বাংলাদেশে ইদানীং মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা সচেতনতা বাড়লেও, পুরো ব্যবস্থাটি কীভাবে চলবে তার কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা বা নিয়মকানুন নেই। চিকিৎসা ক্ষেত্রে যেমন নির্দিষ্ট নীতিমালা ও সবার জন্য একই পাঠ্যক্রম এবং বিএমডিসি (BMDC)-র মতো তদারকি সংস্থা রয়েছে, কিন্তু মনোবিজ্ঞানের (Psychology) পড়াশোনা ও সেবার জায়গায় তেমন কোনো সরকারি কাঠামো আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেই সিলেবাসের পার্থক্য এবং শিক্ষার মান, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রির মূল্যে তৈরি হয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত। সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনের কলেজগুলোর কথা আর নাই বা বললাম। এই বৈষম্য দূর করা ও পড়াশোনার একটি সুনির্দিষ্ট মান বজায় রাখা এবং সাইকোলজিস্টদের সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
১. শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দেওয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ও এডুকেশনাল এবং কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের হাত ধরে দেশে মনোবিজ্ঞান শিক্ষার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে এই সুবিধাগুলো দেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে পৌঁছায়নি। অভিজ্ঞ শিক্ষক, আন্তর্জাতিক মানের অনুশীলন, সাইকোমেট্রিক টেস্টের উপাদান ও সরাসরি ইন্টার্নশিপের সুবিধা অন্য পাবলিক বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতে খুবই সীমিত। এর ফলে একই বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও কাজের যোগ্যতায় বড় ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই অভিজ্ঞতা ও রিসোর্স অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে ভাগাভাগি করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
২. সবার জন্য অভিন্ন সিলেবাস চালু করা
একই বিষয়ে পড়েও একেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একেক জিনিস শিখছে। আন্তর্জাতিক মানের সাথে মিলিয়ে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি কলেজ ব
এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজির জন্য একটি নির্দিষ্ট ও মৌলিক সিলেবাস থাকা প্রয়োজন। সাইকোমেট্রিক টেস্ট, গবেষণা পদ্ধতি, বাস্তব কেস স্টাডি ও পেশাগত নীতিমালার মতো জরুরি বিষয়গুলো যেন সব প্রতিষ্ঠানে সমানভাবে পড়ানো হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. সমমানের কারিকুলাম ও কাজের সমান সুযোগ
পড়াশোনার মানে মিল না থাকায় চাকরির ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হয়। অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যা অন্যান্য জায়গার যোগ্য গ্র্যাজুয়েটদের বঞ্চিত করে। সিলেবাস ও প্রশিক্ষণের মান এক হলে সবাই সমান সুযোগ পাবে এবং প্রতিষ্ঠানের নামের ভিত্তিতে বৈষম্য বন্ধ হবে।
৪. সুপারভিশন ও ইন্টার্নশিপের স্পষ্ট গাইডলাইন
মানসিক সেবা কোনো বই মুখস্ত করার বিষয় নয়, এটি পুরোপুরি কাজের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। একজন সাইকোলজিস্ট কতটা দক্ষ হবেন তা নির্ভর করে তিনি অভিজ্ঞ কারো অধীনে কত ঘণ্টা সরাসরি ক্লায়েন্ট দেখে কাজ শিখেছেন। আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানেই স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এমন ব্যবহারিক ট্রেইনিং বা সুপারভিশনের নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। সেবা দেওয়ার যোগ্য হতে হলে কত ঘণ্টা ইন্টার্নশিপ করতে হবে তার একটি স্পষ্ট জাতীয় নিয়ম থাকা দরকার।
৫. প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান ও স্বল্পমেয়াদী কোর্স নিয়ন্ত্রণে আনা
ইদানীং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামান্য কিছু দিনের শর্ট কোর্স করিয়ে নন সাইকোলজির শিক্ষার্থীদের “কাউন্সেলর” বা “থেরাপিস্ট” বানিয়ে দিচ্ছে। না বুঝে ভুল থেরাপি দেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তেমনি মূল পেশাজীবীদের নামও খারাপ হচ্ছে। এসব নামসর্বস্ব কোর্স বন্ধ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। পাশাপাশি নন সাইকোলজির শিক্ষার্থীরা কিভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারবে তার জন্যও একটা গাইডলাইন তৈরী করতে হবে।
৬. জাতীয় সাইকোলজি কাউন্সিল গঠন ও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা
এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান একটাই সাইকোলজিস্টদের জন্য একটি স্বাধীন সরকারি সংস্থা বা ‘জাতীয় সাইকোলজি কাউন্সিল’ গঠন করা। বর্তমানে বাংলাদেশে যে কেউ নিজেকে সাইকোলজিস্ট পরিচয় দিলে তাকে রোখার মতো কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই।
প্রস্তাবিত এই কাউন্সিলের মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের লাইসেন্স দেওয়া হবে এবং কেউ ভুল চিকিৎসা দিলে বা নিয়ম ভাঙলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। পাশাপাশি একটি সরকারি অনলাইন তালিকা থাকবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই যাচাই করে নিতে পারেন তিনি যার কাছে যাচ্ছেন তিনি আসল সাইকোলজিস্ট কি না।
শেষ কথা, মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বাদ দিয়ে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। আর সেই সেবা যারা দেবেন, তাদের শিক্ষাই যদি সঠিক ও মানসম্মত না হয়, তবে পুরো সেবা ব্যবস্থাটাই ঝুঁকিতে পড়ে। তাই ডিগ্রির সমতা আনা, একই সিলেবাসে পড়াশোনা নিশ্চিত করা, প্রাকটিক্যাল ট্রেইনিং বাধ্যতামূলক করা এবং সাইকোলজিস্টদের সরকারি নিবন্ধনের আওতায় আনা এখন জাতীয় স্বার্থেই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
লেখক: মাহাদী-উল-মোর্শেদ
গবেষক ও পলিসি এনালিস্ট।