দেশজুড়ে বেড়ে চলেছে পথকুকুরের সংখ্যা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার অলিগলি, বাজার, বাসাবাড়ির সামনে কিংবা হাসপাতাল-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় কুকুরের অবাধ বিচরণ এখন অনেক মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গভীর রাতে দলবেঁধে কুকুরের আক্রমণ, শিশুদের তাড়া করা কিংবা চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে ধাওয়া দেওয়ার ঘটনা এখন প্রায় নিত্যদিনের বাস্তবতা। কিন্তু এই বাস্তবতার বিপরীতে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ এবং আইনগত সুরক্ষা। ফলে কুকুর নিধনকে কোনো সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা যাচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে সমাধান কোথায়?
বাংলাদেশে জলাতঙ্ক এখনো একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বহু মানুষ কুকুরের কামড়ে আহত হন এবং তাদের মধ্যে অনেকে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর বড় অংশই শিশু। কারণ শিশুরা কুকুরের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না, আবার অনেক ক্ষেত্রে কামড়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েও দেখা হয় না। ফলে চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটে।
ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে পথকুকুর বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত ময়লার স্তূপ, কসাইখানার বর্জ্য এবং নির্বিচারে খাবার ফেলে রাখার কারণে কুকুর সহজেই খাদ্য পেয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় দ্রুত বাড়ছে তাদের সংখ্যা। একসময় বিভিন্ন এলাকায় কুকুর নিধনের গোপন বা প্রকাশ্য উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রাণী অধিকার নিয়ে সচেতনতা এবং আইনি বাধার কারণে এখন তা বন্ধ রয়েছে। প্রাণী কল্যাণ আইন অনুযায়ী অমানবিকভাবে প্রাণী হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ।
তবে কুকুর হত্যা বন্ধ হওয়া মানেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে—এমন ভাবার সুযোগ নেই। বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা অনেক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্কুলগামী শিশুদের কুকুরের আক্রমণের শিকার হওয়ার খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। ভোরবেলা হাঁটতে বের হওয়া মানুষ কিংবা রাতের পথচারীরাও আতঙ্কে থাকেন।
এ অবস্থায় প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। প্রথমত, সরকার ও সিটি করপোরেশনকে পথকুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করতে হবে। কুকুর ধরার পর টিকাদান ও বন্ধ্যাকরণ করে আবার ছেড়ে দেওয়ার যে পদ্ধতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কার্যকর হয়েছে, সেটিকে আরও জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি চালাতে হবে এবং কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি, যাতে কুকুর সহজে খাদ্য না পায় এবং অস্বাভাবিক হারে বংশবিস্তার করতে না পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সমস্যাটিকে আবেগ নয়, বাস্তবতা দিয়ে দেখতে হবে। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি মানুষের নিরাপত্তাকেও অবহেলা করা যায় না। একটি সভ্য সমাজে মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর জনসচেতনতা এবং দায়িত্বশীল প্রশাসনিক পদক্ষেপ। সঠিকভাবে পদক্ষেপ নিতে পারলেই কমবে আতঙ্ক, রক্ষা পাবে মানুষ ও প্রাণীও।
লেখক: কামাল হোসাইন
গণমাধ্যমকর্মী।