• সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০২:২৮ পূর্বাহ্ন

মতামত

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: বাস্তবতা ও বৈষম্যের বিশ্লেষণ

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আপডেট: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ , সচেতন নাগরিকবৃন্দ এবং সরকার পরিচালনায় নীতি নির্ধারক বৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আজকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করব। সাথেই থাকুন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটি অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল। সাধারণ জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ক্ষোভ ও আক্ষেপের পেছনে যেমন সুনির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক কারণ রয়েছে, তেমনই এই সম্পর্কের একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিকও রয়েছে।
​একটি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের খাতিরে এই সম্পর্কের প্রধান প্রধান অমীমাংসিত ইস্যু এবং দ্বিপাক্ষিক সমীকরণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

​১. বাণিজ্য বৈষম্য ও শুল্ক বাধা:

​আক্ষেপের জায়গা:

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, ভারত বাংলাদেশে অবাধে পণ্য রপ্তানি করলেও, বিভিন্ন ধরনের অশুল্ক বাধা (Non-tariff barriers) এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাংলাদেশ থেকে আশানুরূপ পণ্য আমদানি করে না।

​অন্য পিঠের বাস্তবতা:

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাফটা (SAFTA) চুক্তির অধীনে ভারত বাংলাদেশকে প্রায় সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং ভারতের লজিস্টিকস ও সার্টিফিকেশন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাণিজ্য ঘাটতি এখনো ভারতের দিকেই ব্যাপকভাবে ঝুঁকে আছে।

​২. তিস্তা ও অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন:

​আক্ষেপের জায়গা:

৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে হঠাৎ বাঁধের গেট খুলে দেওয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখার ফলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল খরা ও বন্যার কবলে পড়ে—যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ।

​অন্য পিঠের বাস্তবতা:

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি সফলভাবে হলেও, পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিস্তা চুক্তি আটকে আছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মধ্যকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

​৩. ট্রানজিট, বন্দর ব্যবহার ও শুল্ক:

​আক্ষেপের জায়গা:

ভারতকে বাংলাদেশের বন্দর ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে ট্রানজিট বা করিডোর সুবিধা দেওয়া নিয়ে জনগণের বড় একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ আছে। অনেকের মতে, এর বিনিময়ে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুবিধা বা উপযুক্ত শুল্ক (Tax) পাচ্ছে না এবং এটি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।

​অন্য পিঠের বাস্তবতা:

অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, কানেক্টিভিটি বা আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে দীর্ঘমেয়াদে ফি, পোর্ট চার্জ এবং লজিস্টিকস খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি লাভবান হতে পারে। তবে এই শুল্কের হার কতটা যৌক্তিক এবং তা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে কিনা—তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে।

​৪. রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ:

​আক্ষেপের জায়গা:

সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের ধারণা, ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ক্ষমতার সমীকরণে সবসময় প্রভাব বিস্তার করতে চায়। দেশের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অন্ধ সমর্থন দিয়ে তারা জনগণের ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করেছে, যা তীব্র ভারত-বিরোধী মনোভাবের জন্ম দিয়েছে।

​অন্য পিঠের বাস্তবতা:

ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা এবং নিজের কৌশলগত স্বার্থে বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন সরকার দেখতে চায়। তবে কূটনীতিতে কোনো দেশের একতরফা চাপ সবসময় ইতিবাচক ফল আনে না, যা বিগত বছরগুলোতে জনমানসের ক্ষোভ থেকে স্পষ্ট।

​বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকদের অবস্থান: ‘

গোলামি’ নাকি ‘বাস্তবসম্মত কূটনীতি’?
​সাধারণ জনগণের চোখে যারা “ভারতের স্বার্থরক্ষা” করছেন, তাদের অবস্থানকে নীতিনির্ধারণী ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়:

​ভৌগোলিক বাস্তবতা:

বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা বেষ্টিত। কোনো দেশের পক্ষেই তার প্রতিবেশীকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই শত্রুতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন—এই বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই অনেক শিক্ষাবিদ ও কূটনীতিবিদ ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে মত দেন।

​অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নির্ভরতা:

চিকিৎসাসেবা, পর্যটন, জ্বালানি (বিদ্যুৎ আমদানি) এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (যেমন: পেঁয়াজ, চাল, চিনি) জন্য বাংলাদেশ অনেকাংশেই ভারতের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করা হয়। এই নির্ভরতার কারণে কূটনীতিতে সবসময় কঠোর অবস্থান নেওয়া সম্ভব হয় না।

​পর্যবেক্ষণ ও উপসংহার:

​বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কটি কোনো “একপক্ষীয় আবেগ” দিয়ে চলে না, এটি চলে “কৌশলগত স্বার্থের” ভিত্তিতে। সাধারণ জনগণের ক্ষোভ ও আক্ষেপের পেছনে থাকা ইস্যুগুলো (যেমন: পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি) অত্যন্ত বাস্তব এবং যৌক্তিক। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের এই দাবিগুলো আদায়ে আরও শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির প্রয়োজন।
​একই সাথে, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ভারতের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ করাও অসম্ভব। সম্পর্কের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন ভারত বড় ভাই সুলভ “আধিপত্য” পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং “পারস্পরিক সমতার” ভিত্তিতে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নেবে। আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন। আপনাদের মতামত অবশ্যই জানাবেন। ধন্যবাদ সবাইকে।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১