ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাংলাদেশের বাণিজ্যে চিহ্নিত ৬১টি নন-ট্যারিফ বাধার মধ্যে ৪৮টি পুরোপুরি সমাধান করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাকি বাধাগুলোও সমাধানের পথে রয়েছে বলে জানান তিনি।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ইইউর রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশনসহ ২৭টি সদস্যদেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ইইউর উত্থাপিত নন-ট্যারিফ বাধা দূর করার অগ্রগতি জানাতে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্চের শুরুতে ইইউর রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ও নন-ট্যারিফ বাধার বিষয় তুলে ধরেছিল। পরে এসব বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘ইইউ যে ৬১টি প্রতিবন্ধকতার কথা বলেছিল, সেগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর প্রায় অর্ধেকই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সম্পর্কিত। এনবিআর, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, নৌপরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলাদাভাবে বসে আমরা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি এবং প্রায় সবগুলোরই সমাধান করেছি।’
মন্ত্রী জানান, সমাধান করা বাধাগুলোর মধ্যে বিদেশি লজিস্টিকস কোম্পানির নবায়নের ক্ষেত্রে থাকা একটি প্রতিবন্ধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে। আগে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা বছরে সর্বোচ্চ ১০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত নমুনা আনতে পারতেন। ইইউর আপত্তির পর সেই সীমা দ্বিগুণ করে ২০ হাজার ডলার করা হয়েছে। সর্বশেষ আমদানিনীতি আদেশে এ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন পণ্যের ট্রেসেবিলিটির জন্য ব্যবহৃত স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তার ভাষ্য, আগে একটি স্মার্ট কার্ডের প্রকৃত মূল্যের তুলনায় বেশি দামে শুল্কায়ন করা হতো। এখন এর জন্য দুটি শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে শিগগিরই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে বলেও জানান খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য।
মন্ত্রী বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আমরা ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছি। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।’
এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ইইউর সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের মধ্যে এলডিসি উত্তরণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে ইইউ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট। তাই তাদের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) এবং ইকোসকের সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ পাওয়া গেছে। এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিষয়টি উত্থাপিত হবে। সেখানে ভোটের মাধ্যমে অথবা ভোট ছাড়াই বাংলাদেশের অনুরোধ গৃহীত হবে বলে আশা করছেন তিনি।
ইইউর উত্থাপিত সব নন-ট্যারিফ বাধা এখনো সমাধান করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ৫০ শতাংশ পরিবহনের বিধান অন্যতম বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমদানি-রপ্তানি হওয়া পণ্যের ৫০ শতাংশ দেশীয় মালিকানাধীন জাহাজে পরিবহনের একটি আইনি বিধান রয়েছে। কিন্তু এ মুহূর্তে দেশের সেই পরিমাণ পণ্য পরিবহনের মতো পর্যাপ্ত জাহাজ নেই।
মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের বহরে বর্তমানে সাতটি জাহাজ রয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি খাতে প্রায় ১১৫টি জাহাজ আছে। অর্থাৎ মোট প্রায় ১২২টি জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজ দিয়ে দেশের প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি-রপ্তানি পণ্যের অর্ধেক পরিবহন করা বাস্তবে সম্ভব নয়।
এ কারণে আমদানি করা পণ্য পরিবহনের আগে ১৫ দিন আগে সরকারের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়ার বিধানকেও ইইউ নন-ট্যারিফ বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে জানান তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, পর্যাপ্ত জাহাজ না থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান আইনের কারণে এ ধরনের বাধা তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের জাহাজ পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে আগামী পাঁচ, ১০ বা ১৫ বছরের কোনো সুনির্দিষ্ট ভিশন এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন উপস্থিত ছিলেন।