বকেয়া রাজস্ব আদায়ে নানান উদ্যোগ নিয়েও আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতিতে কর বিরোধ মেটানো, বড় করদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক এবং দীর্ঘদিনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
বিভিন্ন আদালতে মামলা চলায় আটকে আছে ৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার রাজস্ব। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা জড়িত এমন ৫০টি বড় মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। সংস্থা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে আদায়ের তুলনায় এ লক্ষ্য প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে আদালতে আটকে থাকা রাজস্ব আদায় এবং দীর্ঘদিনের কর বিরোধ নিষ্পত্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তবে আইনি জটিলতা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের কারণে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক-সংক্রান্ত মোট ২৯ হাজার ৫১৯টি মামলায় ৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার রাজস্ব আটকে আছে। এর মধ্যে আয়কর খাতে ৫ হাজার ৫০০টি মামলায় ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, ভ্যাট খাতে ১১ হাজার ৬৮৪টি মামলায় ৩৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং শুল্ক খাতে ১২ হাজার ৩৩৫টি মামলায় ৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা জড়িত।
ভ্যাট খাতের মামলাগুলোর মধ্যে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলাগুলোতেই আটকে আছে ২৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, আয়কর খাতের ১৬টি বড় মামলায় জড়িত প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব মামলার তালিকা অর্থমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, সংস্থাটির তিনটি বিভাগ থেকে প্রায় ৫০টি বড় প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাওনা। বকেয়া আদায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেন অর্থমন্ত্রী। তবে এখন পর্যন্ত শুধু মোবাইল ফোন অপারেটরদের মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।
আরও জানা গেছে, বকেয়া কর বিরোধ নিষ্পত্তিতে এডিআর পদ্ধতি কার্যকর করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এজন্য গত বাজেটে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করা হয়। এ পদ্ধতিতে করদাতা ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এ উদ্যোগে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।
জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক সদস্য (করনীতি) সৈয়দ আমিনুল করিম বলেন, এডিআরের মাধ্যমে বকেয়া কর আদায় করতে হলে রাজস্ব কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী উভয়কেই ছাড় দিতে হয়। কিন্তু উভয়পক্ষের মধ্যে ছাড় দেওয়ার মানসিকতার অভাব রয়েছে। এছাড়া আইনি জটিলতাও রয়েছে, যেগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিনের মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি বকেয়া রাজস্ব আদায়ে আরও কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এর মধ্যে রয়েছে বুক অ্যাডজাস্টমেন্ট, প্রয়োজনে ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং সার্টিফিকেট মামলা দায়ের। রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট বড় মামলাগুলো দ্রুত শুনানির জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আদালতের কার্যতালিকায় নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
এছাড়া রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনায় দীর্ঘদিনের অডিট জট নিরসনেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রায় ৬৬ হাজার করদাতার অডিট দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট ২৩টি বড় কর বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে করদাতাদের দায় নির্ধারণ এবং সরকারের পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর সূত্র।