আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ। আমার প্রাণপ্রিয় পাঠক বৃন্দ, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারক বৃন্দ। সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আজকের আলোচনায় ভোক্তা অধিকার পরিষদের দায়িত্ব এবং পাশাপাশি সমস্যার সমাধানে নতুন উদ্যোগ নিয়ে একটি রূপরেখা দেবার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। আপনারা সাথে থাকবেন।
আপনাদের ভাবনাটি অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী। শুধু জরিমানা বা অভিযান চালিয়ে ভেজাল বা নকল বন্ধ করার চেয়ে, উদ্যোক্তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলে সঠিক পথে আনা এবং একটি সহায়ক ইকোসিস্টেম তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য অনেক বেশি কার্যকর।
চায়না বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো শুরুতে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং বা “কপি” করার মাধ্যমেই শিল্পায়ন শুরু করেছিল, তবে তাদের সরকারের সঠিক নীতিমালা ও সহায়তার কারণে তারা আজ নিজস্ব বিশ্বমানের ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে পেরেছে।
বাংলাদেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) এই ধারায় রূপান্তরিত করতে একটি সমন্বিত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:
১. নিবন্ধন ও রূপান্তর সেল গঠন (Legalization & Incubation)
‘একক উইন্ডো’ নিবন্ধন সুবিধা:
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (যেমন: ভোক্তা অধিকার, BSTI) যখন কোনো নকল বা অনুমোদনহীন পণ্য প্রস্তুতকারকের সন্ধান পাবে, কেবল জরিমানা না করে তাদের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদী শর্তসাপেক্ষ লাইসেন্স দেবে।
ইনকিউবেশন সাপোর্ট:
বিসিক (BSCIC) এবং এসএমই (SME) ফাউন্ডেশনের অধীনে একটি ‘উদ্যোক্তা রূপান্তর সেল’ খোলা যেতে পারে, যেখানে এই উদ্যোক্তাদের আইনগতভাবে কীভাবে নিজেদের আলাদা ব্র্যান্ড দাঁড় করানো যায় তার পরামর্শ দেওয়া হবে।
২. প্রযুক্তিগত ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রশিক্ষণ (Technical & Quality Guidance)
স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন ও ল্যাব সুবিধা:
বিএসটিআই (BSTI) এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR)-এর মাধ্যমে কম খরচে পণ্য পরীক্ষার সুযোগ এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য বা পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া।
ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিং ট্রেনিং:
কীভাবে অন্যের লোগো বা প্যাকেট নকল না করে নিজস্ব লোগো, আকর্ষনীয় প্যাকেজিং এবং ইউনিক রেসিপি/ডিজাইন তৈরি করা যায়, তার ওপর বিসিক ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক কোর্স চালু করা।
৩. আর্থিক নীতি ও তহবিল সহায়তা (Financial Support & Incentives)
‘গ্রিন ব্র্যান্ড’ ফান্ড:
যেসকল উদ্যোক্তা নকল পথ ছেড়ে নিজস্ব ব্র্যান্ড ও মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে সম্মত হবেন, তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের অধীনে ৪% থেকে ৫% সুদে বিশেষ ‘ব্র্যান্ড ইনোভেশন ঋণ’ দেওয়া।
ভর্তুকিমূল্যে ল্যাব ও প্যাকেজিং উপাদান:
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য উন্নত মানের ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং সামগ্রী ও কাঁচামাল যেন তারা কম দামে বা শুল্কমুক্ত সুবিধায় পায়, তার ব্যবস্থা করা।
৪. ক্লাস্টার ভিত্তিক শিল্প পার্ক ও শেয়ার্ড ফ্যাসিলিটি (Industrial Clusters)
কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার (CFC):
চীনের মডেলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে (যেমন: পুরান ঢাকা, বগুড়া বা সৈয়দপুর) একই ধরনের পণ্যের উদ্যোক্তাদের জন্য সরকার সেন্ট্রাল প্যাকেজিং, বোতলজাতকরণ বা টেস্টিং ল্যাব গড়ে তুলবে।
উদ্যোক্তারা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে এই সুবিধা ব্যবহার করবেন। এতে আলাদা করে বড় মূলধন লাগবে না।
নিরাপদ বিসিক জোন:
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশে কারখানা স্থাপনের জন্য বিসিক শিল্প নগরীতে ছোট ছোট ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ (Plug and Play) স্পেস তৈরি করে দেওয়া।
৫. নীতিগত সুরক্ষা ও বাজারজাতকরণ (Market Access & Policy)
সহজ আইপি (IPR) ও ট্রেডমার্ক নিবন্ধন:
কপিরাইট ও ট্রেডমার্ক পাওয়ার প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল, দ্রুত এবং প্রায় বিনামূল্যে করা, যাতে উদ্যোক্তারা নিজস্ব নাম নিবন্ধনে উৎসাহী হন।
জাতীয় প্রদর্শনীর আয়োজন:
জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ‘দেশি ইনোভেশন ফেয়ার’ আয়োজনের মাধ্যমে এই রূপান্তরিত উদ্যোক্তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য প্রচারের সুযোগ দেওয়া।
বাস্তবায়ন কৌশল
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই, বিসিক এবং এসএমই ফাউন্ডেশন—এই চার সংস্থাকে এক ছাতার নিচে এনে একটি “জাতীয় উদ্যোক্তা মানোন্নয়ন কমিশন” গঠন করা যেতে পারে।
ভোক্তা অধিকারের কাজ হবে শুধু আইনি নজরদারি নয়, বরং সমস্যা চিহ্নিত করে ওই উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তার জন্য বিসিক বা এসএমই ফাউন্ডেশনের কাছে রিফার (Refer) করা এবং তা হতে হবে খুবই আন্তরিকতার সাথে।
সরকারি সচেতনতা খুবই প্রয়োজন। আশা করি সরকার এই বিষয়টির উপরে যথেষ্ট যত্নবান হয়ে কাজে আঞ্জাম দেবেন। আপনাদের সুচিন্তিত মতামত খুবই আশা ব্যঞ্জন হবে বলে মনে করছি। ধন্যবাদ সবাইকে এতক্ষন সাথে থাকার জন্য।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।