হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহ
কঠিন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হলেন।
সকলের সামনে তখন প্রশ্ন ছিল, কে নেতৃত্ব দেবেন? কে সামলাবেন বিভক্ত মুসলিম সমাজকে? কে থামাবেন দীর্ঘদিনের সংঘাত?
সাহাবায়ে কেরাম ও মুসলমানদের বড় একটি অংশ হযরত আলী (রা.)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত হাসান ইবন আলী (রা.)-এর হাতে বাইআত করলেন।
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র। হযরত ফাতিমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর সন্তান। তার রক্তে ছিল নবুয়তের ঘ্রাণ, তার চরিত্রে ছিল নবীজির কোমলতা, আর তার হৃদয়ে ছিল উম্মাহর জন্য গভীর মমতা। খিলাফতের দায়িত্ব তার কাছে ক্ষমতার সিংহাসন ছিল না।
ছিল রক্তাক্ত উম্মাহকে শান্ত করার এক ভয়াবহ দায়িত্ব।
তখন মুসলিম সমাজ দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে বিভক্ত। একদিকে কুফাভিত্তিক হযরত হাসান (রা.)-এর নেতৃত্ব, অন্যদিকে সিরিয়াভিত্তিক মু‘আবিয়া (রা.)-এর শক্তিশালী প্রশাসন ও বিশাল সেনাবাহিনী।
দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে লাগল।
হযরত হাসান (রা.) যুদ্ধ চাননি। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে সেনাবাহিনী সংগঠিত করতে বাধ্য করল।
তিনি জানতেন, যুদ্ধ মানে শুধু সৈন্যের মৃত্যু নয়।
যুদ্ধ মানে মায়ের বুক খালি হওয়া।
যুদ্ধ মানে সন্তানের পিতৃহারা হওয়া।
যুদ্ধ মানে মুসলমানের হাতে মুসলমানের রক্ত।
তারপরও পরিস্থিতির চাপে তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন।
কিন্তু এখানেই শুরু হলো তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
তার বাহিনীর মধ্যে ছিল নানা ধরনের মানুষ। কেউ ছিল আন্তরিক, কেউ ছিল রাজনৈতিক স্বার্থে উদ্বুদ্ধ, কেউ আবার ছিল কেবল যুদ্ধের উত্তেজনায় বিভ্রান্ত।
বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট দেখা দিল।
সৈন্যদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হলো।
এক পর্যায়ে হযরত হাসান (রা.) উপলব্ধি করলেন, এই যুদ্ধ যদি শুরু হয়, তাহলে মুসলিম উম্মাহর ক্ষত আরও গভীর হবে।
তিনি সামনে তাকালেন।
একদিকে ক্ষমতা।
অন্যদিকে হাজার হাজার মুসলমানের জীবন।
একদিকে খিলাফতের দাবি।
অন্যদিকে উম্মাহর ভবিষ্যৎ।
এমন অবস্থায় একজন সাধারণ শাসক হয়তো বলতেন, “আমি আমার অধিকার ছাড়ব না।”
কিন্তু হাসান (রা.) ছিলেন অন্য ধাতুর মানুষ।
তিনি ক্ষমতার চেয়ে মুসলমানের রক্তকে বেশি মূল্য দিলেন।
অবশেষে মু‘আবিয়া (রা.)-এর সঙ্গে সমঝোতার পথ তৈরি হলো।
৪১ হিজরিতে হযরত হাসান (রা.) খিলাফত মু‘আবিয়া (রা.)-এর হাতে ছেড়ে দিলেন।
ইতিহাসে এই বছরটি পরিচিত হয়ে গেল ‘আমুল জামাআহ’ বা ঐক্যের বছর হিসেবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বহু বছর আগে হযরত হাসান (রা.) সম্পর্কে বলেছিলেন:
আমার এই সন্তান নেতা। সম্ভবত আল্লাহ তার মাধ্যমে মুসলমানদের দুই বৃহৎ দলের মধ্যে মীমাংসা করবেন।
কী আশ্চর্য ভবিষ্যদ্বাণী!
হযরত হাসান (রা.) নিজের জীবনে সেই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা প্রমাণ করলেন।
তিনি বুঝেছিলেন, সব বিজয় যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয় না।
কখনো কখনো সবচেয়ে বড় বিজয় হলো নিজের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাকে পরাজিত করা।
কখনো সবচেয়ে বড় বীরত্ব হলো তলোয়ার তুলে আঘাত না করা।
কখনো সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব হলো সিংহাসন ছেড়ে দেওয়া।
হযরত হাসান (রা.) সেই বিজয়ের অধিকারী।
তিনি চাইলে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারতেন।
তিনি চাইলে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান আঁকড়ে ধরে রাখতে পারতেন।
কিন্তু তিনি দেখলেন, মুসলিম উম্মাহ ইতোমধ্যে বহু রক্ত দিয়েছে।
হযরত উসমান (রা.) শহীদ হয়েছেন।
তারপর হযরত আলী (রা.) শহীদ হয়েছেন।
আর কত?
আর কত মায়ের বুক খালি হবে?
আর কত মুসলমান মুসলমানের বিরুদ্ধে তলোয়ার তুলবে?
হাসান (রা.) যেন নিজের হৃদয়ের রক্ত দিয়ে উত্তর দিলেন:
আর নয়।
খিলাফত থাক বা না থাক, মুসলমানদের রক্ত যেন আর না ঝরে।
এই সিদ্ধান্ত ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ত্যাগ।
মানুষ সাধারণত ক্ষমতায় ওঠার জন্য যুদ্ধ করে।
হাসান (রা.) ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে শান্তি কিনেছিলেন।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নেতৃত্ব মানে শুধু শাসন করা নয়। নেতৃত্ব মানে কখন থামতে হবে, সেটিও জানা।
তার এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজে একটি বড় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটল।
যুদ্ধের ময়দান থেকে শান্তির পথে ফিরে এল উম্মাহ।
এই কারণেই তার খিলাফতের সময়কাল দীর্ঘ না হলেও ইতিহাসে তার মর্যাদা অসীম।
হযরত হাসান (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র। ছোটবেলা থেকেই তিনি নবীজির স্নেহে বেড়ে উঠেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে ভালোবাসতেন।
একবার তিনি হাসান ও হুসাইন (রা.) সম্পর্কে বলেছিলেন, “হাসান ও হুসাইন জান্নাতের যুবকদের নেতা।”
এমন একজন মানুষের জীবন কীভাবে সাধারণ হতে পারে?
তার চরিত্রে ছিল অসাধারণ উদারতা।
তিনি বহুবার নিজের সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন।
দারিদ্র্য ও অসহায় মানুষের প্রতি তার ছিল গভীর মমতা।
কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় দান ছিল সম্পদ নয়।
ছিল খিলাফত।
তিনি নিজের রাজনৈতিক অধিকারকে উম্মাহর শান্তির জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।
এ ত্যাগের মূল্য বোঝার জন্য ক্ষমতার প্রকৃতি বুঝতে হয়।
একটি রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা মানুষকে মোহিত করে।
সিংহাসন মানুষকে আঁকড়ে ধরে।
ক্ষমতা মানুষকে প্রতিশোধপরায়ণ করে।
কিন্তু হাসান (রা.) ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থানে দাঁড়িয়েও নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন:
“এই ক্ষমতার বিনিময়ে যদি মুসলমানের রক্ত ঝরে, তবে এই ক্ষমতার মূল্য কত?”
তার উত্তর ছিল পরিষ্কার।
ক্ষমতার চেয়ে শান্তি বড়।
রাজনীতির চেয়ে উম্মাহ বড়।
নিজের অধিকার থেকে সরে আসার মধ্যেও কখনো কখনো আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় মর্যাদা অর্জিত হয়।
হযরত হাসান (রা.)-এর খিলাফতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই।
তার শাসনকাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইসলামের ইতিহাস শুধু বিজয়ের ইতিহাস নয়।
এটি ত্যাগের ইতিহাসও। তার সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গভীর শিক্ষা:
সব অধিকার আদায় করতে হয় না।
সব যুদ্ধ জিততে হয় না।
সব ক্ষমতা ধরে রাখতে হয় না।
কখনো কখনো বৃহত্তর কল্যাণের জন্য নিজের প্রাপ্য ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত বিজয়।
তার খিলাফত আমাদের আরও শেখায়, উম্মাহর ঐক্য কোনো ছোট বিষয় নয়।
মুসলমান যখন নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়, তখন তাদের শক্তি দুর্বল হয়ে যায়।
শত্রু তখন বাইরে থেকে আঘাত করার আগেই ভেতরের বিভেদকে কাজে লাগায়।
হযরত হাসান (রা.) তাই রক্তের বদলে শান্তির পথ বেছে নিয়েছিলেন।
উম্মাহ র মধ্যে সম্প্রতি ও শান্তি বজায় রাখতে তিনি
কিছু শর্ত আরোপ করেছিলেন। সেগুলো হলো:
প্রথম শর্ত: আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী শাসন।
হযরত হাসান (রা.)-এর পক্ষ থেকে মূল দাবি ছিল, মুসলিম উম্মাহর শাসনব্যবস্থা কুরআন ও সুন্নাহর নীতির অধীন থাকবে।
অর্থাৎ ক্ষমতা হবে না ব্যক্তিগত ইচ্ছার খেলনা।
শাসন হবে আল্লাহর বিধান ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের ভিত্তিতে।
এ ছিল সেই যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নীতি।
কারণ ইসলামে শাসক ক্ষমতার মালিক নয়।
সে আমানতের দায়িত্বপ্রাপ্ত।
দ্বিতীয় শর্ত: মুসলমানদের মধ্যে রক্তপাত বন্ধ করতে হবে।
এটি ছিল পুরো সন্ধির প্রাণ।
হযরত হাসান (রা.) এমন কোনো বিজয় চাননি, যার নিচে মুসলমানের রক্ত থাকবে।
তিনি বুঝেছিলেন, উম্মাহ বহু রক্ত দিয়েছে।
হযরত উসমান (রা.) শহীদ হয়েছেন।
তারপর হযরত আলী (রা.) শহীদ হয়েছেন।
এবার যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে অসংখ্য মুসলমানের জীবন ধ্বংস হবে।
তাই শান্তিই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।
তার কাছে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান রক্ষা করার চেয়ে একজন মুসলমানের জীবন রক্ষা করা ছিল বেশি মূল্যবান।
তৃতীয় শর্ত: মু‘আবিয়া (রা.)-এর পর উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা হবে না।
কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই শর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে এসেছে।
এর অর্থ ছিল, মু‘আবিয়া (রা.)-এর পর নেতৃত্ব মুসলিম সমাজের পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
অর্থাৎ খিলাফতকে বংশগত রাজতন্ত্রে পরিণত করার বিষয়টি তখনকার সন্ধির অংশ ছিল না।
চতুর্থ শর্ত: হযরত আলী (রা.)-এর অনুসারীদের নিরাপত্তা।
যারা হযরত আলী (রা.)-এর সঙ্গে ছিলেন এবং তার রাজনৈতিক অবস্থানের সমর্থক ছিলেন, তাদের যেন প্রতিশোধের শিকার হতে না হয়, এমন নিরাপত্তার বিষয় কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে।
এখানে হযরত হাসান (রা.)-এর দূরদর্শিতা স্পষ্ট।
তিনি নিজের জন্য শুধু নিরাপত্তা চাননি।
তিনি চেয়েছিলেন, তার সঙ্গে থাকা মানুষগুলোর জীবনও নিরাপদ থাকুক।
কারণ নেতৃত্ব মানে শুধু নিজের জীবন বাঁচানো নয়।
নেতৃত্ব মানে নিজের অনুসারীদের জীবন ও মর্যাদার কথাও চিন্তা করা।
পঞ্চম শর্ত: মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ করা হবে না।
কিছু বর্ণনায় এসেছে, হযরত আলী (রা.)-এর অনুসারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হবে না।
যে মানুষগুলো কয়েক বছর ধরে এক রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে ছিল, তাদের ওপর যেন বিজয়ের পর প্রতিহিংসার ঝড় না নামে।
হযরত হাসান (রা.) জানতেন, যুদ্ধের পর প্রতিশোধ শুরু হলে শান্তি কখনো স্থায়ী হয় না।
তাই তার লক্ষ্য ছিল শুধু যুদ্ধ থামানো নয়।
ক্ষত শুকিয়ে দেওয়া।
ষষ্ঠ শর্ত: হযরত হাসান (রা.) ও তার পরিবারের নিরাপত্তা।
সন্ধির আলোচনায় হযরত হাসান (রা.)-এর নিজের এবং তার পরিবার ও অনুসারীদের নিরাপত্তার বিষয়ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে।
এটি ছিল স্বাভাবিক। কারণ তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না।
তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র।
তার পরিবার ছিল নবী পরিবারের অংশ।
তাই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়েও তিনি উম্মাহর রক্তপাত বন্ধ করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।এখানেই তার চরিত্রের মহত্ত্ব।
সপ্তম শর্ত: মুসলমানদের সম্পদ ও অধিকার রক্ষা।
মুসলমানের সম্পদ অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা যাবে না।
জনগণের ওপর জুলুম করা যাবে না। রাষ্ট্র হবে আমানত।
এটাই ছিল ইসলামী নেতৃত্বের মৌলিক দর্শন।
তারপর এলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
হযরত হাসান (রা.) খিলাফতের দাবি থেকে সরে দাঁড়ালেন। তিনি এমন এক ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন, যা তার হাতে থাকার বৈধ দাবি ছিল।
তিনি এমন একটি সিংহাসন ত্যাগ করলেন, যার জন্য মানুষ সাধারণত রক্তের নদী বইয়ে দেয়।
কিন্তু তিনি রক্তের নদী চাননি।
তিনি চেয়েছিলেন শান্তির নদী।
তার সিদ্ধান্তের ফলে মুসলিম সমাজ আবার এক নেতৃত্বের অধীনে একত্রিত হলো।
লেখক: আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ, ইউরোপ।
বই – সভ্যতার উত্থান পতন : রক্তে লেখা ইতিহাস