• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩২ অপরাহ্ন

এলডিসি উত্তরণে দুই বছর প্রস্তুতি, ছয় মাস সমন্বয়: ইআরডি সচিব

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ সব ধরনের সুবিধা হারাবে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স, প্রস্তুতি ও সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এরপর বাকি ছয় মাস থাকবে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য। এ জন্য একটি রোডম্যাপ ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এসব কথা বলেন।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মতিঝিলের ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল শিফট ইন দ্য পোস্ট-এলডিসি ইরা: স্ট্র্যাটেজিস ফর আইপিআর ইস্যুজ অব কি ইন্ডাস্ট্রিজ’ শীর্ষক এক ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে (এফজিডি) প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) যৌথভাবে এ ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম জাহাঙ্গীর। এরপর স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর কী কী সুবিধা থাকবে এবং কোথায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি দরকার। সরকার এ জন্য রোডম্যাপ ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করছে। এতে সরকারের করণীয়ের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের করণীয়ও নির্ধারণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিসিআই) ও এফবিসিসিআইসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় রোডম্যাপটি আরও পরিশোধিত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘এগুলো কোনো চূড়ান্ত ডকুমেন্ট নয়। জনগণের প্রয়োজন ও চাহিদা কী, সেটিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। আমাদের নিজেদের চাহিদা যেমন আছে, তেমনি আন্তর্জাতিক মান ও ভালো চর্চাও রয়েছে। আমাদের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই এগোতে হবে।’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনি দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান ইআরডি সচিব। তিনি বলেন, অনেক সময় আন্তর্জাতিক আলোচনায় আইনি দক্ষতার ঘাটতি দেখা যায়। কীভাবে এই ঘাটতি পূরণ করা যায়, সরকার আন্তরিকভাবে সে চেষ্টা করছে।

এলডিসি উত্তরণের পর ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরে আমরা কি সব সুবিধা হারাচ্ছি? আসলে সব সুবিধা হারাব না। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি দরকার।’

এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক পরামর্শের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সরকার সব ধরনের অংশীজনের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে যেসব সমস্যা উঠে আসবে, সেগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা হবে।

দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) উল্লেখ করে ইআরডি সচিব বলেন, নীতি ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এসএমই খাতকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটি এখন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ঢাকার ধোলাইখাল, কেরানীগঞ্জ, সাভার, ভৈরবসহ বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বংশপরম্পরায় বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছেন। তাদের একদিকে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা বিশাল। সামান্য নকশাগত পরিবর্তন ও মানোন্নয়ন করা গেলে এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

গবেষণা খাতে বরাদ্দ ব্যবহারের ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। সম্প্রতি অর্থসচিবের সঙ্গে আলোচনার সময় গবেষণা খাতে বরাদ্দের অর্থ কতটা ব্যবহার হচ্ছে, তা জানতে চেয়েছিলেন জানিয়ে শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, অর্থসচিব তাকে জানিয়েছেন, অর্থ থাকলেও তা দেওয়া যাচ্ছে না। পরে দেখা গেছে, বিভিন্ন সংস্থা ওই অর্থ ব্যবহার করতে পারে না।

তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। তবে কোথাও কোথাও ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ছোট ছোট কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসএমই নিয়ে কয়েকটি জায়গায় আলোচনা হয়েছে এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাত নিয়েও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।

এসএমই খাতে অর্থায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার এ খাতে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ স্কিম ঘোষণা করেছে, যা মূলত মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এমএসএমই) জন্য করা হয়েছে। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না, সেটির যথাযথ ব্যবহার ও টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ইআরডি সচিব বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সমন্বয়। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও একাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র তৈরি করা প্রয়োজন। এ জন্য রোডম্যাপ ও অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী প্রতিটি খাত ও বিভাগের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট আলোচনা করা হবে। কোথায় আইন, বিধি বা দৈনন্দিন কার্যক্রমে পরিবর্তন, সংযোজন কিংবা পরিমার্জন দরকার, তা পর্যালোচনা করা হবে।

সরকারকে টাস্কফোর্স গঠন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেখানে পরিবর্তন দরকার, সেখানে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হবে। বিভিন্ন আলোচনা থেকে তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। কোন জায়গায় অসচ্ছতা রয়েছে, কোথায় প্রক্রিয়া জটিল, কোথায় মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে-এসব বিষয় চিহ্নিত করা হচ্ছে।

সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, বিভিন্ন ধরনের সরকারি সেবা পুরোপুরি ডিজিটালাইজ করার কাজ শুরু হয়েছে। মানুষের যেখানে বেশি প্রয়োজন, সেসব সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হবে।

বাংলাদেশের নিজস্ব মানদণ্ড তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। শুধু আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করলেই হবে না; বাংলাদেশের এমন একটি মানদণ্ড তৈরি করতে হবে, যেটিকে আন্তর্জাতিকভাবেও ভালো মান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়। তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের মান বজায় রাখার পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) শিল্প খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে গবেষণা ও উন্নয়নে সহায়তা করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে একাডেমিয়া ও সরকারের মধ্যকার দূরত্ব কমাতে হবে।

এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা প্রসঙ্গে শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, তিন বছর সময় খুব বেশি নয়। তাই পুরো তিন বছর অপেক্ষা না করে পরিকল্পনা আরও আগেই বাস্তবায়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আগামী ২৪ মাস বা দুই বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স, প্রস্তুতি ও অন্যান্য ইস্যুতে কাজ করে একটি পর্যায়ে যেতে চায় সরকার। বাকি ছয় মাসে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও অপারেশন সফল করার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা হবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের (আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে) আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছি যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমরা একটি পরিকল্পনা করছি। তারা আমাদের তিন বছর সময় দেবে, কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা আরও কম সময়ের। গত ২৪ মাসে আমরা যত ধরনের কমপ্লায়েন্স, রেডিনেস ও ইস্যু আছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করে একটি পর্যায়ে যেতে চাই। বাকি ছয় মাসে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও অপারেশন সফল করার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করব।’

তবে সব আইন ও নীতি রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয় বলে সতর্ক করেন তিনি। কোনো আইন বা নীতি পরিবর্তনের আগে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন, নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিতে হবে বলে জানান তিনি।

সবশেষে শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, এলডিসি উত্তরণ মোকাবিলায় মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি কার্যকর সাপোর্ট স্ট্রাকচার তৈরি করা, যেখানে সরকার, বেসরকারি খাত, শিল্প, একাডেমিয়া ও অন্যান্য অংশীজন একসঙ্গে কাজ করবে। কৃষি, তৈরি পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যালস কিংবা ক্ষুদ্র খাত—প্রতিটি খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা কাঠামো তৈরি করতে হবে।

‘কোন জায়গায় কী জ্ঞান দরকার, কী ধরনের সক্ষমতা উন্নয়ন দরকার, কী আইনি কাঠামো দরকার-সবকিছু নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। নীতি সমন্বয়, বাস্তবায়ন, আর্থিক সহায়তা-সব ক্ষেত্রেই প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরা একযোগে কাজ করলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব,’ বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের ফ্যাকাল্টি অব ল এবং ডব্লিউআইপিও একাডেমির সাবেক পরামর্শক মোহাম্মদ আতাউল করিম।

সভায় ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ফায়েজ আহমেদ, ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রইসুল কবির, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইপিএবি) পরিচালক জেনারেল এমদাদুল আজিজুর রহমান, বিজিএমইএর সেক্রেটারি জেনারেল মেজর জেনারেল ড. মো. শাহেদুল ইসলাম (অব.) এবং বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমানসহ অনেকে বক্তব্য দেন।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০