একজন বৃদ্ধ মানুষ। বয়স ৭৪। দুই হাতে দুটি পানির পাত্র। তিনি হাঁটছেন। কোথায় যাচ্ছেন, জানেন না। শুধু জানেন—বাড়ি ফিরতে হলে পাত্র দুটো ভরতে হবে। তাঁর নাম জুহাইর আল-নাসর।
ঠিক কোথায় পানি পাওয়া যাবে, সেটি এখন তাঁর কাছে প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
গাজার শেখ রাদওয়ান এলাকায় এই প্রশ্ন শুধু জুহাইরের নয়। হাজার হাজার মানুষের। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তাঁরা এখন শুধু নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন না, খুঁজছেন এক পাত্র নিরাপদ পানিও।
আমরা যারা বাংলাদেশে বসে বর্ষার দিনে জানালা দিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকাই, তাদের কাছে পানির অভাবের কথা শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগে। এই দেশে পানি যেন চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এক স্বাভাবিক সম্পদ। ট্যাব ছাড়লেই পানি আসে, বৃষ্টি হলে উঠোন ভিজে যায়, নদী-খাল-পুকুরে বছরের পর বছর পানির চলাচল।
কিন্তু পৃথিবীর একটি ভূখণ্ডে আজ পানি পাওয়া মানে দীর্ঘ পথ হাঁটা। কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা। কখনো পানির ট্রাকের আশায় দিন গোনা। আর কখনো—খালি পাত্র হাতে ফিরে আসা।
জুহাইরের নিজের বাড়ি নেই।
গাজার উত্তরের বেইত হানুনে তাঁর বাড়িটি যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন তিনি একটি তাঁবুতে থাকেন। সঙ্গে বড় পরিবার—১৩ সন্তান এবং ২০ জনেরও বেশি নাতি-নাতনি।
এতগুলো মানুষের জন্য প্রতিদিন পানি সংগ্রহ করা কেমন কাজ, তা কল্পনা করাও কঠিন।
কিন্তু কিছুদিনের জন্য তাঁর এই কষ্টটা একটু কমেছিল।
শেখ রাদওয়ানে একটি নতুন ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট চালু হয়েছিল। ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট (Desalination Plant) হলো এমন একটি স্থাপনা, যেখানে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি থেকে লবণ ও অন্যান্য দ্রবীভূত উপাদান অপসারণ করে পানযোগ্য বা ব্যবহারযোগ্য মিঠা পানি তৈরি করা হয়। প্ল্যান্ট থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আশপাশের মানুষের কাছে পানি পৌঁছাত। দিন-রাত পানি সংগ্রহের সুযোগ ছিল।
মাত্র দুই মাস।
মাত্র দুই মাসের জন্য যুদ্ধের মধ্যে জীবনটা একটু স্বাভাবিক মনে হয়েছিল।
পানির ব্যবস্থা হলে মানুষ এলাকায় ফিরতে শুরু করেছিল। তাঁবুর পাশে আবার মানুষের চলাচল বেড়েছিল। পরিচ্ছন্নতা ফিরছিল। রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া—জীবনের ছোট ছোট কাজগুলো আবার সম্ভব হচ্ছিল।
যুদ্ধের মধ্যে কখনো কখনো ‘স্বাভাবিক জীবন’ বলতে এর চেয়ে বেশি কিছু লাগে না।
একটু পানি। কিন্তু গেলো ২৪ আগস্ট সেই পানির প্ল্যান্টটিই ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।
পাশের বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু ও আবাসিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আর জুহাইর?
তিনি আবার খালি পাত্র হাতে হাঁটতে শুরু করেন।
জুহাইরের একটি কথা যেন পুরো গাজার গল্পটিকে এক বাক্যে ধরে ফেলে— ‘যেখানে পানি আছে, সেখানে জীবন আছে।’
কথাটি শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু গাজার বাস্তবতায় এর গভীরতা অন্যরকম।
কারণ পানি সেখানে শুধু তৃষ্ণা মেটানোর উপাদান নয়।
পানি মানে রান্না। পানি মানে গোসল। পানি মানে কাপড় ধোয়া। পানি মানে অসুস্থ শিশুকে ওষুধ খাওয়ানো। পানি মানে একটু পরিচ্ছন্ন থাকা। পানি মানে বেঁচে থাকা।
যে কারণে একটি পানির প্ল্যান্ট ধ্বংস হওয়ার অর্থ শুধু একটি যন্ত্রপাতি বা ভবন ধ্বংস হওয়া নয়। এর অর্থ—হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আরেকটি অবলম্বন হারিয়ে যাওয়া।
পানি আসবে—এই আশাটুকুও অনিশ্চিত
গাজার বহু মানুষ এখন পানির ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ট্রাকও তো সব জায়গায় নিয়মিত পৌঁছায় না।
গাজা সিটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুকাবারাত এলাকায় বসবাসকারী ৩৬ বছর বয়সী নাদা আরুকির পরিবার সপ্তাহে বড়জোর দুই দিন পানির ট্রাক দেখতে পায়। কখনো কখনো পুরো এক সপ্তাহও ট্রাক আসে না।
ট্রাক এলে তাই সেটি আর কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। সেটি হয়ে ওঠে জরুরি মুহূর্ত।
নাদা তখন ছয়টি পাত্র পানি দিয়ে ভরেন। তারপর সেগুলো নিয়ে পরিবারের কাছে ফেরেন। সেই একই পানি দিয়ে পান করতে হয়, রান্না করতে হয়, পরিষ্কার করতে হয়, গোসল করতে হয়।
আর ট্রাক না এলে?
তখন পানীয় জল কিনতে হয়।
যুদ্ধের মধ্যে যেখানে খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে পানি কেনাও পরিবারের জন্য বাড়তি বোঝা। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো—পানির মান নিয়েও নিশ্চয়তা নেই।
নাদার এক সন্তান পানিবাহিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে কয়েক দিন হাসপাতালে ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। চিকিৎসকেরা পানির সঙ্গে অসুস্থতার সম্পর্কের কথা বলেছেন বলেও তাঁর দাবি।
অর্থাৎ গাজায় এখন দুটি ভয় পাশাপাশি হাঁটে—
পানি নেই।
আর যে পানি আছে, সেটি নিরাপদ কি না—সেটিও জানা নেই।
খালি পাত্রের সঙ্গে হাঁটে একটি বৃদ্ধ শরীর
নাদার শাশুড়ি মরিয়ম আরুকির বয়স ৬০ বছর।
তাঁর ঘরে পৌরসভার পানির সংযোগ নেই। নেই কোনো পানির পাম্প। তাই পরিবারের বড় পানির পাত্রটি ভরতে তাঁকে দিনে তিন-চারবার যেতে হয়।
শরীর আর সায় দেয় না।
হাতের সমস্যা হয়েছে। টেনটনে আঘাত লেগেছে। বুকে ব্যথা হয়। রক্তচাপ বেড়ে যায়।
চিকিৎসকেরা তাঁকে ভারী কাজ বন্ধ করতে বলেছেন।
কিন্তু পানির প্রয়োজন কি চিকিৎসকের পরামর্শ বোঝে?
পরিবারের মানুষগুলো তো পানি ছাড়া থাকতে পারবে না। তাই মরিয়ম আবার হাঁটেন। খালি পাত্র হাতে।
সঙ্গে থাকে তাঁর নাতি-নাতনিরা। তিনি বলেন, তাঁর শরীর ও হাড় যেন ভেঙে পড়ছে।
তারপরও হাঁটতে হয়। কারণ পানি না আনলে পরিবার চলবে না।
এই জায়গাতেই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ চেহারাটি দেখা যায়। বোমা যখন পড়ে, আমরা ধ্বংস দেখি।
কিন্তু বোমার পর একজন বৃদ্ধ নারী যখন খালি কলস হাতে রাস্তায় হাঁটেন, তখন আমরা বুঝতে পারি কী—ধ্বংস আসলে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে?
একটি পানির প্ল্যান্টের মূল্য কত?
শেখ রাদওয়ানের ধ্বংস হওয়া প্ল্যান্টটির মালিক মোহাম্মদ মাহমুদের হিসাবে তাঁর ক্ষতি অন্তত পাঁচ লাখ ডলার। শুধু যন্ত্রপাতির দামই ছিল প্রায় আড়াই লাখ ডলার।
কিন্তু এই হিসাব অসম্পূর্ণ। কারণ একটি পানির প্ল্যান্টের মূল্য শুধু তার যন্ত্রপাতির দামে মাপা যায় না।
তার মূল্য মাপতে হবে সেই শিশুর চোখে, যে এক গ্লাস পরিষ্কার পানি খেতে পারত।
মাপতে হবে সেই মায়ের হাতে, যিনি দূর থেকে পানি বয়ে এনে ক্লান্ত শরীরটা একটু বিশ্রাম দিতে পারতেন। মাপতে হবে সেই বৃদ্ধের পায়ে, যাকে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হতো না।
একটি পানির প্ল্যান্টের মূল্য আসলে মানুষের কয়েক হাজার ছোট ছোট স্বস্তির যোগফল।
সংখ্যাগুলোও যেন কাঁদে
জাতিসংঘের উদ্ধৃত এক জরিপ বলছে, জুলাইয়ের শুরুতে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ নিরাপদ, পরিষ্কার ও নির্ভরযোগ্য পানির সরবরাহে ঘন ঘন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছিল। গাজা সিটিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ—সেখানে এই হার ৯২ শতাংশ।
জুলাইয়ের শেষ দিকে গাজার প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ পানীয় জলের প্রধান উৎস হিসেবে পানির ট্রাকের ওপর নির্ভর করছিল।
তারপরও প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না।
ইউনিসেফের আগস্টের হিসাবে, গাজার প্রায় ৬৩ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন পান করা ও রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ছয় লিটার পানিও সংগ্রহ করতে পারছিল না।
ছয় লিটার।
একজন মানুষের এক দিনের জন্য।
আমাদের কাছে সংখ্যাটি হয়তো কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু গাজার একটি পরিবারের কাছে ছয় লিটার মানে—আজ রান্না হবে কি না, শিশু পানি পাবে কি না, অসুস্থ বৃদ্ধ ওষুধ খেতে পারবেন কি না—তার হিসাব।
যুদ্ধের অভিধানে ‘পানি’ শব্দটি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
যুদ্ধের খবর আমরা সাধারণত মাপি কতজন নিহত, কতটি ভবন ধ্বংস, কতটি হামলা হয়েছে—এসব সংখ্যা দিয়ে।
কিন্তু যুদ্ধের আরেকটি হিসাব আছে, যা পরিসংখ্যানের পাতায় সহজে ধরা পড়ে না।
কতজন মানুষ আজ পানি পায়নি? কতজন মা সন্তানকে গোসল করাতে পারেননি? কতজন বৃদ্ধকে পানি আনতে গিয়ে শরীর ভেঙে ফেলতে হয়েছে? কতজন মানুষ জানে না আগামীকাল কোথা থেকে এক বোতল নিরাপদ পানি আসবে? এই প্রশ্নগুলোও যুদ্ধের হিসাব।
বরং কখনো কখনো এগুলোই যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য বোঝায়।
কারণ একটি শহর ধ্বংস করা শুধু তার ভবনগুলো ধ্বংস করা নয়। তার পানি, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, স্কুল, যোগাযোগব্যবস্থা—জীবনের যে জালটি মানুষকে মানুষ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখে, সেটি ছিন্ন করে দেওয়া।
গাজার মানুষের জীবন আজ সেই ছিন্ন জালের ওপর ঝুলছে।
বাংলাদেশ কি এই গল্প থেকে দূরে?
আমরা গাজা থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। তবু পানির গল্পটি আমাদের অপরিচিত নয়। বাংলাদেশও জানে পানির ভয়।
আমরা জানি নদীতে যখন পানি বাড়ে, তখন পানি জীবন নয়—মৃত্যুও হয়ে উঠতে পারে। আমরা জানি লবণাক্ততার কারণে উপকূলের মানুষ কীভাবে খাবার পানির জন্য দূরে যায়। আমরা জানি বন্যার পর বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা। জানি, একটি টিউবওয়েল বা একটি পানির উৎস কখনো কখনো একটি পুরো গ্রামের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে ওঠে।
এই কারণেই গাজার পানির সংকট আমাদের কাছে কেবল দূরের কোনো ভূখণ্ডের খবর নয়। এটি মানুষ হয়ে থাকার একটি মৌলিক প্রশ্ন।
একজন মানুষের কি নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকার নেই?
এই প্রশ্নের কোনো সীমান্ত নেই। ধর্ম নেই। জাতীয়তা নেই। রাজনীতিও নেই। তৃষ্ণার কোনো পতাকা নেই।
এদিকে শেষ পর্যন্ত থেকে যায় সেই খালি পাত্র। শেখ রাদওয়ানের রাস্তায় জুহাইর আল-নাসর আবার হাঁটবেন।
হয়তো কোনো এক জায়গায় পানি পাবেন।
হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।
হয়তো পাত্র দুটো ভরবে, হয়তো খালি নিয়েই ফিরতে হবে।
কিন্তু তিনি হাঁটবেন।
কারণ তাঁর তাঁবুতে মানুষ অপেক্ষা করছে।
তাঁর সন্তানরা অপেক্ষা করছে।
তাঁর নাতি-নাতনিরা অপেক্ষা করছে।
আর সেই অপেক্ষার কেন্দ্রে কোনো বিলাসিতা নেই।
নেই বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, আরামদায়ক ঘর কিংবা নিরাপদ ভবনের দাবি।
আছে শুধু এক পাত্র পানির অপেক্ষা।
এই পৃথিবীতে সভ্যতার অগ্রগতি নিয়ে আমরা কত কথা বলি। মহাকাশে যাওয়ার গল্প করি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করি, নতুন নতুন প্রযুক্তির স্বপ্ন দেখি।
অথচ একই সময়ে পৃথিবীর এক প্রান্তে একজন ৭৪ বছরের মানুষ দুই হাতে খালি পানির পাত্র নিয়ে হাঁটছেন।
সেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের সমস্ত অগ্রগতির দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে—মানুষ যদি এক পাত্র নিরাপদ পানি না পায়, তবে আমাদের সভ্যতা আসলে কতটা সভ্য?
গাজার আকাশে হয়তো আবার বোমার শব্দ হবে।
ধ্বংস হবে আরও কোনো ভবন। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মানুষের সবচেয়ে মৌলিক আকাঙ্ক্ষাটি একই থাকবে—
একটু পানি।
কারণ জুহাইর আল-নাসরের কথাটিই শেষ কথা হয়ে থাকে: পানি যেখানে, জীবনও সেখানে। কারণ পানি ছাড়া কে বাঁচতে পারে? পানিই তো জীবন।
আল জাজিরা থেকে অনুদিত
অনুবাদ: কামাল হোসাইন, গণমাধ্যম কর্মী।