• শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ০১:১১ পূর্বাহ্ন

সামিটের এলএনজি বন্ধ, তীব্র গ্যাস সংকট

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত সামিটের এলএনজি টার্মিনালে নতুন কার্গো যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেল ৫টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এর আগে অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেট এনার্জির আরেকটি এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ সক্ষমতাও অর্ধেকে নেমে আসে। ফলে দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট দৈনিক চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ১৯০ কোটি ঘনফুট। এতে শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এলএনজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মোট দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। তবে বর্তমানে সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট।

এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ৬ আগস্ট থেকে এটি আংশিকভাবে চালু হলেও জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ সামিটের টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

একপর্যায়ে সামিটের টার্মিনাল থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ ৫৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছিল। তবে গত সোমবার এলএনজি নিয়ে একটি কার্গো বঙ্গোপসাগরে পৌঁছালেও উত্তাল সমুদ্রের কারণে সেটি সামিটের টার্মিনালে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে কার্গো থেকে এলএনজি সরবরাহ নেওয়া যায়নি। টার্মিনালে মজুত থাকা এলএনজি দিয়ে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ চালিয়ে যেতে হয়।

এ কারণে সোমবার সন্ধ্যা থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমাতে শুরু করে সামিট। মঙ্গলবার সরবরাহ ২০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। বুধবার তা আরও কমিয়ে ১০ কোটি ঘনফুট করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে টার্মিনালটির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শুক্রবার সকাল পর্যন্তও কার্গোটিকে টার্মিনালে যুক্ত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এদিকে, গত ৬ আগস্ট থেকে আংশিকভাবে চালু থাকা এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ টার্মিনাল থেকে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।

আরপিজিসিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, এলএনজিবাহী কার্গো বার্থিংয়ের জন্য নির্ধারিত সীমার তুলনায় সমুদ্রের অবস্থা দ্বিগুণেরও বেশি প্রতিকূল। ফলে কার্গোটি টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, শুক্রবার বিকেল থেকে আবহাওয়া পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় শুক্রবার রাতে হলেও কার্গোটি বার্থিংয়ের চেষ্টা করা হবে। সাধারণত বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকির কারণে রাতে বার্থিং করা হয় না। তবে পরিস্থিতির কারণে এবার সেই ঝুঁকি নেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। শনিবার সকাল থেকে আবহাওয়া আরও উন্নতি করতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে।

এলএনজির ঘাটতির মধ্যে সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা ‘আল হামরা’ নামের একটি এলএনজি কার্গো মহেশখালীর কোনো টার্মিনাল গ্রহণ করেনি। কার্গোটিকে ঘিরে বিমা-সংক্রান্ত আপত্তি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বলেন, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেটের টার্মিনালের একটি বয়লার ক্যাবলসহ প্রয়োজনীয় মেরামতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করতে দ্বিতীয় বয়লার সিঙ্ক্রোনাইজেশনের জন্য ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগবে।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, সামিট টার্মিনাল পুরো সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করবে। গ্যাসের চাহিদার চাপ কিছুটা কমলে এক্সিলারেট টার্মিনাল বন্ধ করে বাকি ত্রুটিগুলো মেরামত করা হবে।

২০০৯ সালে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল ১৭৪ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। উৎপাদন বাড়তে বাড়তে ২০১৮ সালে দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়।

ওই বছর ঘাটতি মেটাতে প্রথমবারের মতো দৈনিক ৩০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা শুরু হয়। তবে দীর্ঘদিন নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া এবং পুরোনো কূপগুলোর উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ১৬০ থেকে ১৭০ কোটি ঘনফুটে।

ফলে এলএনজির ওপর দেশের নির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে পেট্রোবাংলা গড়ে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুটে রাখার চেষ্টা করছে।

তবে সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়া, এলএনজি কার্গো খালাসে জটিলতা এবং টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে সরবরাহ বারবার ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব পড়ছে।

এসব বিষয়ে জানতে পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান এবং পরিচালক (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) ও (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. শোয়েবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে গ্যাস সংকটের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

তিনি বলেন, প্রকৌশলীরা এফএসআরইউতে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি লোডশেডিং কমানোর জন্য ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, যাতে শিল্প খাতে যতটা সম্ভব গ্যাস সরবরাহ করা যায়। এ মুহূর্তে এর বাইরে সরকারের হাতে কার্যকর আর কোনো বিকল্প নেই।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১