• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন

আগামীকাল মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আগামীকাল (২১ জুন) প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। মালয়েশিয়ায় সফর শেষে চীনে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দেশ মিলিয়ে ছয় দিনের সফরে যাবেন তিনি। ২৩ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী চীনে অবস্থান করবেন।

দুই দেশে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার সফর থেকে শ্রমবাজার নিয়ে সুখবর আসতে পারে বলে ধারণা করছেন সফর সংশ্লিষ্টরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে। আর সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা এবং অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিত করা। এছাড়া দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা হবে। বাণিজ্যের মধ্যে অন্যতম আলোচনার বিষয় হিসেবে থাকবে হালাল পণ্য রপ্তানি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। দুই সরকারপ্রধানের বৈঠকের পর উভয় দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে। এছাড়া বৈঠকে মূল আলোচনায় থাকবে শ্রমবাজার।

তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে এই শ্রমবাজার স্থবির হয়ে আছে। এই বৈঠক থেকে শ্রমবাজার সচল করার বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তা‌রেক রহমা‌নের মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরির কথা ব‌লছেন প্রবাসীরা। দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ আছে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রবাসীদের আশা, সফরের মাধ্যমে শ্রমবাজার পুনরায় চালু, সিন্ডিকেটমুক্ত কলিং ভিসা, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতার সুযোগ এবং দূতাবাস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো স্বচ্ছ ও সিন্ডিকেটমুক্ত কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থা।

কুয়ালালামপুরে কর্মরত প্রবাসী জাহিদ বলেন, দুই দেশের সরকার যদি সরাসরি ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করে, তাহলে সাধারণ শ্রমিকরা কম খরচে মালয়েশিয়ায় আসার সুযোগ পাবেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছি।

আরেক প্রবাসী জাকারিয়া বলেন, কলিং ভিসা চালু হলেও যদি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হবে না। তাই জবাবদিহিমূলক নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

মালয়েশিয়ায় বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত অবস্থায় রয়েছেন। কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ কর্মসংস্থানের সংকটে বৈধ অবস্থান হারিয়েছেন।

কুয়ালালামপুরে বসবাসরত এক শ্রমিক বলেন, বৈধ হওয়ার সুযোগ পেলে আমরা আরও বেশি আয় করতে পারবো এবং দেশে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবো। সফরে এ বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হলে হাজারো পরিবার উপকৃত হবে।

প্রবাসীদের বিশ্বাস, দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে নতুন কোনো বৈধকরণ কর্মসূচি চালু হলে অনিয়মিত কর্মীদের জন্য তা বড় স্বস্তি বয়ে আনবে।

মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তারা উচ্চ শিক্ষা, গবেষণা সহযোগিতা, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং স্কলারশিপ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।

ইসলামিক ইউনিভার্সিটির গবেষক আলমগীর চৌধুরী আকাশ বলেন, মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। আমরা চাই দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হোক।

অন্যদিকে, ব্যবসায়ী মহল আশা করছে, সফরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে। হালাল শিল্প, প্রযুক্তি, কৃষি ও উৎপাদন খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

প্রবাসী কমিউনিটি নেতা ও মালয়েশিয়া বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক কাজী সালাহউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মালয়েশিয়ায় বসবাসরত লাখো বাংলাদেশির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

তার বিশ্বাস, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, সিন্ডিকেটমুক্ত কর্মী নিয়োগ, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতা এবং প্রবাসীবান্ধব নীতিমালার মাধ্যমে সফরটি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

২০২৫ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক এবং তিনটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন। এই সফরকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক কোনদিকে এগোবে, তা জানা যাবে আসন্ন এই সফরে।

এর আগে বেইজিং সফর করেছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। তিনি চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুয়া চুনইংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের চীন সফরের নানা কর্মসূচি, আলোচ্যসূচি, সম্ভাব্য চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে আগেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি টিম এই মুহূর্তে চীনে অবস্থান করছে।

জানা গেছে, সফরে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও পররাষ্ট্র সচিবসহ উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৩ জুন দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‌‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এ অংশ নেবেন। সেখান থেকে ২৪ জুন বিকেলে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওয়ানা হবেন। এই পথে তিনি বুলেট ট্রেনে যাত্রা করবেন বলে জানা গেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, জ্বালানি সহযোগিতা, চীনা শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর, অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং গুয়াংজু-চট্টগ্রাম ও সাংহাই-চট্টগ্রাম সরাসরি বিমান ফ্লাইট চালুর বিষয়গুলো আলোচনার এজেন্ডায় আছে।

এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মুক্ত বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি), ব্রিকস এবং অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থা সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে চীনের সমর্থন চাওয়া হবে। এছাড়া চীনের অর্থায়ন ও সহায়তায় বাংলাদেশে যেসব বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প চালু রয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হবে।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। চীন এই প্রকল্পে অনুদান বা গ্র্যান্টের মাধ্যমে অর্থায়ন করবে বলে আশা করছে ঢাকা। ‘মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করতে পারে বাংলাদেশ। এছাড়া সরকার তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্যও চীনের অর্থায়ন চাইতে পারে।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০