• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

মতামত

আমি রাজাকার বলছি-পর্ব-১

লেখক: হাফিজ সিদ্দিকী বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট
আপডেট: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

এই সপ্তাহের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে আমার কিঞ্চিৎ স্মৃতিচারণ করবো। আমার জন্ম ১৯৫০ শের শেষের দিকে সম্ভবত ভারত পাকিস্তানের ভয়াবহ ১৭ দিনের নানা কাহিনীর একজন দর্শক শ্রোতা মাত্র। আমার সম্মানিত পিতা কারী মাওঃ ছিদ্দিকুর রহমান সাহেব তখন নওগাঁ জেলার হাট নওগাঁ জামে মসজিদের খতিব ও স্কুল শিক্ষক ছিলেন। বাবার জোষ্ঠ সন্তান হিসেবে উত্তরবঙ্গে আমার আসা যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো। শুধুমাত্র রেলপথের কারনে ঢাকা হয়েই নোয়াখালী আসা যাওয়া করতে হতো। বাবার ছাত্রদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের পিতাও ছিলেন। ফলে যুদ্ধকালীন শহর ছেড়ে বাবার আস্তানা ছিলো আবদুল জলিল বেষ্টিত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বলয়ে। নোয়াখালীর কারী সাহেব নামে সকল মহলে বেশ সমাদৃত ছিলেন। খন্ডকালীন সেখানে স্কুল জীবনের কিছু সময় অতিবাহিত করার সুযোগ পেয়েছিলাম।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ছাত্রলীগের বড়ো অংশটি ১৯৭২ সালের ৩১ শে অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ব্যানারে আত্মপ্রকাশ করলে আমরা জাসদে যোগদান করি। বসুরহাট সরকারী কলেজের ১৯৭৩/৭৪ সালের পরপর দুইটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জাসদ ছাত্রলীগের প্যানেল জয় লাভে আমাদের উপর মামলা হামলা ও রক্ষিবাহিনীর দমন পিড়নে আমাদের অনেকেরই আত্বগোপনে যেতে হয়েছিলো। সেই সুবাধে আশ্রয়ে ছিলাম চট্টগ্রামের শ্রমিক কলোনী গুলোতে। কোনো একক স্থানে ১/২ দিনের বেশী থাকা হতো না বলেই পুরো চট্টগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের নানা আস্তানা ছিলো। উত্তরবঙ্গের কল কারখানা বিশেষ করে চিনি কল, পাট কল, সুতা কল ছাড়াও চাষাবাদের ফসলী পন্যের ছড়াছড়ি। যেই যমুনায় এখন বালুচর তখন ওপারের ফুরছুরি ঘাট আর জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট স্টিমারে তিন ঘন্টা সময় লাগতো।

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের ২৫ বছরের মাথায় উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম রাজশাহী পাবনা বগুড়া দিনাজপুর রংপুর ও বৃহত্তর খুলনা ছিলো জানা শুনা। পরবর্তীতে খুলনার খালিশপুর দৌলতপুর, ঢাকার টংগি তেজগাঁও ডেমরা আদমজী হাজারীবাগের ট্যানারি পাড়া ও নারায়ণগঞ্জ সহ পুরো অঞ্চল ছিলো নানা শিল্প নগরী। ৭৪ সালে রক্ষিবাহিনীর কারনে চট্রগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কক্সবাজার চন্দ্রঘোনা কাপ্তাই থেকে ফেনী দুই ধারে শত শত পাট কল, সুতা কল, ছিলো শিল্পে জমজমাট। শত শত রি-রোলিং মিল সহ সহস্রাধিক আন্তর্জাতিক মানের মিল ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত পন্য কোলকাতা সহ সারাবিশ্বে সরবরাহ হতো। আশ্চর্যের বিষয় ছিলো কুমিরার গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রি অর্থাৎ সেই পাকিস্তান আমলে গাড়ী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের গাড়ী ভারতে রপ্তানি হতো। আর উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের ২২ পরিবার।
মজার বিষয় হলো এই পূর্বাঞ্চলের জনগন ১৯৪৭ সালের পূর্বে ছিলো সবাই ক্ষেতমজুর। ১৯৪৭ সালের পূর্ব বাংলার অবকাঠামো নির্মাণ সহ এই সকল স্থাপনা সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের মালিক সবাই পাকিস্তানি এবং ওরাই আমাদের গ্রামাঞ্চলের বসবাস করা যুবকদের শহরে এনে মিল কারখানায় চাকরি দেয়। বায়তুল মোকাররমের ৯ একর ছিলো পল্টন দীঘি যাহা ১৯৫৯ সালে আবদুল লতিফ ভাওয়ানী এই দীঘি খরিদ করে জাতীয় মসজিদের জন্য ওয়াকপ করেন। আমাদের সচিবালয় হাইকোর্ট সংসদ ভবন, এয়ার পোর্টে জায়গা ও পরিকল্পনা সহ অধিকাংশ স্থাপনা পাকিস্তান সরকারের ২৩ বছরের ফসল।

পাকিস্তান ও আজকের বাংলাদেশ একটি চক্রের ষড়যন্ত্রের ফসল কারন তারা দুইবার যুদ্ধ করে হেরেছে।
আজ আমাদের দেশ জাতি কৃষিখাত সহ সকল পন্যের আমদানি কারক। আমাদের রপ্তানির উল্লেখযোগ্য হলো গার্মেন্টস শিল্প তাও নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে চলছে। আমাদের শ্রমবাজারেই আমাদের আয়ের উৎস। গত ৫৫ বছরের স্বাধীনতার খতিয়ান মিলিয়ে দেখা যায় আমরা ভাতে ও পানিতে মরছি। তাও বিদেশের শ্রমবাজারে সবচাইতে বেশী কোনঠাসা সেই ভারতীয়দের দ্বারাই। আমার ৩৬ বছরের প্রবাস জীবনে যেখানে প্রতিবেশীর প্রতিহিংসার শিকার হয়েছি সেখানে বাংগালীদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতা এসেছে। আমেরিকা জাপানের উপর এ্যটমিক হামলা করে হিরোসিমা নাগাসাকি দুইটি শহরকে তামা বানিয়ে লক্ষ লক্ষ বনি আদম হত্যা করে আবার সেই কবে থেকেই ব্যবসা বাণিজ্য সবই চলছে। পৃথিবীতে শুধু বাংগালী জাতিকে নানা সময়ে নানান ইস্যুতে ঘুম পাড়িয়ে অর্ধশত বছর চেতনার খেলা চলমান রয়েছে। তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে রয়েছে স্ব-দেশীয় কিছু উচ্ছিষ্টভোগী।

আজকে আমাদের মেধাবী তরুন প্রজন্ম বুঝে গেছে আমাদের সকল অধিকার খর্ব করে আমরা বিশ্বের এক নাম্বার হত দরিদ্র জনগোষ্ঠী। যার ফলে তাদের পেইড এজেন্টদের একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়েই ক্ষমতা থেকে বিদায় করা হলেও ঐ দলের সকল লেন্দুপ দর্জিরা এখন তাদের-ই আশ্রয়ে। তাদের বিশাল শাসন শোষন হাত ছাড়া হয়ে পড়ায় তারা প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম দেশ দখলের। অথচ বৃটিশ প্রনিত বাংলা ভাগের সীমানা ছিলোঃ
পূর্ব বাংলা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম। বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই বিশেষ করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার সন্তান আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে। আমাদের নিজস্ব স্বাধীনতা রক্ষায় আমরা কৌশলগত কাকে বন্ধু করবো সেই অধিকার আমাদের রয়েছে। আমরা সকলের সাথে বন্ধুত্ব ও সু-সম্পর্কে বিশ্বাসী। আমাদের দেশ রক্ষায় শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা চুক্তি নয় বরং আমাদের তরুনদের ১৫-৪০ বছরের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা। পাশাপাশি আমাদের দেশের বর্তমান হুমকি রহিংগা সমস্যা। আমাদের সামরিক কমান্ডের অধিনে এই ২০ লক্ষ রহিংগাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আরাকানে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এমনকি আমাদের বর্ডার গার্ডকে সহযোগিতা করার জন্য সীমান্তবাসিকে প্যারা মিলিটারিতে প্রক্সি বাহিনীর দায়িত্ব দিয়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে। একমাত্র প্রতিবেশী দেশ ছাড়া আমাদের আর কোনো হুমকি নেই। সুতরাং তুরস্ক চীন ইরান পাকিস্তান আমাদের কৌশলগত বন্ধু হতে পারে। পাকিস্তানের অনুদান নয় বরং সমান্তরাল সব দেশের আধুনিক প্রযুক্তি ও রনকৌশলে আমরা প্রস্তুত থাকবো। এটাই হবে আমাদের ফেলে আসা ৫৫ বছরের অতীতকে ফিরে পাওয়া। কোনো বিদেশী দালালদের সহ্য করা হবেনা। এই বিষয়ে জাতীয় ঐক্য অপরিহার্য।

লেখক: হাফিজ সিদ্দিকী
বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও কলামিস্ট


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১