আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আজকে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে আলোচনা করব। সাথেই থাকুন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, অব্যবস্থাপনা এবং এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বাস্তবসম্মত কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। নিচে আপনাদের প্রশ্নগুলোর একটি নিরপেক্ষ এবং তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দ ও বার্ষিক খরচ:
সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর আগের বছর, অর্থাৎ সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪১,৯০৮ কোটি টাকা (যা পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে প্রায় ৩৫,৪৭৭ কোটি টাকায় নেমে আসে)। দেশের মোট বাজেটের তুলনায় এই বরাদ্দ সাধারণত ৫% থেকে ৫.৫% এর আশেপাশে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, একটি দেশের মোট বাজেটের অন্তত ১৫% স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত, সেই তুলনায় বাংলাদেশের বার্ষিক খরচ বা বরাদ্দ এখনও বেশ অপ্রতুল।
২. সরকারি হাসপাতালে অনুন্নত/অচল চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সিন্ডিকেট:
সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় দামি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি (যেমন: এমআরআই, সিটি স্ক্যান বা এক্স-রে মেশিন) প্যাকেটবন্দী হয়ে পড়ে আছে অথবা সামান্য ত্রুটির কারণে অকেজো হয়ে আছে। এর পেছনে মূলত একটি শক্তিশালী “মেডিকেল ইকুইপমেন্ট সিন্ডিকেট” কাজ করে। এই সিন্ডিকেটের মেকানিজমটি নিম্নরূপ:
ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি (Procurement Corruption):
হাসপাতালের প্রয়োজন না থাকলেও শুধুমাত্র কমিশনের লোভে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিম্নমানের বা অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বেশি দামে কেনা হয়।
কৃত্রিম সংকট তৈরি:
অনেক সময় সরকারি হাসপাতালের মেশিনগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করে রাখা হয় বা সামান্য নষ্ট হলে তা মেরামত করা হয় না। এর উদ্দেশ্য হলো, রোগীরা যেন বাধ্য হয়ে হাসপাতালের ঠিক বাইরে গড়ে ওঠা বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দ্বিগুণ-ত্রিগুণ খরচে পরীক্ষাগুলো করাতে যান। এই বেসরকারি ল্যাবগুলোর মালিকানার সাথে অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী বা হাসপাতালের ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকেন।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাব:
বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারদের অভাব এবং সরকারিভাবে যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের (Maintenance) সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা বা বাজেট না থাকায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়।
৩. দেশের বাইরের হাসপাতাল এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর “চকচকে” অবয়ব:
বেসরকারি ক্লিনিক এবং দেশের বাইরের (যেমন: ভারত, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুর) হাসপাতালগুলোর এই বাহ্যিক জাঁকজমকের পেছনে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে:
কর্পোরেট হসপিটালিটি (সেবার বিপণন): চিকিৎসা এখন আর কেবল রোগ নিরাময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি বৃহৎ শিল্প। বেসরকারি বা বিদেশি হাসপাতালগুলো রোগীকে কেবল ‘রোগী’ হিসেবে নয়, বরং একজন ‘গ্রাহক’ (Customer) হিসেবে দেখে। পাঁচতারা হোটেলের মতো পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, এবং ভালো ব্যবহার দিয়ে তারা রোগীদের মানসিক স্বস্তি দেয়, যা ব্যবসার একটি বড় কৌশল।
আস্থার সংকট দূর করা: আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ, উপচে পড়া ভিড় এবং সেবার অভাব মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই মানসিকতাকে পুঁজি করে। মানুষ ভাবে—যেহেতু পরিবেশ এত আধুনিক ও চকচকে, নিশ্চয়ই চিকিৎসাও আন্তর্জাতিক মানের হবে। তবে অনেক সময় এই চকচকে অবয়বের আড়ালে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট এবং মাত্রাতিরিক্ত খরচের ফাঁদও থাকে।
৪. আল্টিমেট ক্ষতিগ্রস্ত কারা হচ্ছে?:
এই পুরো অব্যবস্থাপনার চাকাটি ঘুরছে সাধারণ মানুষের পকেটের টাকায়। আল্টিমেট বা চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী।
আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার (ব্যক্তিগত খরচ):
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৮% এরও বেশি টাকা রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
দারিদ্র্যের ফাঁদ:
একটি সাধারণ পরিবারের কেউ যখন ক্যান্সার, কিডনি বা হার্টের মতো বড় রোগে আক্রান্ত হন, তখন সরকারি হাসপাতালে সেবা না পেয়ে জমিজমা বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে অথবা বিদেশে যান। এর ফলে প্রতি বছর দেশের লাখ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র সীমার নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় মেধা ও অর্থ পাচার:
বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সারসংক্ষেপ:
বাংলাদেশের চিকিৎসকদের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হলেও স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক অবহেলা, জবাবদিহিতার অভাব এবং বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ মানুষ তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রয় প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত না করলে এই ক্ষতির বৃত্ত থেকে বের হওয়া কঠিন।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম,
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।