এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ২০২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪.০ শতাংশ করেছে। একইসাথে, ২০২৬ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ৩.৭ শতাংশ।
২০২৫ অর্থবছরের ১০.০ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি আনুমানিক ৮.৭ শতাংশে নেমে এসেছে, তবে ২০২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯.০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সর্বশেষ প্রতিবেদন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) সেপ্টেম্বর ২০২৬’ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে সৃষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনে বিঘ্ন ঘটায় ২০২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর হয়ে পড়েছিল; তবে এর প্রভাব সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রবৃদ্ধির এই উন্নত পূর্বাভাসটি শক্তিশালী ভোগ ও বিনিয়োগের প্রতিফলন, যা ২০২৬ সালের শুরুর দিকের সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসার ফলে সম্ভব হয়েছে।
জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়, জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বিঘ্ন, খাদ্যপণ্যের দামে ‘এল নিনো’-র বিলম্বিত প্রভাব এবং ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকা মুদ্রানীতির কারণে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
রপ্তানির তুলনায় আমদানি বৃদ্ধির হার বেশি হওয়ায় ২০২৭ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে জিডিপির ০.৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা ২০২৬ অর্থবছরে ছিল আনুমানিক ০.৩ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা সত্ত্বেও রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শক্তিশালী রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত রিজার্ভ বাহ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে; তবে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা নির্ভর করবে পর্যাপ্ত আর্থিক প্রবাহ, বিনিময় হারের নমনীয়তা এবং বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৭ অর্থবছরে সেবা ও কৃষি খাত প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে উচ্চ ঋণ গ্রহণের খরচ, ঋণ প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট, দুর্বল বৈদেশিক চাহিদা এবং অন্যান্য কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের কারণে শিল্প ও বিনিয়োগ খাত সীমিত পরিসরে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের সহায়তায় ব্যক্তিগত ভোগ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে; যদিও উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে আনা অব্যাহত রাখবে।
প্রতিবেদনে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নিম্নমুখী ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, তেলের উচ্চমূল্য, বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে আরও ব্যাঘাত, কঠোর বাণিজ্য বিধিনিষেধ, প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, মুদ্রা বিনিময় হারের ওপর অব্যাহত চাপ, ব্যাংকিং খাতে বাড়তি চাপ, রাজস্ব সংস্কারে বিলম্ব, প্রত্যাশার চেয়ে কম উন্নয়ন ব্যয় এবং জলবায়ু-জনিত অভিঘাত প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করতে পারে এবং মূল্যস্ফীতিকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে পারে।
এডিবি-র কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তবে এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এখনও বাহ্যিক অভিঘাত ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিস্থাপক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই সংস্কারগুলো অপরিহার্য।
তিনি উল্লেখ করেন যে, এই সংস্কারগুলোকে জনগণের জন্য দৃশ্যমান ফলাফলে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে এডিবি প্রস্তুত রয়েছে।