সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতের ওপর আরোপিত তথাকথিত ‘হেয়ারকাট’ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং মুনাফাসহ আমানত ফেরতের দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা। তারা এই সিদ্ধান্তকে শরিয়াহবিরোধী, চুক্তিভঙ্গ এবং আমানতকারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে অভিযোগ করেন।
রোববার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনে শতাধিক আমানতকারী অংশ নেন। এ সময় তারা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফায় কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত বাতিল, সব ধরনের হিসাবের টাকা মুনাফাসহ ফেরত এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেন কার্যক্রম দ্রুত চালুর দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের এক প্রজ্ঞাপনে জানায়—২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না। পরবর্তীতে ২১ জানুয়ারি নতুন প্রজ্ঞাপনে মাত্র ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার কথা বলা হয়। বক্তাদের মতে, ব্যাংকে আমানত রাখা একটি লিখিত ও অলিখিত চুক্তির অংশ, যেখানে নির্দিষ্ট শর্তে মুনাফা প্রদানের নিশ্চয়তা থাকে। হঠাৎ করে সেই চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করা আইন, নৈতিকতা ও প্রচলিত ব্যাংকিং রীতিনীতির পরিপন্থী।
আমানতকারীরা বলেন,“আমরা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে অংশ নেইনি। আমরা সাধারণ আমানতকারী। ব্যাংকের দুর্নীতি, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার দায় আমাদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে আমানতকারীদের শাস্তি দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত।”
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক নারী আমানতকারী বলেন,“এই ব্যাংকে আমার স্বামীর পেনশনের টাকা রাখা ছিল। সেই টাকার মুনাফা দিয়েই সংসারের খরচ চলত। এখন বলা হচ্ছে দুই বছরের মুনাফা কেটে নেওয়া হবে। এটা আমাদের পরিবারের জন্য চরম অন্যায়।”
একজন অবসরপ্রাপ্ত আমানতকারী বলেন,“আজ সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, কাল অন্য কোনো ব্যাংক। এই সিদ্ধান্ত দৃষ্টান্ত হয়ে গেলে ভবিষ্যতে যেকোনো ব্যাংকের দুর্নীতির দায় সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপানো হবে। এতে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে যাবে।”
বক্তারা শরিয়াহ আইনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, মুদারাবাহ চুক্তি অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের অবহেলা, অপব্যবহার বা দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট লোকসানের দায় আমানতকারীদের ওপর বর্তায় না। সে ক্ষেত্রে আমানতকারীদের মুনাফা কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সরাসরি শরিয়াহবিরোধী।
মানববন্ধনে আমানতকারীরা ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো—
১. সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফায় আরোপিত হেয়ারকাট বাতিল
২. সব ধরনের হিসাবের টাকা মুনাফাসহ নগদায়নের সুযোগ নিশ্চিত করা
৩. এফডিআর ও ডিপিএস ভাঙার পূর্ণ অধিকার প্রদান
৪. নতুন ও পুরোনো সব আমানতকারীদের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা
৫. ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ আমানত ফেরতের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা
৬. RTGS, EFT, ATMসহ সব অনলাইন ব্যাংকিং সেবা দ্রুত চালু করা
আমানতকারীরা অভিযোগ করেন, ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার দায় এখন সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হেয়ারকাটের নামে ব্যাংক লুটের শিকার আমানতকারীদের পুনরায় শাস্তি দেওয়া হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।
মানববন্ধন থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, আগামী ৩১ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে হেয়ারকাট প্রত্যাহার এবং মুনাফাসহ আমানত ফেরতের কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু না হলে সারাদেশের সব শাখায় একযোগে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এ সময় আমানতকারীরা অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রতি আহ্বান জানান, সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার।