একসময় দক্ষিণ আফ্রিকায় চাকরি করতেন। বিশ্বের ২২টি দেশ ঘুরে বাণিজ্যিক কৃষির নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। দেশে ফিরে আর্থিক সংকট, ব্যবসায় লোকসান ও পারিবারিক দুর্ভোগের মধ্যেও হার মানেননি। বরং সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে বরিশালের বাবুগঞ্জে গড়ে তুলেছেন বাণিজ্যিক পেঁপে চাষের সফল মডেল। আজ তিনি শুধু একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তাই নন, স্থানীয়দের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন ‘পেঁপে বিপ্লবী’ হিসেবে।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালী গ্রামের প্রবাসী উদ্যোক্তা আবু বকর সিদ্দিকী সুমন গত ৫ বছরে পেঁপে ও পেঁপের চারা বিক্রি করে কোটি টাকার ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের ২ হাজারের বেশি নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করেছেন।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে সুমন কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার পেঁপে এবং ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার পেঁপের চারা বিক্রি করেছেন। এতে তার প্রায় ৬০ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। তার সফলতা দেখে বাবুগঞ্জসহ বরিশালের বিভিন্ন এলাকার কৃষক বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষে আগ্রহী হয়েছেন। বর্তমানে তার নার্সারি থেকে চারা নিতে অনেককেই আগাম সিরিয়াল দিতে হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে এক একর ৪৮ শতক জমি এবং তিনটি মাছের ঘেরের পাড়জুড়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ শ পূর্ণবয়স্ক পেঁপে গাছ। বাগানে শাহী ও কাশ্মীরি জাতের পেঁপে চাষ করা হয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে চার থেকে ৫ মণ পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। তার বাগানে সর্বোচ্চ ৫ কেজি ওজনের পেঁপেও উৎপাদিত হয়েছে। চলতি মৌসুমে তার বাগানের কাঁচা ও পাকা পেঁপে প্রায় ২৫ লাখ টাকায় বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি। পেঁপের পাশাপাশি তিনি মাছের ঘেরের পাড়ে সাথী ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, করলা, বরবটিসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করে থাকেন। এ ছাড়াও পুকুরের চারপাশে মাচা পদ্ধতিতে বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করে বছরে অতিরিক্ত কয়েক লাখ টাকা আয় করেন।
সুমন কৃষি উদ্যোগের পাশাপাশি ৪৮ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন ‘দেলোয়ারা এগ্রো ট্রেনিং সেন্টার’। এখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তরুণ উদ্যোক্তা, বেকার যুবক, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও প্রশিক্ষণ নিতে আসেন। গত তিন বছরে তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ২ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন, যাদের অনেকেই এখন সফলভাবে পেঁপে চাষ করছেন বলে জানিয়েছেন সুমন।
স্থানীয় যুবক সিহাব উদ্দিন বলেন, আবু বকর সিদ্দিকী সুমন আমাদের গ্রামের একজন সফল উদ্যোক্তা। তিনি নিজে পেঁপে চাষে সফল হয়েছেন। এখন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তার কাছে প্রশিক্ষণ শেষে চারা নিয়ে সফল হচ্ছেন অনেকেই।
চারা উৎপাদনেও ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছেন সুমন। ২০২৩ সালে ৬ হাজার চারা বিক্রি দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। ২০২৪ সালে বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার চারায়। ২০২৫ সালে চারা বিক্রির পরিমাণ পৌঁছে প্রায় ১৪ লাখে। আর ২০২৬ সালে বিভিন্ন জটিলতার মধ্যেও ৬ লাখ চারা উৎপাদন ও বিক্রি করেছেন। আগামী ২০২৭ সালে সারা দেশে ২০ লাখ চারা বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে ইতোমধ্যে একটি আধুনিক পলি হাউস নির্মাণ করেছেন। প্রতিপিস চারায় খরচ বাদ দিয়ে ৫ টাকা লাভ থাকে বলেও জানান পেঁপেচাষি সুমন।
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশ থেকে তিনি সাতটি সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করেছেন। অল্প জমিতে অধিক ফলন উৎপাদনের জন্য নেপাল থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। একই অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও পুরস্কৃত হয়েছেন। এ ছাড়া ভারতের মহাত্মা গান্ধী ও মাদার তেরেসা সম্মাননাও পেয়েছেন। নেপালের পার্লামেন্ট থেকে ও ভারত থেকে নিজ হাতে এসব সম্মাননা ও পুরস্কার গ্রহণ করেন আবু বকর সিদ্দিকী সুমন।
সুমনের জীবন-সংগ্রামের গল্পও অনুপ্রেরণার। ১৯৯৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি হুন্দাই প্রতিষ্ঠানে পেইন্টার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। চাকরির সুবাদে ২২টি দেশ ভ্রমণের সময় জিম্বাবুয়ে ও মালাউইতে বাণিজ্যিক পেঁপে চাষ দেখে অনুপ্রাণিত হন। দেশে জমি কেনার পাশাপাশি বিদেশেও ব্যবসা গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ২০১৪ সালে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ডাকাতির ঘটনায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। পরে ২০২০ সালে স্ত্রীর কিডনি রোগের চিকিৎসার জন্য দেশে ফিরে নতুন করে জীবন শুরু করতে হয় তাকে।
২০২১ সালে মাছ চাষের জন্য ঋণ নিতে গিয়ে তৎকালীন বাবুগঞ্জের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুজ্জামানের পরামর্শে মাছের পাশাপাশি পেঁপে চাষ শুরু করেন। সরকারি একটি প্রকল্প থেকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা পান। প্রথমদিকে ব্যর্থ হলেও পরে গাজীপুর থেকে উন্নত মানের বীজ সংগ্রহ করে নিজেই চারা উৎপাদন শুরু করেন। সেই চারা দিয়েই আসে কাঙ্ক্ষিত সফলতা।
সুমন বলেন, আমি চাই বেকার যুবক ও শিক্ষার্থীরা কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করুক। একজন শিক্ষার্থী যদি মাত্র ২৫টি উন্নত জাতের পেঁপে গাছ লাগিয়ে সঠিক পরিচর্যা করে, তাহলে একটি মৌসুমেই প্রায় এক লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, সরকারি আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হলে আরও অনেক শিক্ষিত তরুণ কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন। আমি আমার ট্রেনিং সেন্টারে পেঁপে চাষের ওপর বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমার এখানে এসে চাষপদ্ধতি দেখে অনুপ্রেরণা নিয়ে নতুন নতুন উদ্যোক্তা হচ্ছেন।
শুধু ব্যবসায়িক সফলতাই নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেও কাজ করছেন সুমন। তিনি এলাকার মসজিদ, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে পেঁপের চারা বিতরণ করেন। দরিদ্র পরিবার ও প্রতিবেশীদের উন্নত জাতের চারা দিয়ে চাষে উৎসাহিত করেন। নিজের উৎপাদিত পেঁপে স্থানীয় এতিমখানায়ও বিনামূল্যে সরবরাহ করে থাকেন তিনি।
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, ‘আমরা তাঁর বাগান একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। তিনি একজন পরিশ্রমী ও উদ্যমী কৃষি উদ্যোক্তা। উন্নত জাতের মানসম্মত পেঁপের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি কৃষকদের সহায়তা করছেন। তাঁর এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়।’