মুসলিম বাহিনী যখন যাত্রা শুরু করল, তখন পরিবারের সদস্যরা বিদায় জানাতে এসে কান্না লুকাতে পারছিল না। কেউ পিতাকে বিদায় দিচ্ছে, কেউ ভাইকে, কেউ স্বামীকে।
এটা শুধু কেবল একটা সামরিক অভিযান ছিল না।
এ ছিল ঈমানের পথে আত্মোৎসর্গের এক মহাযাত্রা।
বিশ্ব যখন যুদ্ধের নামে নিষ্ঠুরতার উন্মত্ততায় ডুবে ছিল, তখন মুসলিম সেনাবাহিনী মানবতার পতাকা হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।
শামের দিকে অগ্রসর হতে হতে মুসলিম বাহিনী পৌঁছাল মুতা নামক প্রান্তরে।
সেখানে পৌঁছে তারা এমন এক দৃশ্য দেখল, যা অনেকের হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
রোমান সাম্রাজ্যের বিশাল বাহিনী এবং তাদের আরব মিত্ররা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়, তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে শত্রুপক্ষ মুসলিমদের তুলনায় বহু গুণ বড় ছিল।
তিন হাজার মুসলমান দাঁড়িয়ে আছে এক বিরাট শক্তির মুখোমুখি। সাহাবীদের মধ্যে মতানৈক্য তৈরী হলেও
আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার ঈমান জাগানো বক্তব্যে সাহাবিদের সাহস যোগালো, ভীত হৃদয়গুলো আবার দৃঢ় হয়ে উঠল। সাহাবিরা বুঝে গেলেন, সংখ্যার হিসাব দিয়ে ইতিহাস লেখা হয় না। ইতিহাস লেখে বিশ্বাস, সাহস আর আত্মত্যাগ।
অবশেষে যুদ্ধ শুরু হলো।
যায়েদ ইবনে হারিসা রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলামের পতাকা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলেন।
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাঃ এর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবি। একসময় দাস ছিলেন, পরে রাসূল সাঃ তাঁকে মুক্ত করে নিজের পরিবারের সদস্যের মর্যাদা দিয়েছিলেন।
আজ সেই যায়েদ ইসলামের পতাকা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করছেন।
চারদিক থেকে আঘাত আসছে।
তলোয়ার ঝলসে উঠছে।
বর্শা বিদীর্ণ করছে বক্ষ।
কিন্তু পতাকা নিচু হচ্ছে না।
অবশেষে অসংখ্য আঘাতে জর্জরিত হয়ে যায়েদ শহীদ হলেন।
তার রক্তে ভিজে গেল মুতার মাটি।
কিন্তু পতাকা মাটিতে পড়ল না।
জাফর ইবনে আবি তালিব ছুটে এসে পতাকা তুলে নিলেন।
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাঃ এর চাচাতো ভাই, আলী ইবনে আবি তালিবের বড় ভাই।
হাবশায় হিজরতের মহান নেতা।
আজ তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে ঈমানের এক জীবন্ত প্রতীক।
জাফর এমন বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন, যা দেখে শত্রুরাও বিস্মিত হয়েছিল।
এক পর্যায়ে তার ডান হাত কেটে ফেলা হলো।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাম হাতে পতাকা ধরলেন।
বাম হাতও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
তখন তিনি দুই বাহুর অবশিষ্ট অংশ দিয়ে পতাকাকে বুকে চেপে ধরলেন।
তিনি জানতেন, পতাকা পড়ে যাওয়া মানে মনোবল ভেঙে যাওয়া।
তাই নিজের শরীরকে পতাকার খুঁটি বানিয়ে দিলেন।
অবশেষে তিনি শহীদ হলেন।
তার শরীরে পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন।
কিন্তু পতাকা তখনও উঁচু ছিল।
পতাকা এবার পৌঁছাল আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার হাতে।
তিনি কিছুক্ষণ নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করলেন।
মানুষ হিসেবে মৃত্যুভয় তার মনেও এসেছিল।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তিনি নিজেকে ধমক দিলেন।
তিনি বললেন,
“হে আমার নফস! তুমি কি জান্নাতকে অপছন্দ করছ?”
এরপর তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন যুদ্ধের ময়দানে।
অল্প সময়ের মধ্যেই তিনিও শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন।
এক এক করে তিনজন নির্ধারিত সেনাপতি শহীদ।
যে ভবিষ্যদ্বাণী রাসূলুল্লাহ সাঃ করেছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল ভয়াবহ পরিস্থিতি।
যেকোনো বাহিনী এমন অবস্থায় ভেঙে পড়তে পারত।
কিন্তু মুসলমানরা ভেঙে পড়ল না।
তারা প্রমাণ করল, ইসলামে নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নেতৃত্ব একটি আদর্শের নাম।
সাহাবিরা পরামর্শ করে পতাকা তুলে দিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদের হাতে।
এটি ছিল তার ইসলাম গ্রহণের অল্প কিছুদিন পরের ঘটনা। কিন্তু তার অসাধারণ সামরিক মেধা ইতোমধ্যেই পরিচিত ছিল। খালিদ দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।
তিনি দ্রুত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলেন।
এটি এমন যুদ্ধ নয়, যেখানে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে পুরো বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে।
তিনি কৌশল বদলালেন। সেনাদের পুনর্বিন্যাস করলেন।
রাতে বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তন করলেন যাতে শত্রুরা মনে করে নতুন সাহায্য এসে পৌঁছেছে।
পরদিন যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে রোমানরা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। তারা ধারণা করল মুসলমানরা হয়তো নতুন শক্তিবৃদ্ধি পেয়েছে।
এই সুযোগে খালিদ ধীরে ধীরে বাহিনীকে নিরাপদে প্রত্যাহার করলেন।
এ ছিল কোনো কাপুরুষোচিত পলায়ন নয়।
এ ছিল একটি বাহিনীকে রক্ষা করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা।
এ ছিল দূরদর্শী নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ।
সেদিন যদি তিন হাজার সাহাবি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতেন, তাহলে ইসলামের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রা বড় ধরনের আঘাত পেতে পারত।
মদিনায় অবস্থানরত রাসূলুল্লাহ সাঃ তখন ওহির মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ পাচ্ছিলেন।
তিনি সাহাবিদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
এখন পতাকা নিয়েছেন যায়েদ, এবং তিনি শহীদ হয়েছেন। এরপর জাফর পতাকা নিয়েছেন, তিনিও শহীদ হয়েছেন। এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা পতাকা নিয়েছেন, তিনিও শহীদ হয়েছেন।
তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছিল।
এরপর তিনি বললেন,
“অবশেষে আল্লাহর তরবারিগুলোর একটি তরবারি পতাকা গ্রহণ করেছে।”
সেই দিন থেকেই খালিদ ইবনে ওয়ালিদ পেলেন অবিস্মরণীয় উপাধি, সাইফুল্লাহ—আল্লাহর তরবারি।
জাফর ইবনে আবি তালিবের শাহাদাতের পর রাসূলুল্লাহ সাঃ তার পরিবারকে দেখতে গেলেন।
শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি কাঁদলেন।
এরপর বললেন,
“আমি জাফরকে জান্নাতে দেখেছি। আল্লাহ তাকে দুটি ডানায় ভূষিত করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি ফেরেশতাদের সঙ্গে উড়ছেন।”
সেদিন থেকে জাফর পরিচিত হলেন “তাইয়ার” বা উড্ডয়নকারী জাফর নামে।
মুতার যুদ্ধের বাহ্যিক ফলাফল দেখলে কেউ বলতে পারে, এটি কোনো বড় বিজয় ছিল না।
মুসলমানরা শত্রু রাজধানী দখল করেনি।
কোনো বিশাল ভূখণ্ডও জয় করেনি।
কিন্তু ইতিহাসের গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এটি ছিল এক যুগান্তকারী মোড়।
প্রথমত, মুসলমানরা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তারা প্রমাণ করেছে যে ঈমান মানুষকে সংখ্যার সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে তুলে নিতে পারে।
তৃতীয়ত, এই যুদ্ধ ভবিষ্যতের শাম বিজয়ের দরজা খুলে দিয়েছিল।
যে রোমান শক্তিকে একসময় অজেয় মনে করা হতো, মুতার প্রান্তরে মুসলমানরা প্রথমবার তার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়েছিল।
এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বের উজ্জ্বল সূচনা ঘটে।
পরবর্তী সময়ে তার হাত ধরেই মুসলমানরা অসংখ্য ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করবে।
মুতা আমাদের শেখায়, বিজয় সবসময় মানচিত্রে মাপা যায় না।
কখনো বিজয় লুকিয়ে থাকে রক্তমাখা পতাকার মধ্যে।
কখনো বিজয় থাকে কাটা হাত দিয়েও পতাকা আঁকড়ে ধরা এক মুজাহিদের দৃঢ়তায়।
কখনো বিজয় থাকে এমন এক বাহিনীর মধ্যে, যারা জানে তারা সংখ্যায় কম, তবুও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে দ্বিধা করে না।
মুতার প্রান্তর আজও যেন আমাদের কানে ফিসফিস করে বলে,
মানুষের শক্তি সীমিত, কিন্তু ঈমানের শক্তি সীমাহীন।
জায়েদের রক্ত, জাফরের বিচ্ছিন্ন বাহু, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার দৃঢ় উচ্চারণ এবং খালিদের দূরদর্শী নেতৃত্ব একসঙ্গে মিলে যে ইতিহাস রচনা করেছিল, তা কেবল একটি যুদ্ধের ইতিহাস নয়; এটি আত্মত্যাগ, সাহস, আদর্শ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ইতিহাস।
মুতার বালুকাময় প্রান্তরে সেদিন তিন হাজার মানুষ শুধু যুদ্ধ করেনি। তারা ভবিষ্যতের মুসলিম সভ্যতার জন্য পথরেখা এঁকে দিয়েছিল। তাদের রক্তে লেখা হয়েছিল সেই বার্তা, যা যুগে যুগে সত্যের পথের পথিকদের অনুপ্রাণিত করবে—
জায়েদ, জাফর ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার শাহাদাত মুসলমানদের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। মুতার প্রান্তরে মুসলমানরা প্রথমবার বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রোমান সাম্রাজ্যের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিল, ইসলাম আর কেবল আরবের একটি আন্দোলন নয়; এটি ইতিহাস পরিবর্তনের শক্তি। কিন্তু সামনে আরও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল।
হিজরি নবম সালে আরবের আকাশে তখন প্রচণ্ড গ্রীষ্মের আগুন ঝরছে। খেজুর পাকার মৌসুম। মানুষ বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সময় পার করছে।
ঠিক এমন মুহূর্তে সংবাদ এলো, রোমান সাম্রাজ্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিশাল সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। সীমান্ত অঞ্চলে সেনা সমাবেশ শুরু হয়েছে।
সংবাদটি মদিনায় পৌঁছালে পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর হয়ে উঠল।এটি কোনো ছোট গোত্রের আক্রমণ ছিল না।
এটি ছিল সেই সাম্রাজ্যের হুমকি, যার নাম শুনে বহু জাতি কেঁপে উঠত। কিন্তু অপেক্ষা করলেন না। তিনি মুসলমানদের আহ্বান জানালেন তাবুক অভিযানের জন্য প্রস্তুত হতে। এবারের পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম।
আগের অনেক অভিযানে গন্তব্য গোপন রাখা হয়েছিল। কিন্তু এবার তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, গন্তব্য তাবুক, আর প্রতিপক্ষ রোমান শক্তি।
কারণ সামনে ছিল দীর্ঘ পথ, কঠিন আবহাওয়া এবং ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ।
মদিনার রাস্তাগুলোতে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
মুমিনদের হৃদয়ে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়কে অতিক্রম করে তারা প্রস্তুত হচ্ছিল।কেউ নিজের উট নিয়ে আসছে।
কেউ খাদ্য নিয়ে আসছে। কেউ নিজের সঞ্চিত সম্পদ তুলে দিচ্ছে। দারিদ্র্যের মধ্যেও যেন উদারতার এক মহাসমুদ্র প্রবাহিত হচ্ছিল। সেই দিন ইতিহাস দেখেছিল -এর বিস্ময়কর আত্মত্যাগ। আবু বকর রাঃ নিজের ঘরের প্রায় সব সম্পদ এনে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সামনে রেখে দিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাঃ জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর
“পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?”
তিনি শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
“আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে।”
অন্যদিকে হযরতে ওমর ফারুক রাঃ নিজের সম্পদের অর্ধেক নিয়ে এলেন।
তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো এবার তিনি আবু বকরকে ছাড়িয়ে যেতে পারবেন।
কিন্তু আবারও দেখলেন, ঈমানের প্রতিযোগিতায় আবু বকর যেন অন্য উচ্চতায় অবস্থান করছেন।
এদিকে এমনভাবে সাহায্য করলেন, যা পুরো অভিযানের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
তিনি শত শত উট, ঘোড়া এবং বিপুল অর্থ দান করলেন।
রাসূলুল্লাহ সাঃ তার জন্য দোয়া করলেন।
সাহাবিরা অনুভব করলেন, সম্পদ তখনই মহৎ হয়, যখন তা সত্যের পথে ব্যয় হয়। কিন্তু সবাই তো ধনী ছিল না। মদিনার গরিব সাহাবিরাও এই অভিযানে অংশ নিতে চেয়েছিলেন।
কিছু লোক রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর কাছে এসে বললেন,
“আমাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করুন।”
কিন্তু পর্যাপ্ত বাহন ছিল না।
রাসূলুল্লাহ সাঃ অসহায়ভাবে জানালেন, তিনি তাদের জন্য কোনো বাহনের ব্যবস্থা করতে পারছেন না।
তারা ফিরে গেলেন।
কিন্তু ফিরলেন চোখে অশ্রু নিয়ে।
তাদের কান্না ছিল না যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য।
তাদের কান্না ছিল, তারা আল্লাহর পথে বের হতে পারছেন না বলে।
ইতিহাস তাদের চেনে “বাক্কাউন” বা অশ্রুসিক্ত সাহাবি হিসেবে।
এমন ভালোবাসা, এমন আকুলতা, এমন আত্মনিবেদন পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে।
অন্যদিকে মুনাফিকদের চেহারাও তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
তারা নানা অজুহাত খুঁজতে লাগল।
কেউ বলল, গরম খুব বেশি।
কেউ বলল, ব্যবসার ক্ষতি হবে।
কেউ বলল, সামনে বিপদ।
কিন্তু ঈমান যখন হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন গরম, ক্ষুধা, ক্লান্তি কিংবা দূরত্ব মানুষকে থামাতে পারে না।
অবশেষে প্রায় ত্রিশ হাজার মুসলমানের বাহিনী তাবুকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।
এটি ছিল রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর নেতৃত্বে সর্ববৃহৎ সামরিক সমাবেশ। তাদের সামনে ছিল শত শত কিলোমিটারের পথ। জ্বলন্ত মরুভূমি। তপ্ত বালু। খাদ্যের সংকট। পানির অভাব।
দিনের পর দিন সূর্যের আগুন মাথায় নিয়ে তারা এগিয়ে চলল।
কখনো কয়েকজন মিলে একটি উটে চড়ছে।
কখনো দীর্ঘ পথ হেঁটে অতিক্রম করছে।
কখনো সামান্য পানি ভাগাভাগি করে পান করছে।
তবুও তাদের মুখে অভিযোগ ছিল না।
কারণ তারা জানত, কষ্টের এই পথই জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়।
যাত্রাপথে ক্ষুধা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অনেক সাহাবি খাদ্যের সংকটে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।
তবু তারা ফিরে যাননি।
তারা বুঝেছিলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি সহজে অর্জিত হয় না।
একসময় বাহিনী তাবুকে পৌঁছে গেল।
সেখানে পৌঁছে মুসলমানরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিল।
তলোয়ার প্রস্তুত।
ঢাল প্রস্তুত।
হৃদয় প্রস্তুত।
যে কোনো মুহূর্তে শুরু হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংঘর্ষগুলোর একটি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রত্যাশিত রোমান বাহিনী সামনে এলো না।
তারা মুসলমানদের এই বিশাল প্রস্তুতি এবং দৃঢ় সংকল্প দেখে পিছিয়ে গেল।
এটি ছিল এক অনন্য বিজয়।
এখানে রক্তের নদী প্রবাহিত হয়নি।
বড় কোনো যুদ্ধও হয়নি।
কিন্তু মুসলমানদের দৃঢ় অবস্থান পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দিয়েছিল।
সীমান্তবর্তী বহু গোত্র ও শাসক মুসলমানদের শক্তি উপলব্ধি করল।
তারা বুঝল, মদিনার এই রাষ্ট্র আর উপেক্ষা করার মতো কোনো শক্তি নয়।
তাবুকে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ সাঃ প্রায় বিশ দিন কাটালেন। তিনি কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতি নেননি; তিনি ভবিষ্যতের পথও নির্মাণ করছিলেন। কূটনীতি, চুক্তি এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি ইসলামের প্রভাবকে আরও সুদৃঢ় করলেন।তারপর ফিরে আসার সময় হলো।
বাহিনী মদিনার পথে রওনা দিল। কিন্তু এই অভিযানের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল মানুষের অন্তরের পরীক্ষা।
তাবুক প্রকাশ করে দিয়েছিল কে সত্যিকার মুমিন, আর কে শুধু মুখে ঈমানের দাবি করে।
যারা প্রচণ্ড গরমে, ক্ষুধায় এবং মৃত্যুর সম্ভাবনার মাঝেও বের হয়েছিল, তারা প্রমাণ করেছিল তাদের ভালোবাসা কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তারা নিজেদের জীবন দিয়েই ঈমানের সাক্ষ্য দিয়েছে।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়ে যারা তাবুকে অংশ নিয়েছেন তারা সফল ভাবে ফিরে এসেছেন।
কিন্তু যারা নানা অজুহাতে ঘরে বসে ছিল। তাদের মধ্যে মুনাফেক নন এমন সাহাবীও ছিলেন।
তারা ইসলামের শত্রুও ছিলেন না।
তারা ছিলেন সত্যিকারের মুমিন।
বদর, উহুদ, খন্দকসহ বহু কঠিন মুহূর্তে যাদের অবদান ছিল উজ্জ্বল। তবু জীবনের এক মুহূর্তে তারা এমন একটি ভুল করেছিলেন, যা তাদের হৃদয়কে ভেঙে দিয়েছিল।
ইসলামের ইতিহাসে তারা পরিচিত হয়ে আছেন সেই তিনজন সাহাবি হিসেবে, যাদের তওবা আসমান থেকে নাজিল হওয়া আয়াতের মাধ্যমে কবুল হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তাদের একজন ছিলেন কা’ব ইবনে মালিক অন্য দুজন হলেন মুরারা ইবনে রাবিয়া এবং হেলাল ইবনে উমাইয়াহ। তিনজনই ছিলেন সম্মানিত সাহাবি। তিনজনই ছিলেন আন্তরিক মুমিন।
তিনজনই রাসূলুল্লাহ সাঃ-কে ভালোবাসতেন।
কা’ব ইবনে মালিক (রা.) বলেন:
আমি রাসূলুল্লাহ -সাঃ এর সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো যুদ্ধে পিছিয়ে থাকিনি, তবে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি। বদরে যারা অনুপস্থিত ছিলেন, তাদের কাউকে তিরস্কার করা হয়নি।
তাবুকের সময় আমি আমার জীবনের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচ্ছল ছিলাম। আল্লাহর কসম! এর আগে কখনো আমার কাছে একসঙ্গে দুটি বাহন ছিল না, অথচ তাবুকের সময় আমার কাছে দুটি বাহন ছিল।
রাসূলুল্লাহ সাঃ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, আর আমি মনে মনে বলছিলাম, ‘আমি কাল প্রস্তুতি নেব, কাল বের হব।’
কিন্তু এভাবে দিন চলে যেতে লাগল। লোকেরা প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলল। রাসূলুল্লাহ সাঃ এবং মুসলমানরাও রওনা হয়ে গেলেন। অথচ আমি এখনো কোনো প্রস্তুতি সম্পন্ন করিনি।
আমি ভাবলাম, আজ বের হয়ে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাব। কিন্তু তা আর হলো না।
যখন আমি শহরে বের হতাম, তখন আমার খুব কষ্ট হতো। কারণ আমি দেখতাম, যারা থেকে গেছে তারা হয় মুনাফিক, নয়তো এমন লোক যারা সত্যিই অক্ষম।
এরপর তিনি বলেন:
রাসূলুল্লাহ সাঃ তাবুক থেকে ফিরে এসে মসজিদে বসলেন। তখন যারা পিছিয়ে ছিল তারা একে একে এসে শপথ করে নানা অজুহাত পেশ করতে লাগল।
তাদের সংখ্যা ছিল আশিরও বেশি।
রাসূলুল্লাহ সাঃ তাদের বাহ্যিক বক্তব্য গ্রহণ করলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমার দোয়া করলেন।
এরপর আমি তাঁর সামনে উপস্থিত হলাম।
তিনি আমাকে দেখে মৃদু হাসলেন, তবে সেটি ছিল অসন্তুষ্টির হাসি।
তিনি বললেন, “এসো।”
আমি গিয়ে তাঁর সামনে বসলাম। তিনি বললেন, “তুমি কেন পিছিয়ে রইলে? তুমি কি বাহন কিনে নাওনি?”
আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম, আমি যদি পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষের সামনে বসতাম, তাহলে কোনো অজুহাত দিয়ে তার অসন্তোষ থেকে বাঁচতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আজ যদি আমি আপনাকে মিথ্যা বলে সন্তুষ্ট করি, তবে অচিরেই আল্লাহ আপনাকে আমার ব্যাপারে অসন্তুষ্ট করে দেবেন।
আর যদি আমি সত্য বলি, যদিও এতে আপনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট হন, তবে আমি আল্লাহর কাছে উত্তম পরিণতির আশা রাখি।
আল্লাহর কসম! আমার কোনো অজুহাত ছিল না। আমি কখনোই তাবুকের সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী বা বেশি সচ্ছল ছিলাম না।”
কা’ব (রা.) বলেন:
তখন রাসূলুল্লাহ সাঃ বললেন,
“এ ব্যক্তি সত্য বলেছে। তুমি অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তোমার ব্যাপারে ফয়সালা করেন।”
এরপর শুরু হয় সামাজিক বয়কট।
কা’ব (রা.) বলেন:
রাসূলুল্লাহ সাঃ মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন, তারা যেন আমাদের তিনজনের ( কা’ব ইবনে মালিক,মুরারা ইবনে রাবিয়াহ,হেলাল ইবনে উমাইয়াহ) সঙ্গে কথা না বলে।
ফলে লোকেরা আমাদের এড়িয়ে চলতে শুরু করল।
এমনকি পৃথিবীও আমার কাছে অপরিচিত মনে হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, এ সেই পৃথিবী নয়, যাকে আমি আগে চিনতাম।
তিনি আরও বলেন:
আমি মসজিদে যেতাম এবং রাসূলুল্লাহ সাঃ-কে সালাম দিতাম। তারপর ভাবতাম, তিনি কি আমার সালামের জবাব দেওয়ার জন্য ঠোঁট নড়ালেন, নাকি নড়ালেন না?
আমি তাঁর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তাম এবং আড়চোখে তাঁর দিকে তাকাতাম।
আমি নামাজে মনোযোগ দিলে তিনি আমার দিকে তাকাতেন। আর আমি তাঁর দিকে তাকালে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন। এরপর পঞ্চাশ দিনের পরীক্ষার কথা বর্ণনা করে তিনি বলেন:
যখন পঞ্চাশতম দিনের সকাল হলো, আমি আমার ঘরের ছাদে বসে ছিলাম। তখন একজন ব্যক্তি পাহাড়ের ওপর উঠে সর্বোচ্চ কণ্ঠে চিৎকার করে বলল:
“হে কা’ব ইবনে মালিক! সুসংবাদ!”
আমি সঙ্গে সঙ্গে সিজদায় পড়ে গেলাম।
কারণ আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে মুক্তির সংবাদ এসেছে।
এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর কাছে যান।
আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। লোকেরা আমাকে অভিনন্দন জানাতে লাগল। আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর কাছে পৌঁছালাম। তাঁর চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তিনি বললেন:
“সুসংবাদ গ্রহণ করো! তোমার জন্মের পর থেকে আজকের দিনটি তোমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন।”
আমি বললাম:
“হে আল্লাহর রাসূল! এ ক্ষমা কি আপনার পক্ষ থেকে, নাকি আল্লাহর পক্ষ থেকে?”
তিনি বললেন:
“না, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে।”
এই ঘটনার পর আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করেন:
“আর তিনি দয়া করলেন সেই তিনজনের প্রতিও, যারা পিছিয়ে ছিল। অবশেষে পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের কাছে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, তাদের মনও তাদের জন্য ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল এবং তারা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছিল যে আল্লাহ ছাড়া আশ্রয়ের আর কোনো স্থান নেই। তারপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করলেন, যাতে তারা তওবা করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।” (সূরা আত-তাওবা: ১১৮)
চলবে –
লেখক: আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ, ইউরোপ।