আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ আজকে আলোচনার বিষয় রেখেছি নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা এবং সহিংসতা। এর কারণ এবং প্রতিকার নিয়ে। আপনারা সাথেই থাকুন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা, অপহণ, ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সমাজ ও সচেতন মহলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিগত মাসগুলোতে (২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত) দেশে নথিভুক্ত সহিংসতার পরিসংখ্যান:
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও চিত্র:
শিশু ও শিক্ষার্থী ধর্ষণ: প্রথম ৭ মাসে প্রায় ২৪১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
ধর্ষণের পর হত্যা: উক্ত সময়ে অন্তত ৩৭ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
সাধারণ শিশু হত্যা: বিভিন্ন কারণে (অপহরণ, পারিবারিক শত্রুতা, নির্যাতন) শিশু ও শিক্ষার্থীদের হত্যার ঘটনা ঘটেছে শতাধিক।
আলোচিত কিছু ঘটনা:
ঢাকার পল্লবীতে ৭ বছরের শিশুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড, পাবনায় ১০ বছরের শিশু শিক্ষার্থীকে অপহরণ ও ধর্ষণের পর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার, এবং সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন স্থানে শিশু নির্যাতনের ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণসমূহ:
সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই ধরণের অপরাধের নেপথ্যে প্রধান কারণগুলো হলো:
আইনের ধীরগতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি:
ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া।
সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়:
পরিবার ও সমাজ থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং বিচারিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হ্রাস পাওয়া।
মাদকদ্রব্যের বিস্তার ও অপসংস্কৃতি:
তরুণ ও অপরাধীদের মধ্যে মাদকের সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি বা সহিংস কনটেন্টের অবাধ ব্যবহার।
পরিচিত ব্যক্তিদের অপরাধে লিপ্ত হওয়া:
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী, নিকট আত্মীয় বা স্থানীয় প্রভাবশালীরা এ জাতীয় অপরাধের সাথে জড়িত থাকে।
স্থানভিত্তিক তদারকির অভাব:
স্কুল-কলেজের সীমানা, রাস্তাঘাট এবং নির্জন এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সিসিটিভির অভাব।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাসমূহ
এই পরিস্থিতি প্রতিরোধ ও আইনি ব্যবস্থার সাথে যেসব সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান যুক্ত:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী:
বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব (RAB), ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID)।
বিচার ও বিচার বিভাগীয় মন্ত্রণালয়:
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং বিচার বিভাগ।
সরকারী অবকাঠামো:
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ (999)।
অধিকার রক্ষা ও মনিটরিং সংস্থা:
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK), ওডিএইচকে (Odhikar), এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS)।
এই সংকট থেকে বাঁচার ও প্রতিকারের উপায়
১. দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা:
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২. দ্রুত আইনি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা:
জরুরি প্রয়োজনে ১০৯ (নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল) এবং ৯৯৯-এ তাত্ক্ষণিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্পর্শকাতর এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা।
৩. স্কুলে ও পরিবারে সচেতনতা বৃদ্ধি:
ছাত্র-ছাত্রীদের ‘গুড টাচ ও ব্যাড টাচ’ (Good Touch & Bad Touch) সম্পর্কে সচেতন করা। অচেনা কারো সাথে কোথাও না যাওয়া এবং বিপদে পড়লে কীভাবে চিৎকার বা সাহায্য চাইতে হয় তার শিক্ষা দেওয়া।
৪. সামাজিক প্রতিরোধ ও সামাজিকভাবে বয়কট:
অপরাধীদের রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাব কাটিয়ে আইনি আওতায় আনা এবং সামাজিকভাবে তাদের বয়কট করা।
৫. মাদক ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ:
মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ করা এবং ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফিক ও সহিংস ওয়েবসাইটের ওপর নজরদারি জোরদার করা।
আপনাদের সচিন্তিত মতামতের আশায় থাকলাম।
ধন্যবাদ সবাইকে এতক্ষন সাথে থাকার জন্য।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত ।