শেয়ারবাজারে যারা বিনিয়োগ করেন, তারা একটি বিষয় খুব ভালো জানেন। ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করাই বিনিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। যে খাতের বর্তমান মূল্যায়ন তুলনামূলক কম, অথচ ভবিষ্যতে যার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা বেশি, দীর্ঘমেয়াদে সেই খাতই বড় প্রতিদানের সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে তাকালে এমন একটি খাত খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। সেটি হলো কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা।
শ্রেণিকক্ষে আমার শিক্ষার্থীদের প্রায়ই বলি, তোমরা শুধু শিক্ষার্থী নও, ভবিষ্যতের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত হতে পারে, কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদের সম্ভাবনা সীমাহীন। একজন তরুণকে দক্ষ করে তোলা মানে শুধু একজন চাকরিপ্রার্থী তৈরি করা নয়, বরং একজন কর্মী, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার তৈরি করা।
বাংলাদেশ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তরুণ। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, অটোমেশন, রোবোটিকস, সবুজ অর্থনীতি, ডিজিটাল সেবা এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা মিলিয়ে দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।এই বাস্তবতায় কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগকে নিছক শিক্ষা খাতে ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আসলে ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। একজন শিক্ষার্থী যখন চার বছর কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করেন, তখন তিনি শুধু একটি সনদ অর্জন করেন না। তিনি এমন একটি পেশাগত দক্ষতা অর্জন করেন, যার বাজারমূল্য তার কর্মজীবনের বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনীতিতে মানবসম্পদকে এখন আর কেবল শ্রমশক্তি হিসেবে দেখা হয় না। জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয়েই তৈরি হয় মানবসম্পদ মূলধন। একটি দেশ তার অবকাঠামো, শিল্প ও প্রযুক্তিতে যত বিনিয়োগই করুক না কেন, দক্ষ মানুষ ছাড়া সেই বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন। একজন দক্ষ তরুণ কর্মসংস্থানে যুক্ত হলে শুধু তার নিজের আয় বাড়ে না, পরিবারের জীবনমান উন্নত হয়, স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতায় নতুন অবদান যুক্ত হয়। অর্থাৎ একজন দক্ষ মানুষ একই সঙ্গে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মূল্য সৃষ্টি করেন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কতজন মানুষ বিদেশে গেলেন, তার ওপর নির্ভর করবে না। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তারা কী দক্ষতা নিয়ে বিদেশে গেলেন এবং সেই দক্ষতার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য কত। বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের বিদেশগামী কর্মীদের বড় একটি অংশ এখনো স্বল্প দক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রেণিতে অবস্থান করছেন। এর অর্থ হলো, একই শ্রমশক্তিকে উন্নত প্রশিক্ষণ, পেশাগত সনদ, ভাষাগত দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়ে প্রস্তুত করতে পারলে তাদের কর্মসংস্থানের ধরন ও আয় দুটিই পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
একজন সাধারণ শ্রমিক এবং একজন প্রশিক্ষিত ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং টেকনিশিয়ান, কেয়ারগিভার, কুক, হসপিটালিটি পেশাজীবী কিংবা অটোমেশন বিশেষজ্ঞ একই দেশের নাগরিক হলেও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তাদের দক্ষতার মূল্য এক নয়। তাই আমাদের বিদেশগামী জনশক্তি নীতির লক্ষ্য শুধু আরও বেশি মানুষকে বিদেশে পাঠানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বেশি দক্ষ মানুষকে উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থানে পাঠানো। সংখ্যার পাশাপাশি দক্ষতার মানকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার সময় এসেছে।
বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য ইতিমধ্যে বিস্তৃত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন স্তরে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান তরুণদের কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক প্রতিষ্ঠানে আসন পূরণ হচ্ছে না। কোথাও শিক্ষার্থীসংখ্যা কম, কোথাও নির্দিষ্ট ট্রেডে আগ্রহ কম, আবার কোথাও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় শ্রমবাজারের প্রয়োজনের কার্যকর সংযোগ তৈরি হয়নি।এই বাস্তবতাকে শুধু সংকট হিসেবে দেখলে সমস্যার অর্ধেকই দেখা হবে। বরং প্রশ্ন করতে হবে, শিক্ষার্থী কেন আসছে না। কারিকুলাম কি স্থানীয় শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? প্রতিষ্ঠানে আধুনিক যন্ত্রপাতি আছে কি? প্রশিক্ষক পর্যাপ্ত ও দক্ষ কি? প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠান কি পর্যাপ্ত তথ্য দেয়? শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ কতটা কার্যকর? অভিভাবকদের কাছে কারিগরি শিক্ষার বাস্তব ক্যারিয়ার সম্ভাবনা কতটা পরিষ্কার?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে পারলে অনেক অব্যবহৃত আসনই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক, কার্যকর ও কর্মসংস্থানমুখী করে তোলা এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ভবন নির্মাণ করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু সেই ভবনের ভেতরে এমন দক্ষতা তৈরি করা, যার বাজারে বাস্তব মূল্য আছে, সেটিই আসল চ্যালেঞ্জ।বিশ্বের সফল কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে যত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তত বেড়েছে। জার্মানির দ্বৈত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ। সেখানে শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পান। ফলে সনদ হাতে পাওয়ার আগেই তিনি কর্মপরিবেশ, যন্ত্রপাতি, নিরাপত্তা, কর্মশৃঙ্খলা এবং বাস্তব উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশেও এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে স্থানীয় শিল্প, হোটেল, হাসপাতাল, পর্যটন প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য নিয়োগদাতার কার্যকর অংশীদারিত্ব তৈরি করা যেতে পারে। শুধু শিল্প পরিদর্শন নয়, শিক্ষানবিশ ব্যবস্থা, শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ, যৌথভাবে কারিকুলাম উন্নয়ন, শিল্প বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে ক্লাস এবং বাস্তব প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তাহলে শ্রেণিকক্ষ ও চাকরির বাজারের মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে, তা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
কারিগরি শিক্ষার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস, ক্লাউড প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ইতিমধ্যে কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। আগামী দিনের একজন টেকনিশিয়ানকে শুধু একটি যন্ত্র চালাতে জানলেই হবে না। তাকে ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক, তথ্য বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান এবং নিরাপত্তা সম্পর্কেও জানতে হবে। একইভাবে পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতের একজন শিক্ষার্থীর শুধু রান্না, ফ্রন্ট অফিস বা হাউসকিপিংয়ের দক্ষতা থাকলেই হবে না। তাকে ডিজিটাল বুকিং, অনলাইন গ্রাহকসেবা, স্মার্ট হোটেল প্রযুক্তি, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। আগামী দিনের কারিগরি শিক্ষা তাই শুধু হাতের কাজ শেখানোর শিক্ষা নয়। এটি হবে হাতে কলমে দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার সমন্বিত শিক্ষা।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন আরও একটি বড় পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যান, শক্তি সাশ্রয়ী ভবন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন নতুন দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। সবুজ অর্থনীতি শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষায় এসব নতুন দক্ষতা যুক্ত করা গেলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে নতুন প্রজন্মকে।
কারিগরি শিক্ষার আরেকটি বড় শক্তি হলো এটি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক হতে হয় না। একজন তরুণকে যদি নিজের জেলা বা উপজেলাতেই মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে তাকে কাজের জন্য শুরুতেই রাজধানীতে ছুটতে হবে না। সে স্থানীয় শিল্পে কাজ করতে পারে, নিজেই ব্যবসা শুরু করতে পারে কিংবা দক্ষতা নিয়ে বিদেশে যেতে পারে। এভাবে জেলা পর্যায়ের কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।প্রতিটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও এক নয়। কোথাও কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোথাও পর্যটন ও আতিথেয়তা, কোথাও নির্মাণ, কোথাও তথ্যপ্রযুক্তি, কোথাও মেরিন ও লজিস্টিকস আবার কোথাও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বেশি সম্ভাবনাময়। তাই ভবিষ্যতের কারিগরি শিক্ষা পরিকল্পনায় জাতীয় চাহিদার পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক দক্ষতার মানচিত্র তৈরি করা জরুরি।
উপকূলীয় ও পর্যটনসমৃদ্ধ অঞ্চলে পর্যটন, আতিথেয়তা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো দক্ষতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তেমনি শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজন হতে পারে অটোমেশন, মেশিন মেইনটেন্যান্স ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইলেকট্রনিকসের দক্ষতা। আবার কৃষিপ্রধান অঞ্চলে কৃষি যন্ত্রপাতি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষাকে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যত বেশি যুক্ত করা যাবে, এর বাস্তব সুফল তত দ্রুত দৃশ্যমান হবে।
নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতেও কারিগরি শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল সেবা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ফ্যাশন ডিজাইন, স্বাস্থ্যসেবা সহায়ক পেশা, হসপিটালিটি, কেয়ার সার্ভিস, ইলেকট্রনিকস, সৌরবিদ্যুৎ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে প্রশিক্ষিত নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। একইভাবে শিক্ষার বাইরে থাকা তরুণদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ও মডুলার প্রশিক্ষণ, পূর্বের দক্ষতার স্বীকৃতি এবং কাজের পাশাপাশি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা গেলে শ্রমবাজারে আরও বড় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা সম্ভব হবে।এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি শিক্ষার সাফল্য শুধু সনদের সংখ্যায় মাপা যাবে না। দেখতে হবে একজন শিক্ষার্থী বাস্তবে কী করতে পারেন। তাই ব্যবহারিক পরীক্ষা, প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন, শিল্প প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত সনদের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। একজন বাংলাদেশি তরুণের দক্ষতার সনদ যদি বিশ্বের একজন নিয়োগদাতা সহজেই যাচাই করতে পারেন, তাহলে তার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে পৌঁছে যাবে।
কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগের হিসাবও তাই নতুন করে করতে হবে। কত টাকা খরচ হলো, কতটি ভবন তৈরি হলো কিংবা কতটি আসন সৃষ্টি হলো, শুধু এই হিসাব যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে কতজন দক্ষ হলো, কতজন চাকরি পেল, কতজন উদ্যোক্তা হলো, কতজন উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থানে বিদেশে গেল, কত আয় সৃষ্টি হলো এবং কত পরিবার সেই বিনিয়োগের সুফল পেল।বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজার। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সেতুবন্ধন হতে পারে কারিগরি শিক্ষা। আমাদের প্রয়োজন শুধু আরও প্রতিষ্ঠান নয়, আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠান। শুধু আরও আসন নয়, আরও শিক্ষার্থী। শুধু আরও সনদ নয়, আরও দক্ষতা। শুধু বিদেশে আরও কর্মী পাঠানো নয়, আরও উচ্চমূল্যের দক্ষ কর্মী পাঠানো। শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি নয়, উদ্যোক্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী মানুষ তৈরি করা।
আজকের বিশ্বে প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো দক্ষতা। যে দেশ তার তরুণদের দক্ষ করে তুলতে পারবে, সেই দেশই পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারবে।তাই কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ নয়। এটি কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ, রেমিট্যান্সে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতায় বিনিয়োগ, শিল্পে বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ।
আজকের একটি দক্ষ তরুণ আগামী দিনের একটি পরিবারকে বদলে দিতে পারেন, একটি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে পারেন, একটি শিল্পকে আরও উৎপাদনশীল করতে পারেন এবং চাইলে একটি নতুন ব্যবসার জন্ম দিতে পারেন। সেই তরুণের দক্ষতায় করা বিনিয়োগের সুফল তাই শুধু একজন মানুষের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পরিবার থেকে সমাজে, সমাজ থেকে অর্থনীতিতে এবং অর্থনীতি থেকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতে।কারিগরি শিক্ষা তাই আর বিকল্প শিক্ষাধারা নয়। এটি দক্ষ বাংলাদেশের ভিত্তি, উৎপাদনশীল অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ বিনিয়োগ।আজকের দক্ষ তরুণই আগামী দিনের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মূলধন।
লেখক: মো. মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।