছিল, আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তা অনেকটাই কমবে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু হলে ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থাও আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।