• বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০৯:৩৪ অপরাহ্ন

মতামত

“আলেম সমাজে মতপার্থক্য: বৈচিত্র্য না বিভেদ”

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম। দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় পাঠক বৃন্দ, আজকে আমি আপনাদের সামনে আলেম সমাজের মধ্যে যে মতপার্থক্য গুলো দেখা যায় তার উৎস এবং এর সমাধান কিভাবে হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করব। সাথেই থাকুন।

ইসলামী শরিয়াহ এবং বিদায় হজের ভাষণের সেই অমোঘ ঘোষণার পরও আলেম সমাজের মধ্যে যে মতভেদ বা বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা মূলত কোনো মৌলিক বিশ্বাসের বিরোধ নয়, বরং গবেষণালব্ধ ব্যাখ্যার পার্থক্য।
বিষয়টি বেশ গভীর এবং এর পেছনে ঐতিহাসিক, তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কিছু কারণ রয়েছে। নিচে এর প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:

​১. দালিলিক ব্যাখ্যা বা ইজতিহাদের পার্থক্য:

​কুরআন ও সুন্নাহর কিছু বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট (মুহকামাত), যাতে কোনো মতভেদের অবকাশ নেই। যেমন—নামাজ ফরজ হওয়া বা সুদ হারাম হওয়া। কিন্তু কিছু বিষয়ের ভাষাগত প্রয়োগ বা প্রয়োগিক পদ্ধতির ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকেই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রচলিত ছিল। একে বলা হয় ‘ইজতিহাদ’। আলেমগণ যখন কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সমাধান খুঁজতে যান, তখন তাদের বুঝ ও গবেষণার পদ্ধতিতে ভিন্নতা আসতে পারে, যা বিভেদ নয় বরং জ্ঞানের একটি বৈচিত্র্য।

​২. হাদিসের সংকলন ও পৌঁছানোর ভিন্নতা:

​রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর সাহাবীগণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। সবার কাছে সব হাদিস সমানভাবে পৌঁছায়নি। পরবর্তীতে ইমামগণ যখন মাসআলা ইস্তিনবাত (বের করা) করেছেন, তখন কেউ হয়তো একটি হাদিস পেয়েছেন যা অন্যজন পাননি। এই তথ্যের সীমাবদ্ধতা বা প্রাপ্তির ভিন্নতা আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি করেছে।

​৩. ফিকহি মাযহাব ও দৃষ্টিভঙ্গি:

​শরিয়তের বিধান পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদ্ধতি বা মাযহাব (হানাফী, শাফিয়ী, মালিকী, হাম্বলী) তৈরি হয়েছে। এই মাযহাবগুলো মূলত একই উৎস থেকে পানি পান করলেও পদ্ধতিগত কিছু নিয়মের কারণে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। এটি মূলত দ্বীনের একটি প্রশস্ততা, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অনেক সময় অনুসারীদের গোঁড়ামির কারণে এটি বিভেদে রূপ নেয়।

​৪. পরিবেশ ও সংস্কৃতির প্রভাব:

​আলেমগণ যে সমাজ বা পরিবেশে বড় হন, সেই সমাজের প্রচলিত সমস্যা ও সংস্কৃতি তাদের চিন্তাধারায় প্রভাব ফেলে। এক দেশের আলেমের ফতোয়া অন্য দেশের আলেমের থেকে ভিন্ন হতে পারে কারণ তাদের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এই ‘উফরি’ বা পরিবেশগত পার্থক্য অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে বিভেদ মনে হয়।

​৫. মানসিকতা ও দলীয় সংকীর্ণতা:

​এটি একটি নেতিবাচক দিক। অনেক সময় আলেমদের মধ্যে ব্যক্তিগত অহমিকা, দলীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা বা নিজ মতাদর্শকে একমাত্র সঠিক মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী ‘একতাবদ্ধ’ থাকার চেয়ে নিজেদের বিশেষ পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার আগ্রহ অনেক সময় উম্মাহর মধ্যে বড় ফাটল সৃষ্টি করে।

​৬. রাজনীতির প্রভাব:

​ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে আলেমদের ব্যবহার করেছে বা আলেমগণ বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনে বিভক্ত হয়েছেন। এই রাজনৈতিক মেরুকরণ আলেম সমাজের ঐক্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
​সমাধানের পথ কী?
​রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, পথভ্রষ্ট না হওয়ার প্রধান শর্ত হলো মূল উৎসের (কুরআন ও সুন্নাহ) দিকে ফিরে যাওয়া। আলেমদের মধ্যে এই মতভেদগুলোকে ‘বৈচিত্র্য’ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, ‘বিবাদ’ হিসেবে নয়।
ইমাম শাফিয়ী (রহ.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে স্মরণীয়:
​”আমার মতটি সঠিক, তবে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে; আর অন্যের মতটি ভুল মনে হলেও তাতে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।”
​এই পরমসহিষ্ণুতা এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখলেই সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সৃষ্ট এই বিভেদগুলো উম্মাহর জন্য ক্ষতির কারণ হবে না।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১