আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক বৃন্দ আপনাদের অবগতির জন্য আজকের লেখাটি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা শর্ত এগুলি একটি চাপ। বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ। আপনারা সাথেই থাকুন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে তাকে আমন্ত্রণের কূটনৈতিক বার্তা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, পারস্পরিক ভূ-কৌশলগত ভারসাম্য এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণের প্রেক্ষাপটে এই আমন্ত্রণের পেছনে একাধিক রাজনৈতিক কারণ কাজ করছে।
নিচে এর একটি বিশদ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. নতুন বাস্তবতায় ভারতের “কূটনৈতিক রিওরিয়েন্টেশন”:
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের শুরুতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর নয়াদিল্লিকে তার ঢাকা-নীতি পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নীতি একদলকেন্দ্রিক (আওয়ামী লীগ নির্ভর) থাকার কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত কিছুটা ব্যাকফুটে পড়েছিল। নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো ভারতের জন্য বাংলাদেশ নীতিতে একটি রাজনৈতিক ভারসাম্য আনার প্রয়াস মাত্র আপাতদৃষ্টিতে।
২. ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা ও চীনের প্রভাব রোধ:
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরগুলোতে মালয়েশিয়া ও চীন গমন করেন। বাংলাদেশে চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি নয়াদিল্লির নিরাপত্তার জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ভারত চায় না বাংলাদেশের নতুন সরকার সম্পূর্ণভাবে বেইজিং বা অপরাপর ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়ুক।
তাই তড়িঘড়ি করে দ্বিপক্ষীয় সফর ও ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের আউটরিচ সেশনের মাধ্যমে তাকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
৩. ট্রানজিট, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা:
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় “সেভেন সিস্টার্স” রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার সাথে সরাসরি যুক্ত।
চিকেনস নেক ও নিরাপত্তা:
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী যেন বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে না পারে, তার নিশ্চয়তা ভারতের প্রয়োজন।
ট্রানজিট ও বাণিজ্য:
বিগত বছরগুলোতে অর্জিত ট্রানজিট, করিডোর ও বন্দর ব্যবহারের সুবিধাগুলো বজায় রাখা ভারতের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
৪. সীমান্ত, তিস্তা ও হাসিনাকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় চাপ:
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র নীতিতে “বাংলাদেশ ফার্স্ট” (Bangladesh First) নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে, যা সার্বভৌম সমতা ও জাতীয় মর্যাদার ওপর জোর দেয়।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও রেড লাইন:
ভারতে আশ্রয় নেওয়া ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি প্রধান দাবি। ঢাকা স্পষ্ট করেছে যে, হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত না হলে বা অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে সফরের চূড়ান্ত রূপদান কঠিন হতে পারে।
অমীমাংসিত ইস্যু:
তিস্তা নদী পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করার মতো ইস্যুগুলোতে বিএনপি সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। ভারত সফরে আসার মাধ্যমে নয়াদিল্লি এই দ্বিপক্ষীয় অসন্তোষগুলো আলোচনার টেবিলে প্রশমিত করতে চায় বলে মনে হয়।
৫. অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণ ও জনমত:
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের প্রতি জনগণের একধরনের ক্ষোভ বা অবিশ্বাস রয়েছে, যা হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং তার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদানকে কেন্দ্র করে আরও ঘনীভূত হয়েছে।
বিএনপি সরকারের ওপর জামায়াতে ইসলামী বা অন্যান্য সমমনা দলের রাজনৈতিক চাপ রয়েছে যাতে ভারতের শর্তহীন আধিপত্য মেনে নেওয়া না হয়।
ফলে তারেক রহমানের ভারতের আমন্ত্রণ গ্রহণ বা শর্ত দেওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখার বিষয়টিও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
সামগ্রিকভাবে, ভারতকে তার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের প্রধানের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বিএনপি সরকারও ভারতের সাথে একটি সমমর্যাদাপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়,
তবে তা নিজের অভ্যন্তরীণ জনমত ও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে।
আপনাদের দৃষ্টিতে এছাড়াও অন্যান্য কোন ইস্যু থাকলে মতামত জানাবেন। ধন্যবাদ সবাইকে এতক্ষন সাথে থাকার জন্য।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম,
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।