আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আমার প্রিয় পাঠক বৃন্দ এবং বাংলাদেশ সরকারের নীতি নির্ধারকবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আজকের হকারদের নেতিবাচক এবং ইতিবাচক বিষয়গুলি নিয়ে উপস্থাপনা করার চেষ্টা করছি। সাথেই থাকুন।
বাংলাদেশে রাস্তার পাশে বা ফুটপাতে গড়ে ওঠা হকার মার্কেটগুলো যেমন সাধারণ মানুষের কেনাকাটার একটি বড় মাধ্যম, ঠিক তেমনি এগুলো আমাদের শহরগুলোর পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নিচে এই সমস্যার প্রভাব এবং উত্তরণের উপায়গুলো নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো:
১. পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ:
হকাররা সাধারণত রাস্তার পাশে পলিথিন, প্লাস্টিক ও খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখে। এতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এছাড়া উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলার কারণে বায়ু ও মাটি দূষিত হয়।
যানজট ও যাতায়াতে ভোগান্তি: ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা মূল রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য হন। এতে একদিকে যেমন তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে পথচারীদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
শহরের সৌন্দর্য হানি: অপরিকল্পিতভাবে পলিথিন বা বাঁশ দিয়ে তৈরি দোকানগুলো শহরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করে। এটি একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন শহর গড়ার পথে বড় বাধা।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ: ফুটপাতে খাবারের দোকানগুলোতে কোনো স্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
২. উত্তরণের উপায় ও সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
এই সমস্যা সমাধানে কেবল উচ্ছেদই যথেষ্ট নয়, বরং একটি টেকসই সমাধান প্রয়োজন। সরকার নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারে:
ক) প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ
হকারদের নিবন্ধন: ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে প্রকৃত হকারদের তালিকাভুক্ত করতে হবে যাতে তৃতীয় পক্ষ বা চাঁদাবাজরা এর সুবিধা নিতে না পারে।
স্থান নির্ধারণ (Zoning): রাস্তার পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু ‘হলুদ জোন’ বা ‘হকার্স জোন’ নির্ধারণ করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন সন্ধ্যা ৭টার পর) নির্দিষ্ট কিছু রাস্তায় তাদের বসার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
আইন প্রয়োগ: ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশ প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিং এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
খ) অবকাঠামোগত উন্নয়ন
হকার্স মার্কেট তৈরি: প্রতিটি ওয়ার্ডে বা এলাকায় সরকারি উদ্যোগে স্বল্পমূল্যের দোকান বা ‘ভেন্ডিং জোন’ গড়ে তোলা।
বহুতল মার্কেট: শহরের খালি জায়গাগুলোতে হকারদের পুনর্বাসনের জন্য বহুতল মার্কেট নির্মাণ করা যেতে পারে।
গ) সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ
পুনর্বাসন ও ঋণ সুবিধা: হকারদের স্থায়ী কর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া যেতে পারে যাতে তারা স্থায়ী কোনো ব্যবসায় ফিরতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ: হকারদের পরিবেশ সচেতন করার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ব্যবহারে বাধ্য করা।
ঘ) ডিজিটাল মনিটরিং
স্মার্ট ফুটপাত: সিসিটিভি ক্যামেরা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি করা যাতে উচ্ছেদের পর পুনরায় দখল না হয়।
উপসংহার:
রাস্তার ধারের এই অর্থনীতি বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার সাথে মিশে আছে। তাই রাতারাতি এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত পুনর্বাসন, সময় নির্ধারণ এবং কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করতে পারলে পরিবেশ রক্ষা এবং জনজীবন সহজ করা সম্ভব।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।