বাংলাদেশের গণমাধ্যমে জেন্ডার সংবেদনশীল ভাষার ব্যবহার, বিদ্যমান নীতিমালা পর্যালোচনা এবং যথাযথ শব্দ নির্বাচনের সুপারিশ নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যমে জেন্ডার সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহারের নীতিমালা পর্যালোচনা ও যথাযথ শব্দ ব্যবহারের সুপারিশ’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মিনহাজ উদ্দীন। গবেষণায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক ভাষার ব্যবহার পর্যালোচনা করে অবমাননাকর, অসম্মানজনক ও বৈষম্যমূলক শব্দের পরিবর্তে গ্রহণযোগ্য শব্দ ব্যবহারের সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, গণমাধ্যম শুধু সমাজের দর্পণ নয়, মানুষের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সংবাদ পরিবেশনে নারী, পুরুষ ও অন্যান্য জেন্ডার পরিচয়ের মানুষের প্রতি সমান মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গবেষণায় গণমাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক ভাষার ব্যবহার পর্যালোচনায় বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশনা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং তিনটি গভীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গণমাধ্যমে এখনও নারী ও অন্যান্য জেন্ডার পরিচয়ের মানুষকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অবমাননাকর, অসম্মানজনক ও যৌনতাসূচক শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে।
গবেষণাপত্রে এসব শব্দের পরিবর্তে সম্মানজনক ও যথাযথ শব্দ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ‘বেশ্যা’ বা ‘পতিতা’র পরিবর্তে ‘যৌনকর্মী’, ‘মহিলা’র পরিবর্তে ‘নারী’ এবং ‘ধর্ষিতা’র পরিবর্তে ‘ধর্ষণের শিকার’ শব্দ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে গবেষক মো. মিনহাজ উদ্দীন বলেন, মেটা ও অ্যালফাবেটভিত্তিক নতুন গণমাধ্যমের যুগে নারী ও অন্যান্য জেন্ডার পরিচয়ের মানুষকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশে আপত্তিকর, অপমানজনক, অসম্মানজনক ও মানহানিকর শব্দের ব্যবহার ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এর মাধ্যমে আধিপত্যবাদী, ভোগবাদী, যৌনতুষ্টিমূলক ও অবদমনমূলক মনোভাব প্রতিফলিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্লিকবেইট সাংবাদিকতা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এখনও ‘ডাইনি’, ‘অবলা’, ‘মহিলা’, ‘ধর্ষিতা’, ‘অপরাধী’, ‘হত্যাকারী মা’, ‘পাষণ্ড মা’, ‘ঘাতক মা’, ‘নারী কেলেঙ্কারি’, ‘নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় আটক’, ‘পতিতা’, ‘বেশ্যা’, ‘ষোড়শী’, ‘স্বল্পবসনা’, ‘ঘসেটি বেগম’ ও ‘দেহপসারিণী’র মতো শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন করে ‘শাহবাগী’, ‘লাল বদর’, ‘হেফাজতী’ ও ‘আধুনিকা’র মতো শব্দের ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে। তার মতে, এটি একটি ভীতিকর রূপান্তর।
গবেষক আরও বলেন, ‘রাতভর ধর্ষণ’, ‘উপর্যুপরি ধর্ষণ’ এবং ‘হিজড়া’ শব্দের ব্যবহারও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে। এসব শব্দ ও অভিব্যক্তির পরিবর্তে যথাযথ, সম্মানজনক ও জেন্ডার সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার করা প্রয়োজন।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আনওয়ারুস সালাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শেখ মনির উদ্দিন, দেশ টিভির সিনিয়র নিউজ এডিটর জান্নাতুল ফেরদৌসী মানু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সঞ্জয় দে রিপন।
উল্লেখ্য, ‘লেখনীতে সমতা’ শীর্ষক আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ও আন্ত-বিভাগীয় কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় প্লান ইন্টারন্যাশনাল, জাগো ফাউন্ডেশন ও কিংডম অফ নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতায় এ গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান আয়োজকরা।