মুসলিম হিসেবে আমি, আপনি এবং আমরা সব মুসলিমই কোরআনের প্রতি ঈমান ও ভালোবাসা পোষণ করি। আমরা কোরআন থেকে বিভিন্ন উপায়ে সওয়াব ও উপকার হাসিল করার চেষ্টা করি কিন্তু খুব কম লোকই আমরা কোরআনকে অধ্যয়ন করি, অনুসরণ করি এবং কোরআনের সাথে পথ চলি।
ইতিহাস সাক্ষী কুরআনের নির্দেশিত জীবন পদ্ধতি সত্য, একমাত্র সত্য, সঠিক, নির্ভুল, যুক্তিসঙ্গত, বাস্তব, কল্যাণকর। এর কারণ এ পদ্ধতি মানুষের স্রষ্টার দেওয়া পদ্ধতি। কোরআনের সাথে পথ না চললে ক্ষতি, জীবনে এবং মরণে ক্ষতি পরকালীন জীবনে অনন্ত ক্ষতির সম্মুখীন তো হতেই হবে।
অপরদিকে কোরআনের সাথে পথ চললে লাভ সীমাহীন, লাভ জীবনে এবং মরণে। আর অনন্ত জীবনে অসীম লাভ হবে অবশ্যই। এই কথাটা বুঝে ছিলেন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা। কোরআনের জন্য ভাইয়ের হাতে রক্তাক্ত হয়েও দুর্জয় ঘোষণা উচ্চারণ করেন কোরআনের পথে অটল থাকার, কুরআনের সাথেই পথ চলার । একথা বুঝেছিলেন ফাতিমার ভাই ওমর (রাঃ) কোরআনের পথ ধরার কারণে তিনি বোন, ভগ্নিপতিকে বেদন প্রহার করেন, তাদের রক্তাক্ত করেন, কিন্তু কোরআন পড়ে দেখার পর তিনি আজীবন অটল, অবিচল থাকেন কোরআনের নির্দেশিত জীবন পদ্ধতির উপর। সারা জীবন পথ চলেন কুরআনের পথ ধরে।
মানুষকে সফলতায় পৌঁছানোর জন্য কোরআন মাজিদে প্রয়োজনীয় বক্তব্য বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যাতে করে মানুষ 1. তার চিন্তা শক্তিকে বিকশিত করে তোলে। 2. তার সুপ্ত চেতনাকে জাগ্রত করে। 3. তার বিবেককে শাণিত ও সনাক্তকারী বানিয়ে তোলে। 4. তার নৈতিক শক্তিকে দুর্জয় করে তোলে। ৫. তার আত্মাকে অনাবিল পবিত্রতায় ঝকঝকে করে তোলে| ৬. তার দৃষ্টি গন্তব্য পানে অপলক হয়ে থাকে এবং 7. তার পথ ও পাথেয় তার কাছে সত্যজ্ঞানে উদ্ভাসিত থাকে।
এর জন্য প্রয়োজন মনোযোগী কোরআন পাঠ, এর জন্য প্রয়োজন চিন্তা ও চরিত্রে, বিশ্বাস ও কর্মে, চেতনা ও প্রেরণায়, পনে ও প্রচেষ্টায়, ত্যাগে ও তৎপরতায় এবং প্রার্থনা ও পদক্ষেপে কোরআনের সাথে পথ চলা।
কোরআন সম্পর্কে কোরআনের ভাষ্য হল: আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে একটি আলো এবং একটি প্রকাশমান কিতাব। এর দ্বারা আল্লাহ তার সন্ধানকারীদের নিয়ে আসেন শান্তির পথে এবং নিজের ইচ্ছায় তাদের বের করে আনেন অন্ধকার রাশি থেকে অনাবিল আলোর দিকে। আর তাদের পরিচালিত করেন সোজা, সঠিক পথে| সূরা আল মায়েদা আয়াত ১৫-১৬
আল্লাহর প্রতি ঈমান আর কোরআনকে আঁকড়ে ধরাই মানুষের জন্য একমাত্র সঠিক পথ। একমাত্র আলোর পথ। এটিই কল্যাণ লাভের একমাত্র পথ।
সূরা আন নিসা- ১৭৪-৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, হে মানুষ, তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে তো এসেই রয়েছে একটি প্রমাণ, আর সেই সাথে আমি তো তোমাদের কাছে পাঠিয়েছি এক সম উদ্ভাসিত আলো। এখন যারা ঈমান আনবে আল্লাহর প্রতি আর আঁকড়ে ধরবে সেই আলোকে (আল কোরআনকে) তিনি তাদের দাখিল করবেন তার দয়া ও অনুগ্রহের ছায়ায়, আর তাদের পরিচালিত করবেন সঠিক পথে।
মানব সমাজের একদল লোক নিজেদের জীবন পরিচালনা করে অজ্ঞতা ও অনুমানের ভিত্তিতে, তারা হাবুডুবু খায় অন্ধকারে, তারা অন্ধকারে পথ চলে, তারা দিকভ্রান্ত, তারা দিশেহারা। অপরদিকে রয়েছে কোরআনের সাথী, কোরআনের বাহক, কোরআন ওয়ালা।
আলোকিত মুমিন তিনি নিজে আলোকিত, তার বিশ্বাস আলোকিত, তার পথ আলোকিত, তার পরিবেশ আলোকিত, তার লক্ষ্য ও গন্তব্য আলোকিত, তিনি প্রতিটি কদম ফেলেন স্বচ্ছ সুস্পষ্ট আলোকিত লক্ষ পথের ওপর, কোরআনওয়ালা এই আলোকিত মুমিনের জীবন পথে কোথাও সংশয় নেই, কোথাও তার শঙ্কা নেই, কোথাও তার অস্থিরতা নেই। কোরআনওয়ালা মুমিনের প্রতিটি পদক্ষেপ প্রকৃত সত্য জ্ঞানে আলোকিত।
সূরা ইউসুফ এর ১০৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, হে মোহাম্মদ, বলে দাও, এটিই আমার পথ, আমি মানুষকে আহবান করি আল্লাহর প্রতি, সত্য জ্ঞানের ভিত্তিতে। আমি এবং আমার অনুসারিরাও সুবহানাল্লাহ, আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।
এ কোরআন এমন পথপ্রদর্শন করে যা সঠিক ও সুদৃঢ়, যেসব মুমিন এর আলোকে যোগ্যতার সাথে শুদ্ধতার কাজ করে এ কোরআন তাদের শুভ সংবাদ দেয় মহাপ্রতিদানের। সূরা বনী ইসরাইল আয়াত ৯।
আসুন আমরা কোরআন অধ্যয়ন করি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হৃদয় দিয়ে কোরআনকে উপলব্ধি করি, সাহাবাকরামের হৃদয় দিয়ে কুরআনকে বুঝার চেষ্টা করি। আসুন অঙ্গীকার করি, আমরা কোরআনের প্রতিটি আয়াতকে ছাপার অক্ষর থেকে আর আমাদের স্মৃতি পথ থেকে বের করে এনে আমাদের বাস্তব জীবনে জীবন্ত করে তুলবো। কোরআনের প্রতিটি কথাকে আমাদের সামনে দাঁড় করাবো, আমরা কোরআনের সাথে পথ চলব, কোরআনে ভাষায় কথা বলব, কোরআন আমাদের ডাকছে, আমাদের মহান স্রষ্টা ও মালিকের একত্ব ঘোষণা করছে। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করেন, আমিন।
লেখক: হাফেজ মাওলানা কামাল হোসাইন