• রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০২:০৬ পূর্বাহ্ন

মতামত

শিশু নির্যাতন ও সামাজিক অবক্ষয়: এখনই জবাবদিহিতা নিশ্চিতের সময়

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ, সচেতন নাগরিকবৃন্দ এবং সরকারের নীতি নির্ধারণবৃন্দ। আপনাদের সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আজকের আলোচনা। সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে চলে গেছে। এর কারণ এবং প্রতিকার নিয়ে আজকে আপনাদের সঙ্গে সামান্য দিকনির্দেশনা। সাথেই থাকুন।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া এই ধরণের নৃশংস ঘটনাগুলো সত্যিই অত্যন্ত উদ্বেগজনক, বেদনাদায়ক এবং পুরো সমাজের জন্য চরম অবমাননাকর।
একটি আট বছরের শিশুর ওপর এমন পাশবিক অত্যাচার ও তাকে খুনের ঘটনা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে স্তব্ধ ও ক্ষুব্ধ করে তোলে।
​এই ধরণের সামাজিক ও মানসিক বিকৃতির পেছনে কোনো একটি একক কারণ থাকে না, বরং এটি একাধিক মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার যৌথ ফল।
​মানসিক বিকৃতি ও অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণসমূহ
​বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের শিথিলতা:

অপরাধী যদি প্রভাবশালী হয় বা রাজনৈতিক আশ্রয় পায়, তবে পার পেয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়। দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণে অপরাধীরা সাহস পেয়ে যায়।

​নৈতিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয়:

পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার অভাব। চারিত্রিক কাঠামোর চেয়ে বস্তুগত ও ক্ষমতার লোভ বড় হয়ে উঠলে এই ধরণের অপরাধ মানসিকতা বৃদ্ধি পায়।
​ক্ষমতার অপব্যবহার ও চাঁদাবাজি: রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতার দাপট যখন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে চলে যায়, তখন চাঁদাবাজি, খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো এক ধরণের “নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার” হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
​মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি ও পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা: প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং ইন্টারনেটে বিকৃত যৌনতার (যেমন চাইল্ড পর্নোগ্রাফি বা সহিংস কন্টেন্ট) সহজলভ্যতা মানুষের স্বাভাবিক মানসিকতাকে চরমভাবে কলুষিত করছে।

​সামাজিক নজরদারির অভাব:

আগে পাড়া-মহল্লায় যে সামাজিক প্রতিরোধ বা সচেতনতা ছিল, তা আধুনিক যুগে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার কারণে অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে।
​এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় ও প্রতিকার
​এই ধরণের মানসিক বিকৃতি ও অপরাধের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে বহুমাত্রিক ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

​১. আইনের শাসন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ:

​ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো মামলার ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবকে তোয়াক্কা না করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি (যেমন মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন) নিশ্চিত করতে হবে।
​অপরাধীদের সহায়তাকারী বা আশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

​২. প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও কঠোর নজরদারি:

​শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বা কর্মচারীদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও চারিত্রিক ব্যাকগ্রাউন্ড কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে।
​প্রতিটি স্কুল ও কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল সক্রিয় করতে হবে, যেখানে শিশুরা বা যেকোনো ভুক্তভোগী ভয়হীনভাবে অভিযোগ জানাতে পারে।

​৩. পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা:

​পরিবার থেকেই সন্তানদের “সম্মতি” (Consent) এবং অন্য মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দিতে হবে। ছেলেদের শেখাতে হবে নারীদের সম্মান করা এবং মেয়েদের শেখাতে হবে “গুড টাচ” ও “ব্যাড টাচ” চেনা।
​এলাকাভিত্তিক সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে হবে যা চাঁদাবাজি ও বখাটেপনার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে।

​৪. মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ:

​ইন্টারনেটে বিকৃত ও সহিংস কন্টেন্টের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।
​জাতীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে সহজলভ্য করা প্রয়োজন, যাতে বিকৃত মানসিকতার প্রাথমিক লক্ষণ দেখলেই কাউন্সেলিং বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।

​পরিশেষ:

রাজনৈতিক পরিবর্তন বা সরকার আসা-যাওয়ার চেয়েও বড় বিষয় হলো রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা। যতক্ষণ না অপরাধী, সে যে-ই হোক, তার শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ সমাজকে এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত করা কঠিন। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে “অপরাধী”—এই নীতিতে কঠোর অবস্থান নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১