• বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন

মতামত

ভয়কে হারিয়ে সাফল্যের পথে অমিতের জয়যাত্রা

লেখক:ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম। দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ আপনাদের জন্য আজকে এমন একটি টিপস নিয়ে আলোচনা করব। যা সত্যিই আমাদের জীবনের চলার পথে উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চলুন গল্পটি শুরু করা যাক আর সাথেই থাকুন।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরে থাকে না, তা থাকে তার নিজের মনের ভেতরে—ভয় হিসেবে। এই সত্যকে কেন্দ্র করে এবং ভয়কে জয় করার উপায় নিয়ে নিচে একটি রূপক উপাখ্যান দেওয়া হলো:

“অরণ্যের সীমান্ত ও অমিতের জয়যাত্রা”

অনেক দিন আগের কথা। এক পাহাড়ের পাদদেশে ছিল একটি শান্ত ও সমৃদ্ধ গ্রাম। সেই গ্রামের মানুষেরা সুখে দিন কাটালেও তাদের মনে একটি বড় আক্ষেপ ছিল। পাহাড়ের ওপারে ছিল এক “সোনার উপত্যকা”, যেখানে নাকি রয়েছে অপার সম্ভাবনা, অফুরন্ত সম্পদ আর জীবনের পরম উন্নয়ন। কিন্তু সেই উপত্যকায় যাওয়ার একমাত্র পথটি চলে গেছে এক ঘন, অন্ধকার অরণ্যের ভেতর দিয়ে।
গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, ওই অরণ্যে এক অদৃশ্য দানব বাস করে। যে-ই সেখানে পা বাড়ায়, দানব তাকে গ্রাস করে। ফলে, বহু বছর ধরে কেউ সেই বনে যাওয়ার সাহস করেনি। তারা নিজেদের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে এক সীমাবদ্ধ জীবনে আটকে ছিল।
সেই গ্রামেই বাস করত অমিত নামের এক তরুণ। অমিতের মনে সবসময় এক অদম্য ইচ্ছা কাজ করত—সে নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চায়, জীবনের প্রকৃত উন্নয়ন দেখতে চায়। সে বুঝতে পারল, বাইরের কোনো দেওয়াল বা পাহাড় তাদের আটকে রাখেনি, আটকে রেখেছে মনের ভেতরের এক অদৃশ্য ভয়।
একদিন সকালে অমিত সিদ্ধান্ত নিল, সে সেই অরণ্যে প্রবেশ করবে। গ্রামের প্রবীণরা তাকে বাধা দিয়ে বললেন, “যেখানে কেউ ফিরে আসেনি, সেখানে যেও না অমিত। ওই দানব তোমাকে ধ্বংস করে দেবে।”
অমিত শান্ত গলায় উত্তর দিল, “মানুষের জীবনের উন্নয়নে কোন কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না কেবলমাত্র অন্তর্নিহিত ভয় ছাড়া। আমি সেই ভয়ের মুখোমুখি হতে চাই।”
প্রথম পদক্ষেপ: ভয়কে চেনা এবং স্বীকার করা
অমিত যখন অরণ্যের সীমানায় পৌঁছাল, তার বুক দুরুদুরু কাঁপছিল। চারপাশটা ছিল কুয়াশায় ঘেরা এবং থমথমে। তার ভেতরের মন বলছিল, “ফিরে যাও!” কিন্তু অমিত পালালো না। সে এক মুহূর্ত থামল, নিজের জোরে জোরে চলা শ্বাস-প্রশ্বাসকে অনুভব করল। সে নিজেকে বলল, “হ্যাঁ, আমি ভয় পাচ্ছি। আর এই ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক।”

ভয় জয়ের প্রথম শিক্ষা:

ভয়কে অস্বীকার বা লুকিয়ে না রেখে, সেটি যে মনের মধ্যে আছে তা প্রথমে সাহসের সাথে স্বীকার করতে হয়।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ:

কৌতূহল দিয়ে ভয়কে বিশ্লেষণ করা
অমিত অরণ্যের গভীরে যতই এগোতে লাগল, চারপাশের গাছগুলোর ডালপালাকে মনে হতে লাগল এক একটা বিশাল হাত, যা তাকে ধরতে আসছে। বাতাসে পাতার মড়মড় শব্দকে মনে হতে লাগল দানবের গর্জন। অমিত ভয়ে চোখ বন্ধ না করে, তার হাতের মশালটি উঁচিয়ে ধরল।
সে ভালো করে লক্ষ্য করল—যেটিকে সে দানবের হাত ভাবছিল, সেটি আসলে একটি শুকনো বটগাছের ডাল। আর যে গর্জন সে শুনছিল, তা আসলে পাহাড় থেকে নেমে আসা বাতাসের প্রতিধ্বনি। যখনই সে আলো ফেলে সত্যটা দেখল, তার মনের অর্ধেক ভয় কেটে গেল।

ভয় জয়ের দ্বিতীয় শিক্ষা:

ভয়ের উৎসকে অন্ধের মতো বিশ্বাস না করে, কৌতূহল ও যুক্তির আলো দিয়ে তাকে বিশ্লেষণ করতে হয়। কাল্পনিক ভয়গুলো তখন মিলিয়ে যায়।

তৃতীয় পদক্ষেপ:

ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়া
একপর্যায়ে বনের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হলো। অমিতের মনে হলো সে আর এক পা-ও এগোতে পারবে না। পুরো বন পার হওয়া তার কাছে অসম্ভব মনে হলো। তখন সে এক বুদ্ধি করল। সে পুরো বনের কথা চিন্তা না করে, শুধু সামনের পাঁচটি পদক্ষেপের দিকে মনোযোগ দিল। সে নিজেকে বলল, “আমি পুরো বন একবারে পার হব না, আমি শুধু সামনের এই পাঁচ হাত পথ পার হব।” এভাবে ছোট ছোট লক্ষ্য স্থির করে সে অবিরত এগিয়ে চলল।

ভয় জয়ের তৃতীয় শিক্ষা:

বড় কোনো লক্ষ্য বা বড় ভয়ের সামনে থমকে না গিয়ে, কাজটাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে প্রতিদিন অল্প অল্প করে এগিয়ে যেতে হয়।

চতুর্থ পদক্ষেপ:

চূড়ান্ত মুখোমুখি হওয়া
হঠাৎ বনের ঠিক মাঝখানে এসে অমিতের সামনে এক বিশাল অবয়ব এসে দাঁড়াল। সেটি দেখতে কুৎসিত, কালো এবং তার গা থেকে এক তীব্র ঠাণ্ডা হাওয়া বের হচ্ছিল। অবয়বটি গর্জে উঠে বলল, “আমিই এই অরণ্যের দানব! আমিই মানুষের সমস্ত ইচ্ছাশক্তি চুষে নিই। ফিরে যাও, নাহলে শেষ হয়ে যাবে!”
অমিতের পা জমে বরফ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। কিন্তু এবার সে পালালো না। সে তার মশালটি শক্ত করে ধরে দানবের চোখের দিকে তাকাল এবং এক পা এগিয়ে গেল। অমিত যত এক পা এগোয়, দানবটি যেন আকারে একটু ছোট হয়ে যায়। অমিত আরও এক পা এগিয়ে চিৎকার করে বলল, “তুমি আমার মনের ভুল ছাড়া আর কিছুই নও!”
আশ্চর্যজনকভাবে, অমিত যখনই সম্পূর্ণ সাহস সঞ্চয় করে দানবটির একদম মুখোমুখি দাঁড়াল, দানবটি ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল। সেখানে পড়ে রইল শুধু একটা পুরনো আয়না। অমিত আয়নায় তাকাল এবং বুঝতে পারল—দানবটি আসলে অন্য কেউ নয়, তার নিজেরই ভয়ার্ত মনের এক প্রতিচ্ছবি মাত্র।

উপসংহার
অরণ্যের অন্ধকার কেটে গেল। ভোরের প্রথম সূর্যকিরণ এসে পড়ল অমিতের মুখে। সে অরণ্য পার হয়ে পৌঁছে গেল সেই কাঙ্ক্ষিত “সোনার উপত্যকায়”।
সে বুঝতে পারল, অরণ্যের দানবটি আসলে কোনো বাহ্যিক বাধা ছিল না, তা ছিল মানুষের মনের অন্তর্নিহিত ভয়। যারা সেই ভয়ের কারণে অরণ্যের শুরুতে এসে ফিরে গেছে, তারা কখনো উপত্যকার দেখা পায়নি। আর অমিত ভয়কে চিনে, বিশ্লেষণ করে, ছোট ছোট পদক্ষেপে তার মুখোমুখি হয়েছিল বলেই আজ সে বিজয়ী।
মানুষের জীবনও ঠিক এই অরণ্যের মতোই। আমাদের লক্ষ্য আর সফলতার মাঝে একমাত্র বাধা আমাদের ভেতরের ভয়—ব্যর্থতার ভয়, সমাজ কী বলবে সেই ভয়, বা পরিবর্তনের ভয়। এই ভয়কে জয় করতে পারলেই মানুষের জীবনের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১