আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ, সচেতন নাগরিকবৃন্দ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতিনির্ধারকবৃন্দ । সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ একটি মহামারী আকার ধারণ করেছে । তার মূল কারণ এবং তা থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে আজকের আলোচনা। আপনারা সাথেই থাকবেন।
বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ আজ কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS)-এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও এই অপরাধের মাত্রা ও নৃশংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
একটি বাস্তবমুখী, নিরপেক্ষ এবং সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংকটের মূল কারণ (Root Causes) এবং বর্তমান রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর থেকে উত্তরণের উপায়গুলো নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:
১. ধর্ষণের মূল কারণ (Root Causes):
ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার পেছনে কোনো একক কারণ কাজ করে না। এটি মূলত মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের দীর্ঘসূত্রতা:
বাংলাদেশে কাগজের কলমে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ অত্যন্ত কঠোর (এমনকি সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড)। কিন্তু মূল সমস্যা হলো এর প্রয়োগ এবং দীর্ঘসূত্রতা। একটি মামলার চূড়ান্ত রায় হতে বছরের পর বছর, এমনকি এক দশকও লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে অপরাধীরা জামিন পেয়ে যায় এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা তুলে নিতে বা আপস করতে বাধ্য করে।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক আশ্রয়:
স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত অনেক সময়ই অপরাধীরা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশ প্রশাসন অনেক সময় মামলা নিতে গড়িমসি করে বা তদন্ত দুর্বল হয়, যা অপরাধীকে আশকারা দেয়।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভুক্তভোগীকে দোষারোপ (Victim Blaming):
আমাদের সমাজে ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। পোশাক, বাইরে চলাফেরা বা আচরণের অজুহাত তুলে অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মানসিকতা অপরাধীদের আড়াল করতে সাহায্য করে।
অনানুষ্ঠানিক সালিশি প্রথা (Illegal Salish):
গ্রামীণ বা মফস্বল এলাকায় এখনও অনেক গুরুতর অপরাধ স্থানীয় প্রভাবশালী বা মাতব্বরদের মাধ্যমে ‘সালিশ’ বা আপসের নামে ধামাচাপা দেওয়া হয়। অনেক সময় ভুক্তভোগীকে অপরাধীর সাথে বিয়ে দেওয়ার মতো অনৈতিক সিদ্ধান্তও চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা অপরাধের ধারণাকে হালকা করে দেয়।
নৈতিক অবক্ষয় এবং পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা:
তথ্যপ্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার এবং ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা যুবসমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি ঘটাচ্ছে। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে তাকে একটি ‘ভোগ্যবস্তু’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরিতে এটি ভূমিকা রাখছে।
২. বর্তমান প্রেক্ষাপটে উত্তরণের উপায় (Strategic Remedies):
বর্তমান পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে সনাতন ধারার বাইরে এসে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকার আইন সংশোধনের মাধ্যমে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং আপিলের সময়সীমা ৬০ দিন থেকে কমিয়ে ৩০ দিনে আনার মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এই ব্যবস্থাকে পুরোপুরি কার্যকর করতে নিম্নলিখিত বাস্তবমুখী পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
ক) বিচারিক ও প্রশাসনিক সংস্কার:
ফাস্ট-ট্র্যাক স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল: নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো যাতে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ হয়, তার জন্য বিশেষ আদালতের সংখ্যা এবং গতি বাড়াতে হবে। সম্প্রতি মেহেরপুরে মাত্র ২৯ দিনে একটি মামলার রায় হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা থাকলে দ্রুত বিচার সম্ভব।
সাক্ষী সুরক্ষা আইন (Witness Protection Act):
ভুক্তভোগী এবং মামলার সাক্ষীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরাপত্তা দিতে হবে। অপরাধী পক্ষ যেন কোনোভাবেই সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখাতে না পারে, তা নিশ্চিত করা আইনি ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শর্ত হওয়া উচিত।
তদন্তের আধুনিকায়ন ও নিরপেক্ষতা:
পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে। মেডিকেল রিপোর্ট ও ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার আধুনিকীকরণ এবং দ্রুততম সময়ে তা আদালতে পেশ করার জন্য ফরেনসিক ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
খ) সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ
প্রাতিষ্ঠানিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নজরদারি:
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে (যেমন মাদরাসা বা হোস্টেল) সহিংসতার ঘটনা সামনে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সাধারণ এলাকা, করিডোর এবং প্রবেশপথে সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করা এবং স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।
পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা:
প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলাম এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলে শিশুদের ‘গুড টাচ ও ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং পারস্পরিক সম্মতির (Consent) গুরুত্ব শেখানো দরকার।
সামাজিক প্রতিরোধ ও যুবসমাজকে সম্পৃক্তকরণ:
স্থানীয় পর্যায়ে যুব সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের নিয়ে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে, যা অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করবে এবং সালিশির নামে অপরাধ ধামাচাপ দেওয়ার সংস্কৃতি রুখে দাঁড়াবে।
সারকথা:
কঠোর আইন কেবল তখনই অপরাধ কমাতে পারে, যখন অপরাধীর মনে এই ভয় কাজ করবে যে—”অপরাধ করলে শাস্তি এড়ানো অসম্ভব।” রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিচার বিভাগের দ্রুততা এবং সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই সামাজিক ব্যাধি উপড়ানো সম্ভব নয়।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।