জমির বৈধ দলিল আছে। নামজারি ও খারিজ সম্পন্ন। খতিয়ান হালনাগাদ। নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনাও পরিশোধ করা হচ্ছে। সরকারি রেকর্ডে মালিকের নাম রয়েছে। তারপরও সেই মালিক নিজের জমিতে যেতে পারছেন না—বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় এর চেয়ে বড় বাস্তব বৈপরীত্য আর কী হতে পারে?
ভূমির মালিকানা শুধু একটি কাগজের বিষয় নয়। একজন নাগরিকের জন্য জমি তার সঞ্চয়, বসতভিটা, কৃষি উৎপাদনের ভিত্তি কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা। সেই জমির ওপর বৈধ মালিকানা থাকা সত্ত্বেও যদি তিনি বাস্তবে জমি ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে তার আইনি অধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে ভূমি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। উত্তরাধিকার, সীমানা, দলিল, খতিয়ান, নামজারি, দখল, বণ্টন কিংবা জমির শ্রেণি পরিবর্তন—বিভিন্ন কারণে বিরোধ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন, যখন কোনো পক্ষ বৈধ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে জমি দখলে নেয় এবং প্রকৃত মালিককে জমিতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়।
এখানেই প্রশ্ন আসে—ভূমি প্রশাসনের দায়িত্ব কোথায় শেষ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথা থেকে শুরু?
রেকর্ডে মালিক, বাস্তবে দখলহীন:
বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তর নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ই-মিউটেশন, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর, ডিজিটাল খতিয়ান এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য অনলাইনে পাওয়ার সুযোগ নাগরিক সেবা সহজ করেছে।
কিন্তু ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সফলতা শুধু রেকর্ড ডিজিটাল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ডিজিটাল রেকর্ডে একজন নাগরিকের নাম থাকার পরও যদি বাস্তবে অন্য কেউ জমি দখল করে রাখে, তাহলে সেই ডিজিটাল মালিকানা নাগরিককে কতটা সুরক্ষা দিচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
একজন প্রকৃত মালিক যখন ভূমি অফিসে গিয়ে দেখেন তার কাগজপত্র ঠিক আছে, কিন্তু মাঠে গিয়ে দেখেন অন্য কেউ জমি দখল করে আছে, তখন তিনি সাধারণত এক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে যান। তাকে দেওয়ানি মামলা করতে হয়, দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়, আইনজীবীর পেছনে ছুটতে হয় এবং একই সঙ্গে দখলদার পক্ষের চাপ বা হুমকির মুখোমুখি হতে হয়।
ফলে কাগজে থাকা মালিকানা এবং বাস্তব দখলের মধ্যে তৈরি হয় একটি বিপজ্জনক দূরত্ব।
ভূমি বিরোধ মানেই আদালতের দীর্ঘ লড়াই—এ ধারণা বদলাতে হবে:
ভূমি সংক্রান্ত সব বিরোধ আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে—এটাই স্বাভাবিক। মালিকানা বা স্বত্বের চূড়ান্ত প্রশ্নে আদালতের সিদ্ধান্তের বিকল্প নেই। কিন্তু প্রতিটি ভূমি বিরোধকে যদি শুরু থেকেই দীর্ঘমেয়াদি মামলার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে নাগরিকের সময়, অর্থ ও মানসিক চাপ বাড়ে এবং আদালতের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
প্রথমেই দেখতে হবে বিরোধটি আসলে কী নিয়ে।
দলিলের বৈধতা নিয়ে বিরোধ এক ধরনের বিষয়। খতিয়ানের ভুল আরেক ধরনের বিষয়। সীমানা নিয়ে বিরোধ আলাদা। উত্তরাধিকার বা বণ্টন নিয়ে বিরোধ ভিন্ন। আবার আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকা সত্ত্বেও জোর করে জমি দখল করে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সমস্যা।
তাই ভূমি প্রশাসনে বিরোধের ধরন অনুযায়ী দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
যেসব বিষয় প্রশাসনিকভাবে যাচাই ও সংশোধনযোগ্য, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা গেলে আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। আর যেসব বিষয় একান্তই বিচারিক, সেগুলো দ্রুত আদালতের আওতায় পাঠানো উচিত।
জবরদখলকে শুধু ‘জমির বিরোধ’ হিসেবে দেখলে চলবে না:
কোনো জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু বিরোধের সুযোগ নিয়ে যদি কোনো পক্ষ জোর করে জমিতে প্রবেশ করে, সীমানা পরিবর্তন করে, ঘরবাড়ি বা স্থাপনা নির্মাণ করে কিংবা প্রকৃত মালিককে জমিতে প্রবেশে বাধা দেয়, তাহলে বিষয়টি আর নিছক ভূমি বিরোধ থাকে না।
ভূমি প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ ধরনের পরিস্থিতি শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোনো জমি নিয়ে বিরোধ আদালতে বিচারাধীন থাকলে এবং আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলে, কোনো পক্ষ যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একতরফাভাবে স্থায়ী দখল প্রতিষ্ঠা করতে না পারে—সে বিষয়ে কার্যকর প্রশাসনিক নজরদারি থাকা দরকার।
কারণ বছরের পর বছর একটি জমি দখলে থাকার পর সেখানে স্থাপনা, ব্যবসা বা বসতি গড়ে উঠলে বিরোধ আরও জটিল হয়ে যায়। সময় যত বাড়ে, প্রকৃত মালিকের ক্ষতিও তত বাড়ে।
‘দখল যার, জমি তার’—এমন সংস্কৃতি তৈরি হওয়া বিপজ্জনক:
আইনের শাসনের রাষ্ট্রে জমির অধিকার নির্ধারিত হওয়ার কথা দলিল, রেকর্ড, আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবে যদি মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে শক্তিশালী ব্যক্তি জমি দখল করে রাখতে পারলে শেষ পর্যন্ত দখলই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে, তাহলে তা ভয়াবহ সামাজিক সংকেত।
এতে সৎ নাগরিক নিরুৎসাহিত হন। মানুষ জমি কেনা বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আরও উৎসাহিত হন। একপর্যায়ে ছোট একটি জমি নিয়ে বিরোধও বড় সামাজিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
তাই ভূমি প্রশাসনের একটি মৌলিক লক্ষ্য হওয়া উচিত—বৈধ মালিকানাকে বাস্তব আইনি সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের করণীয় কী?:
ভূমি বিরোধ কমাতে ভূমি মন্ত্রণালয় কয়েকটি বিষয়ে আরও জোর দিতে পারে।
প্রথমত, ভূমির রেকর্ডের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা। একই জমি নিয়ে একাধিক রেকর্ড, ভুল দাগ নম্বর, ভুল নাম, সীমানার অসঙ্গতি বা পুরোনো রেকর্ডের সঙ্গে নতুন রেকর্ডের বিরোধ থাকলে তা দ্রুত সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভূমির মালিকানা ও দখল-সংক্রান্ত তথ্যের সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। একজন নাগরিক যেন শুধু নিজের খতিয়ান নয়, সংশ্লিষ্ট জমির প্রয়োজনীয় ইতিহাস ও প্রশাসনিক অবস্থাও সহজে যাচাই করতে পারেন।
তৃতীয়ত, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে সময়সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। কোনো অভিযোগ গ্রহণের পর তা অনির্দিষ্টকাল ফেলে রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
চতুর্থত, ভূমি অফিসের জবাবদিহি বাড়াতে হবে। কোনো নাগরিক বারবার আবেদন করেও প্রতিকার না পেলে তার অভিযোগ কোথায় আটকে আছে, সেটি অনলাইনে বা নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় জানার সুযোগ থাকা উচিত।
পঞ্চমত, ভূমি-সংক্রান্ত মধ্যস্থতা ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যেতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষকে জোর করে আপস করানো যাবে না এবং মালিকানার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
প্রকৃত মালিকের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ:
ভূমি বিরোধ কখনো কখনো শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জমির দখল নিয়ে বিরোধের কারণে হুমকি, হামলা, ভয়ভীতি এবং পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতার ঘটনাও ঘটতে পারে।
এ কারণে ভূমি প্রশাসনের কাছে জমি-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ আসার পর যদি সেখানে সংঘর্ষ বা সহিংসতার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেটিকে সাধারণ প্রশাসনিক অভিযোগ হিসেবে না দেখে ঝুঁকিপূর্ণ বিরোধ হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
ভূমি অফিস মালিকানা নির্ধারণ করবে না যেখানে সেটি তার এখতিয়ার নয়; কিন্তু সংশ্লিষ্ট নাগরিককে কোন পথে প্রতিকার নিতে হবে, কোন নথি প্রয়োজন, কোন কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
আদালতের মামলাও কমানো সম্ভব:
বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত মামলার বড় অংশের পেছনে রয়েছে রেকর্ড, দখল, সীমানা, উত্তরাধিকার ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ। সব মামলা প্রশাসনিকভাবে সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশাসনিক পর্যায়ে যেসব বিরোধ দ্রুত সমাধান করা সম্ভব, সেগুলো যদি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত আদালতেই যেতে হয়।
তাই কার্যকর ভূমি প্রশাসন শুধু নাগরিক সেবা সহজ করবে না; বিচারব্যবস্থার ওপর চাপও কমাতে পারে।
একটি নির্ভুল রেকর্ড, দ্রুত নামজারি, সহজে ভুল সংশোধন, স্বচ্ছ ভূমি তথ্য এবং কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি—এই পাঁচটি বিষয় শক্তিশালী করা গেলে ভূমি নিয়ে অনেক বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই কমানো সম্ভব।
প্রয়োজন ‘মালিকানা থেকে নিরাপদ ভোগদখল’ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা:
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন হতে পারে চিন্তার জায়গায় পরিবর্তন। ভূমি প্রশাসনের সাফল্য শুধু কতগুলো নামজারি হলো, কত টাকা ভূমি উন্নয়ন কর আদায় হলো কিংবা কতগুলো খতিয়ান ডিজিটাল হলো—এসব দিয়ে পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত—
বৈধ মালিক তার জমি নিরাপদে ভোগ করতে পারছেন কি না।
একজন নাগরিক বৈধভাবে জমি কিনেছেন, দলিল করেছেন, নামজারি করেছেন, খাজনা দিয়েছেন—এরপর তার জমিতে কেউ বেআইনিভাবে দখল প্রতিষ্ঠা করলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কোথায় তিনি দ্রুত প্রতিকার পাবেন, সেই পথটি স্পষ্ট হতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল সংস্কারের পরবর্তী ধাপ তাই হতে পারে ‘রেকর্ড থেকে অধিকার, অধিকার থেকে নিরাপদ ভোগদখল’—এই পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কারণ ভূমির মালিকানা শুধু খতিয়ানের পাতায় লেখা একটি নাম নয়। একজন নাগরিকের জন্য এটি তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পারিবারিক ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের আইনের প্রতি আস্থার সঙ্গে জড়িত।
জমির কাগজ যার, তার অধিকার যেন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ না থাকে—এটাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
লেখক:
শহিদুল ইসলাম কবির
সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল।
ইমেইল : shahid_kabir2007@yahoo.com