• বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ১০:৫৪ অপরাহ্ন

মতামত

ব্রেইন ড্রেনের শিকার বাংলাদেশ: কোথায় সমস্যার মূল?

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় পাঠক বৃন্দ, আজকে আমরা আলোচনা করব বাংলাদেশের মেধাবী গবেষকরা কেন বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং আমার দেশ কেন মেধাশূন্য হচ্ছে। সাথেই থাকুন।

বাংলাদেশি মেধাবীদের বিদেশে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা এবং দেশে মেধার সঠিক বিকাশ না হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গভীর এবং বহুমাত্রিক। একে সহজ ভাষায় “ব্রেইন ড্রেন” (Brain Drain) বা মেধা পাচার বলা হয়। এর পেছনে কয়েকটি প্রধান আর্থ-সামাজিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে:

​১. উন্নত গবেষণা ও বিজ্ঞানের অবকাঠামোর অভাব:
বিদেশে বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে গবেষণার জন্য যে ধরনের ল্যাবরেটরি, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং ফাণ্ডিং বা অর্থের বরাদ্দ থাকে, তা বাংলাদেশে অত্যন্ত সীমিত। একজন শিক্ষার্থী যখন উচ্চতর বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করেন, তিনি চান তার অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ বা পরিকাঠামো না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে বিদেশের ল্যাবে বা কোম্পানিতে কাজ বেছে নেন।

​২. ক্যারিয়ারের নিরাপত্তা ও আয়ের অসংগতি:
একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য দেশে সম্মানজনক পদ এবং মেধার যোগ্য মূল্যায়ন অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশের ইউনিভার্সিটি বা কোম্পানিগুলোতে যে ধরনের বেতন কাঠামো এবং জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা হয়, তার তুলনায় দেশে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিছুটা পিছিয়ে।

​৩. নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিকতা:
বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় মেধার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বেশি গুরুত্ব পায়। এই সিস্টেমের কারণে অনেক মেধাবী তরুণ হতাশ হয়ে পড়েন এবং মনে করেন যে বিদেশে গেলে তারা তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রকৃত মূল্যায়ন পাবেন।

​৪. জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা:
জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক নিরাপত্তা একটি বড় ফ্যাক্টর। উন্নত দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আইনি নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বেশি সুসংগঠিত। নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল জীবনের আশায় অনেকেই সেখানে সেটেল হতে চান।
​কেন বাংলাদেশের মেধা ও অবকাঠামো বিকশিত হচ্ছে না?
​জাতীয় উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মেধা বিকশিত না হওয়ার কিছু মৌলিক সমস্যা নিচে তুলে ধরা হলো:

​শিক্ষাব্যবস্থার মান:
আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকটা মুখস্থনির্ভর। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা বা ইনোভেশন (Innovation) ভিত্তিক কারিকুলামের অভাব রয়েছে।

বাজেট বরাদ্দ:
জিডিপির তুলনায় শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বাংলাদেশের বাজেট বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে নতুন নতুন আবিষ্কার বা বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ঘটানোর মতো পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না।
শিল্প-একাডেমিয়া সমন্বয়ের অভাব: ইউনিভার্সিটিতে যা পড়ানো হচ্ছে এবং ইন্ডাস্ট্রিতে যা প্রয়োজন, তার মধ্যে বড় ধরনের গ্যাপ বা দূরত্ব রয়েছে। যার ফলে মেধাবীরা পড়াশোনা শেষে দেশের শিল্পোন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারছেন না।
​উদ্যোক্তা হওয়ার চ্যালেঞ্জ: নতুন কোনো প্রযুক্তি বা আইডিয়া নিয়ে দেশে ব্যবসা শুরু করা বা স্টার্টআপ গড়ে তোলা বেশ কঠিন। ঋণ প্রাপ্তি থেকে শুরু করে লাইসেন্সিং পর্যন্ত অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
​সমাধানের পথ কী হতে পারে?
​মেধা পাচার রোধ করতে হলে রাষ্ট্রকে কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে:
​গবেষণায় বিনিয়োগ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে সরকারি ও বেসরকারি অনুদান বৃদ্ধি করা।

​মেধার মূল্যায়ন:
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং যোগ্য মানুষকে উপযুক্ত পদে বসানো।

​রিভার্স ব্রেইন ড্রেন:
যারা বিদেশে আছেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বা প্রজেক্টের ব্যবস্থা করা।
​মূলত দেশের অভ্যন্তরে যখন একজন মেধাবী মানুষ তার কাজের স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা এবং যোগ্য সম্মান পাবেন, তখনই মেধার এই বহির্গমন বন্ধ হবে।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১