• শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন

মতামত

২০২৬ সালেও নারীরা কেন শ্বশুরবাড়িতে নিরাপদ নয়?

লেখক: ফারজানা আক্তার, কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

চিকিৎসক ধীপ্রার ঘটনাটি নিয়ে লিখতে কিছুটা সময় ইচ্ছাকৃতভাবেই নিয়েছি। কারণ, যে কোনো মৃত্যুকে ঘিরে প্রাথমিক পর্যায়ে নানা ধরনের ব্যাখ্যা, অনুমান ও গুঞ্জন তৈরি হয়। শুরুতে এমন কথাও শোনা গিয়েছিল যে মানসিক চাপ ও ওষুধ সেবনের কারণে তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। এই ধরনের তথ্য কতটা নিশ্চিত, তা যাচাই ছাড়া বলা উচিত নয়। তাই এই লেখা কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের জন্য নয়; বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে।

প্রশ্নটি হলো – ২০২৬ সালে এসেও কেন নারীরা শ্বশুরবাড়িতে নিরাপদ নয়?

যখন বিশ্বের বহু দেশে নারীরা নেতৃত্ব, গবেষণা, বিজ্ঞান ও পেশাগত অর্জনের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছেন। ঠিক তখন আমাদের সমাজে এখনো এমন ঘটনা সামনে আসে, যেখানে শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত নারীরাও ঘরের ভেতরে অপমান, অবহেলা, মানসিক নির্যাতন কিংবা অসুরক্ষার অভিজ্ঞতার কথা বলেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কাউকে জীবন পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।

একজন কন্যাসন্তানকে ভালোবাসা, যত্ন ও শিক্ষার মাধ্যমে বড় করে একটি নতুন পরিবারে পাঠানো হয়। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভেতর যদি সম্মান, নিরাপত্তা ও মানবিকতা অনুপস্থিত থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই – আমরা আসলে পরিবারকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছি?

আরেকটি প্রশ্নও জরুরি: যখন কোনো মেয়ে তার কষ্ট, অসম্মান বা মানসিক যন্ত্রণার কথা পরিবারকে জানায়, তখন তাকে কেন এখনো বলা হয়, “মানিয়ে নাও”?

এই “মানিয়ে নেওয়া” সংস্কৃতি আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো – মানিয়ে নেওয়ার দায় কি কেবল নারীর?

যদি কেউ আপনার সন্তানের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে খারাপ আচরণ করে, তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়, তার মর্যাদাবোধ ক্ষুণ্ন করে – তাহলে শুধু সামাজিক সমালোচনার ভয়ে তাকে সেই পরিবেশে থাকতে বলা কি দায়িত্বশীল আচরণ?

দোষ শুধু শ্বশুরবাড়ির নয়; অনেক সময় দায় থেকে যায় সেইসব বাবা-মায়েরও, যারা সামাজিক চাপে নিজেদের মেয়েকে শত অপমান ও কষ্ট সহ্য করে মানিয়ে নিতে বলেন।

এমন বিষাক্ত সামাজিক সংস্কৃতির নির্মাতা তো আমরাই, তাই না?

আজ অন্য মেয়ের সংসার ভাঙলে আমি কানাকানি করব, কাল আমার মেয়ের সংসার ভাঙলে অন্যরা কানাকানি করবে। এই সংস্কৃতি তো আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি। তার ফলও আমাদেরই ভোগ করতে হবে এবং হচ্ছে।

চিকিৎসক ধীপ্রার ঘটনা আরও একটি প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করে – শিক্ষিত বা আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবার মানেই কি নিরাপদ পরিবার?

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায় – পাত্র কেমন মানুষ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় পাত্রের আয়, বাড়ি, গাড়ি, সামাজিক অবস্থান। আর যদি সরকারি চাকরিজীবী কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা প্রবাসী পাত্র পাওয়া যায় – তাহলে পাত্রীর সাথে সম্ভব হলে পাত্রীর চৌদ্দগোষ্ঠীও যেন সেই পাত্রকে বিয়ে করে নিতো! 

এই অংশ পড়ে কেউ ব্যক্তিগতভাবে নিলে নিতে পারেন – সমস্যা নেই। কারণ এই পর্যবেক্ষণ বাস্তবতা থেকেই বলেছি।

আর বিয়েতে যদি পাত্রীকে কয়েক ভরি স্বর্ণ দেওয়া যায় তাহলে ষোলকলা পূর্ণ। তখন ওই পাত্রের চরিত্র, আচরণ বা পূর্বজীবনের প্রশ্ন একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। পাত্র হয়ে যায় খাঁটি সোনা। আর খাঁটি সোনার আংটি বাঁকা হলেও বা কী, তাই না?

কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা।

শুধু চিকিৎসক ধীপ্রার শ্বশুরবাড়ি নয় – এমন আরও বহু প্রভাবশালী ও সম্পদশালী পরিবার আছে, যেখানে ছেলের স্ত্রীর চেয়ে সাময়িক সময়ের জন্য বারান্দায় বসা কাকের বেশি সম্মান থাকে।

একজন চিকিৎসক বছরের পর বছর পড়াশোনা করেন, মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব নেন, সমাজে সম্মানিত অবস্থান তৈরি করেন। কিন্তু পেশাগত সাফল্য সবসময় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।

আমরা বড় হই এই বিশ্বাসে যে শিক্ষা মুক্তির পথ। মেয়ে যদি উচ্চশিক্ষিত হয়, চাকরি করে, নিজের পায়ে দাঁড়ায় – তাহলে সে আর নির্যাতনের শিকার হবে না। কিন্তু সম্পর্কের বাস্তবতা আরও জটিল।

মানসিক নির্যাতন শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চ প্রত্যাশার পরিবেশে এর ধরন আরও সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে। সেখানে শারীরিক আঘাত নাও থাকতে পারে; কিন্তু প্রতিদিনের ছোট ছোট অবমূল্যায়ন, তুলনা, অবহেলা বা নিয়ন্ত্রণ একজন মানুষের আত্মসম্মানকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিতে পারে।

তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত বা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবারেও নির্যাতনের ধরন প্রায়ই অদৃশ্য থাকে। বাইরে সুখী সংসারের ছবি থাকলেও ভেতরে চলতে পারে নিঃশব্দ দূরত্ব, একাকীত্ব এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ।

২০২৬ সালে এসে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা হয়তো আগের মতো প্রকাশ্য নয়, কিন্তু তার রূপ বদলেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই নারীর শিক্ষা বা কর্মজীবনকে সমর্থন করা হয় – তবে শর্তসাপেক্ষে।

সমস্যাটি কাঠামোগত।

একদিকে ছেলেদের শেখানো হয় সাফল্য, প্রতিযোগিতা ও কর্তৃত্বের ভাষা; অন্যদিকে মেয়েদের শেখানো হয় সহনশীলতা, আত্মত্যাগ ও মানিয়ে নেওয়ার পাঠ। অথচ সম্পর্ক গড়ে ওঠে সমান মর্যাদা, যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।

আমাদের সমাজে একটি বাক্য বহু ব্যথার উৎস, “মেয়েদের মানিয়ে নিতে হয়।”

কিন্তু ছেলেদের কী শেখানো হচ্ছে?

তাদের কি শেখানো হচ্ছে যে স্ত্রী কোনো প্রয়োজন পূরণের যন্ত্র নয়, তিনি একজন পূর্ণ মানুষ? মতভেদ মানেই শত্রুতা নয়? সম্মান মানে নিয়ন্ত্রণ নয়?

বিবাহ কেবল দুটো মানুষের সম্পর্ক নয়; এটি দুটি পরিবারের সম্পর্কও। সেই সম্পর্কের ভেতরে যদি পুত্রবধূকে মানুষ নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয় – তাহলে সেই ঘর কখনো আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে না।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ – সব নির্যাতন সরাসরি হয় না। অনেক সময় নীরবতাও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। এমন বহু স্বামী রয়েছেন, যাদের স্ত্রীরা পরিবারের অন্য সদস্যদের অপমান, অবমূল্যায়ন বা অসৌজন্যের মুখোমুখি হচ্ছেন, আর তাঁরা নীরব ভূমিকা পালন করছেন।

আর “মাম্মাস বয়” প্রসঙ্গে আমার আলাদা কোনো বক্তব্য নেই। সোজা কথা, যদি কেউ এখনো নিজের অবস্থান তৈরি না করে প্রতিটি বিষয়ে পরিবারের আড়ালে দাঁড়িয়ে সম্পর্ক চালাতে চান, তাহলে বিয়ে তাঁর জন্য পুনর্বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত। বিয়ে সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। পরিবারের ভেতরে অন্যায় দেখেও চুপ থাকা দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একজন সঙ্গীর নিরাপদ আশ্রয় হওয়া মানে শুধু আর্থিক দায়িত্ব পালন নয়। এর মানে – শোনা, সম্মান করা, পাশে থাকা এবং অন্যজনের ব্যক্তিসত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া।

আমরা শুধু সমস্যা নিয়েই কথা বলি। এই সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। এই সমস্যার সমাধানের জায়গাগুলোও বহুস্তরীয়।

পরিবারে ছোটবেলা থেকেই চর্চা থাকতে হবে – ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই সমান মানবিক মর্যাদা ও আবেগগত শিক্ষা দিয়ে বড় করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্পর্ক, সম্মান, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও পারস্পরিক যোগাযোগ – এসবকেও শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব – নারী-পুরুষ উভয়ের মানবিক কর্তব্য ও মর্যাদাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। রাষ্ট্র ও আইনকে মানসিক নির্যাতনের বিষয়ে সচেতনতা, সহায়তা কাঠামো এবং কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

এই লেখা কোনো একটি লিঙ্গকে দায়ী করার জন্য নয়।

যে নারী কোনো সম্পর্কে কষ্টে আছেন – আপনার অনুভূতি বাস্তব। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। প্রয়োজন হলে পরিবার, বন্ধু, পরিচিতজন – যার কাছে নিরাপদ মনে হয়, তার সঙ্গে কথা বলুন এবং সহযোগিতা চান।

আর যে পুরুষ এই লেখা পড়ছেন – আপনি পরিবারের ভেতরে কেমন পরিবেশ তৈরি করছেন, সেটিও সমাজ পরিবর্তনের একটি অংশ।

অন্তত অন্যের মেয়ের জন্য না হোক – নিজের মেয়ের কথা ভেবে হলেও সুন্দর, সুস্থ ও সম্মানভিত্তিক সমাজ গঠনে অংশ নিন। শেষ পর্যন্ত, একটি সমাজ তখনই সভ্য হয়, যখন তার প্রতিটি ঘর নিরাপদ হয়।

এই আর্টিকেলের শেষ প্রশ্ন – আমরা কি শুধু নারীকে শিক্ষিত করছি, নাকি তাকে মানুষ হিসেবে বাঁচার জায়গাও দিচ্ছি?

লেখক: ফারজানা আক্তার, কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০