বই মানুষের জীবনের এক অনন্য সঙ্গী। জ্ঞান অর্জন, চিন্তার বিকাশ, মননের পরিপক্বতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। একটি ভালো বই মানুষকে শুধু নতুন তথ্য দেয় না, বরং তাকে নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করে এবং জীবনের নানা বাস্তবতা উপলব্ধি করার ক্ষমতা বাড়ায়। বই পড়ার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের সীমিত অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে বহু মানুষের জীবন, দেশ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। এ কারণে বইকে মানুষের নীরব শিক্ষকও বলা যায়।
শিক্ষার্থীদের জীবনে বই পড়ার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া, শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া বা সনদ অর্জনের বিষয় নয়। প্রকৃত শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থী জ্ঞানী, সৃজনশীল, বিবেকবান, দায়িত্বশীল এবং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। পাঠ্যবই তাকে নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রাথমিক ও প্রয়োজনীয় জ্ঞান দেয়, কিন্তু পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই তার চিন্তার জগৎকে বিস্তৃত করে। সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, জীবনী, ভ্রমণকাহিনি, পরিবেশ, প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বই পড়ার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী বাস্তব পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে বুঝতে শেখে।

বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে শিক্ষার্থীদের জীবনযাপনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদন তাদের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। প্রযুক্তি অবশ্যই জ্ঞান অর্জনের সুযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বই পড়ার অভ্যাসকে দুর্বল করে দিতে পারে। দ্রুত বিনোদন পাওয়ার প্রবণতা, অল্প সময়ের ভিডিও দেখার অভ্যাস এবং বারবার নোটিফিকেশনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে পড়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে। এ অবস্থায় তাদের মধ্যে পুনরায় বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
এই বাস্তবতায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবু সাঈদ মহোদয়ের উদ্যোগে প্রতিটি উপজেলায় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে কমিটি গঠনের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়, সময়োপযোগী এবং শিক্ষাবান্ধব পদক্ষেপ। এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু বই বিতরণ, অনুষ্ঠান আয়োজন বা পুরস্কার প্রদান নয়। বরং এর মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক একটি স্থায়ী পাঠসংস্কৃতি তৈরি করা, শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের সীমার বাইরে জ্ঞান অন্বেষণে উদ্বুদ্ধ করা এবং বই পড়াকে তাদের আনন্দময় দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করা। বাঞ্ছারামপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য এই উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
বই পড়ার বহুমাত্রিক উপকারিতা
বই পড়া একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি তার চিন্তাশক্তি, ভাষাগত দক্ষতা এবং ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাঠ্যবই সাধারণত নির্দিষ্ট পাঠক্রম, পরীক্ষা এবং সিলেবাসভিত্তিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিভিন্ন ধরনের বই পড়লে শিক্ষার্থী জীবনের বহুমাত্রিক দিক সম্পর্কে জানতে পারে। সে সমাজের সমস্যাগুলো বোঝে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, বিজ্ঞানের নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হয় এবং বিভিন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম থেকে অনুপ্রেরণা পায়।

সাহিত্য পাঠ মানুষের অনুভূতিকে গভীর করে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা বা নাটকের মাধ্যমে পাঠক বিভিন্ন চরিত্রের আনন্দ, বেদনা, আশা, হতাশা, সাফল্য এবং ব্যর্থতার সঙ্গে পরিচিত হয়। এতে অন্য মানুষের প্রতি সহমর্মিতা জন্মায়। সাহিত্য একজন শিক্ষার্থীকে শেখায় যে পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের মানুষ, মত, সংস্কৃতি এবং জীবনসংগ্রাম রয়েছে। ফলে তার চিন্তা উদার হয় এবং অন্যের মতামতের প্রতি সহনশীলতা তৈরি হয়।
ইতিহাস পাঠের গুরুত্বও অপরিসীম। ইতিহাস পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশের অতীত, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, জাতীয় নেতাদের ভূমিকা এবং স্বাধীনতার পেছনের ত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারে। ইতিহাস শুধু অতীত জানার বিষয় নয়। এটি বর্তমানকে বোঝার এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দেশপ্রেম, জাতীয় চেতনা এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধ গড়ে তোলে। একইভাবে বিশ্বইতিহাস পাঠ করলে সে সভ্যতার বিকাশ, যুদ্ধ, শান্তি, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের নানা বিষয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।
বিজ্ঞানবিষয়ক বই শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিবাদী ও অনুসন্ধিৎসু মনোভাব তৈরি করে। বিজ্ঞান শেখায় যে কোনো বিষয়কে প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষার ভিত্তিতে বুঝতে হয়। বিজ্ঞানীদের জীবনী, আবিষ্কারের কাহিনি, মহাকাশ, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, কৃষি ও প্রযুক্তিবিষয়ক বই পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে শেখে। তারা কুসংস্কার থেকে দূরে থাকে এবং বাস্তবসম্মত চিন্তার অভ্যাস গড়ে তোলে। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে। তাই কলেজপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা তৈরি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
জীবনীমূলক বই পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মহান মানুষদের জীবন থেকে বাস্তব শিক্ষা লাভ করতে পারে। একজন বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, উদ্যোক্তা বা সমাজসংস্কারকের জীবনসংগ্রাম একজন তরুণকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। এসব বই থেকে বোঝা যায় যে সাফল্য সহজে আসে না। অধ্যবসায়, সততা, সময়ের সঠিক ব্যবহার, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। এই শিক্ষা শুধু পরীক্ষার জন্য নয়। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে কাজে লাগে।
বই পড়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়। বই পড়ার সময় একজন পাঠক কেবল লেখকের বক্তব্য গ্রহণ করে না। সে তথ্য, যুক্তি, চরিত্র, ঘটনা ও মতামত নিয়ে ভাবতে শেখে। সে প্রশ্ন করে, কারণ অনুসন্ধান করে এবং নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখে। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে তার বিচারবোধ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা, গবেষণা, উপস্থাপনা এবং কর্মজীবনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই দক্ষতাগুলো বিশেষভাবে প্রয়োজন।
নিয়মিত বই পড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকার হলো ভাষাগত দক্ষতার উন্নয়ন। বাংলা বই পড়লে শিক্ষার্থীদের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়, শুদ্ধ বানানের ব্যবহার শেখা যায় এবং সুন্দর বাক্য গঠনের অভ্যাস তৈরি হয়। তারা নিজেদের চিন্তা লিখিত ও মৌখিকভাবে গুছিয়ে প্রকাশ করতে শেখে। আবার ইংরেজি গল্প, প্রবন্ধ, সংবাদপত্র বা সহজ বই পড়ার মাধ্যমে ইংরেজি ভাষার সঙ্গে পরিচয় বাড়ে, নতুন শব্দ শেখা যায় এবং বাক্য গঠনের দক্ষতা উন্নত হয়। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, চাকরির লিখিত পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার, উপস্থাপনা এবং পেশাগত যোগাযোগে শক্তিশালী ভাষাগত দক্ষতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
জেলা প্রশাসকের উদ্যোগের গুরুত্ব
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবু সাঈদ মহোদয়ের প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষার্থীদের বই পড়ার জন্য কমিটি গঠনের উদ্যোগ একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তার প্রকাশ। এই উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি কেবল একটি প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচি হয়ে থাকবে না। বরং জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠাভ্যাসের একটি স্থায়ী পরিবেশ গড়ে উঠবে। শিক্ষার্থীরা বইকে পরীক্ষার বাইরের একটি প্রয়োজনীয় সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে শিখবে।
স্কুল ও কলেজভিত্তিক কমিটির মাধ্যমে পাঠাভ্যাস গঠনের কাজকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো দেওয়া সম্ভব। এসব কমিটিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, অভিভাবক প্রতিনিধি, স্থানীয় পাঠপ্রেমী ব্যক্তি, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং সমাজের সচেতন নাগরিকদের যুক্ত করা যেতে পারে। কমিটির দায়িত্ব হতে পারে পাঠাগারের উন্নয়ন করা, প্রয়োজনীয় বইয়ের তালিকা তৈরি করা, বই সংগ্রহ করা, পাঠচক্র পরিচালনা করা, পাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করা।
তবে বই পড়ার উদ্যোগকে বাধ্যতামূলক বা কেবল পুরস্কারনির্ভর করে তুললে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পাওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের বই পড়াতে হবে আনন্দের মাধ্যমে। বই পড়া যেন তাদের কাছে বাড়তি চাপ, শাস্তি বা কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি বলে মনে না হয়। তারা যেন অনুভব করে যে বই তাদের বন্ধু, পথপ্রদর্শক এবং জ্ঞানের ভাণ্ডার। শিক্ষার্থীর পছন্দ, বয়স, ভাষাগত দক্ষতা এবং আগ্রহ বিবেচনা করে বই নির্বাচন করলে পাঠাভ্যাস অনেক বেশি স্থায়ী হয়।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বৃহত্তর জ্ঞানজগতে প্রবেশের সুযোগ পাবে। অনেকে পরীক্ষার চাপ, কোচিংনির্ভর জীবন, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে বই পড়ার সময় বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। নিয়মিত পাঠচক্র, বই আলোচনা, কুইজ প্রতিযোগিতা, দেয়ালপত্রিকা, রচনা প্রতিযোগিতা, বই বিনিময় এবং লেখক পরিচিতি কার্যক্রম আয়োজন করলে তাদের মধ্যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব।
বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে শিক্ষার্থীরা গুজব, ভুয়া তথ্য, কুসংস্কার, উগ্রতা এবং অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সচেতন হতে পারে। যারা নিয়মিত পড়াশোনা করে, তারা কোনো তথ্য সহজে বিশ্বাস করার আগে তার উৎস যাচাই করতে শেখে। তারা যুক্তিভিত্তিক মতামত তৈরি করে এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা অর্জন করে। তাই পাঠাভ্যাস ব্যক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল এবং গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।
বই পড়া কর্মসূচির পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ক, খ ও গ. এই তিনটি বিভাগে বই পড়া প্রতিযোগিতা পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাংলা সাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং জীবনীমূলক গ্রন্থকে পাঠসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বিষয়গুলো নির্বাচনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সাহিত্যরুচি, দেশপ্রেম, জাতীয় চেতনা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার সুস্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতিযোগিতার মূল্যায়ন কাঠামোও যথেষ্ট অর্থবহ। মোট ৫০ নম্বরের মধ্যে লিখিত পরীক্ষার জন্য ২০ নম্বর, মৌখিক পরীক্ষার জন্য ১০ নম্বর এবং বই উপস্থাপন ও বিশ্লেষণের জন্য ২০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ধরনের মূল্যায়নে শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের তথ্য মুখস্থ করলেই সফল হতে পারবে না। তাকে বইয়ের বিষয়বস্তু বুঝতে হবে, নিজের ভাষায় তা ব্যাখ্যা করতে হবে এবং বইটির মূল শিক্ষা বা প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে যুক্তিসংগত মতামত দিতে হবে।
বই উপস্থাপনা ও বিশ্লেষণভিত্তিক মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে। তারা অন্যের সামনে কথা বলা, নিজের মতামত গুছিয়ে প্রকাশ করা এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলবে। এসব দক্ষতা ভবিষ্যতে শ্রেণিকক্ষের উপস্থাপনা, বিতর্ক, চাকরির মৌখিক পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার এবং পেশাগত জীবনে খুবই কার্যকর হবে।
উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা থেকে সেরা ১৫ জন শিক্ষার্থীকে জেলা পর্যায়ের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত করার পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করবে। চ্যাম্পিয়ন, প্রথম রানার-আপ এবং দ্বিতীয় রানার-আপদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকলে তারা আরও উৎসাহ পাবে। একই সঙ্গে সব অংশগ্রহণকারীকে সনদপত্র প্রদান করা হলে বিজয়ী না হলেও শিক্ষার্থীরা তাদের অংশগ্রহণের স্বীকৃতি পাবে। এতে তারা ভবিষ্যতে আবারও বই পড়া ও জ্ঞানচর্চার কার্যক্রমে অংশ নিতে আগ্রহী হবে।
কর্মসূচির স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসনের অধীনে সাতটি বিশেষ উপ-কমিটি দায়িত্ব পালন করতে পারে। বই নির্বাচন, প্রতিযোগিতা পরিচালনা, প্রশ্ন প্রণয়ন, মূল্যায়ন, পুরস্কার বিতরণ, প্রচার এবং সার্বিক তদারকির জন্য আলাদা দায়িত্ব বণ্টন করা হলে কর্মসূচি আরও সুশৃঙ্খল হবে। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, অংশগ্রহণের তথ্য সংরক্ষণ এবং কার্যক্রমের ফলাফল পর্যালোচনা করলে ভবিষ্যতে এই উদ্যোগকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বাঞ্ছারামপুর সরকারি কলেজের ভূমিকা
বাঞ্ছারামপুর সরকারি কলেজ এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কলেজ কেবল পাঠদান, পরীক্ষা এবং ফলাফল প্রকাশের প্রতিষ্ঠান নয়। এটি শিক্ষার্থীদের চিন্তা, রুচি, নৈতিকতা, দক্ষতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কলেজে একটি কার্যকর পাঠসংস্কৃতি তৈরি করা গেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বৃদ্ধি পাবে।
কলেজে একটি সক্রিয় বই পড়া কমিটি গঠন করা যেতে পারে। একজন আগ্রহী শিক্ষককে কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে এবং বিভিন্ন বিভাগ ও শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি রাখা যেতে পারে। এ কমিটি বার্ষিক পাঠপরিকল্পনা তৈরি, মাসিক বই নির্বাচন, পাঠচক্র পরিচালনা, পাঠাগার উন্নয়ন, বই সংগ্রহ, বই পর্যালোচনা প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আয়োজনের দায়িত্ব পালন করতে পারে।
প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিন বা সময়কে “পাঠঘণ্টা” হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এই সময়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দের বই পড়বে। পাঠ শেষে কয়েকজন শিক্ষার্থী সংক্ষেপে জানাতে পারে তারা কোন বই পড়েছে, বইটির মূল বক্তব্য কী এবং সেখান থেকে তারা কী শিক্ষা নিয়েছে। শিক্ষকরা বই নির্বাচনে পরামর্শ দিতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের বক্তব্যকে উৎসাহিত করতে পারেন। এতে বই পড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থাপন দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
প্রতি মাসে “মাসের বই” কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বয়স ও আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি মানসম্মত বই নির্বাচন করবে। মাসজুড়ে শিক্ষার্থীরা বইটি পড়বে এবং মাস শেষে আলোচনা, কুইজ, রচনা, পোস্টার তৈরি, নাট্যরূপ, বিতর্ক অথবা বই পর্যালোচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। এভাবে একটি বইকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার পরিবেশ তৈরি হবে।
কলেজের দেয়ালপত্রিকা, বার্ষিক ম্যাগাজিন এবং অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বই পড়ার আন্দোলনকে আরও জনপ্রিয় করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের লেখা বই পর্যালোচনা, ছোট প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, পাঠ-অনুভূতি এবং অনুপ্রেরণামূলক উদ্ধৃতি প্রকাশ করা যেতে পারে। ভালো লেখা প্রকাশিত হলে শিক্ষার্থীরা লেখার প্রতি আগ্রহী হবে এবং অন্যরাও বই পড়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে উৎসাহ পাবে।
পাঠাগার, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সমন্বিত দায়িত্ব
একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত পাঠাগার ছাড়া পাঠাভ্যাসের আন্দোলন সফল করা কঠিন। বাঞ্ছারামপুর সরকারি কলেজের লাইব্রেরিকে শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয়, পরিচ্ছন্ন, আলোকিত ও শান্ত পরিবেশে গড়ে তুলতে হবে। লাইব্রেরিতে শুধু পাঠ্যবই থাকলে যথেষ্ট হবে না। বাংলা সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্য, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, পরিবেশ, জীবনী, ভ্রমণকাহিনি, ক্যারিয়ার, সাধারণ জ্ঞান এবং সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক বইয়ের সংগ্রহ বাড়াতে হবে। “বিজ্ঞান কর্নার”, “মুক্তিযুদ্ধ কর্নার”, “ক্যারিয়ার কর্নার”, “নতুন বইয়ের তাক” এবং “এই সপ্তাহের বই” নামে আলাদা বিভাগ তৈরি করা হলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে।
লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত আলো, বসার ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা এবং নীরব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বই ধার নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে বই বাড়িতে নিয়ে পড়তে পারে। নিয়মিত পাঠকদের মাসিকভাবে সম্মাননা দেওয়া বা তাদের নাম নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করা যেতে পারে। বই সংগ্রহের জন্য শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি এবং পাঠপ্রেমী মানুষের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। “একজন একটি বই দান করি” কর্মসূচি গ্রহণ করে লাইব্রেরির বইয়ের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা সম্ভব।
শিক্ষকদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন। তিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও মূল্যবোধ গঠনের পথপ্রদর্শক। বাংলা বিভাগের শিক্ষক সাহিত্য পাঠে উৎসাহ দিতে পারেন, ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাসবিষয়ক বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন, বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক বিজ্ঞানীদের জীবনী ও জনপ্রিয় বিজ্ঞানবিষয়ক বইয়ের কথা বলতে পারেন এবং ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক সহজ ইংরেজি গল্প, প্রবন্ধ ও সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস গড়ে দিতে পারেন। শিক্ষকদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের বই পড়ার আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা, চাপ সৃষ্টি করা নয়।
শিক্ষার্থীদেরও নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুললে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি শক্তিশালী পাঠাভ্যাস তৈরি হতে পারে। তারা সহজ ও পছন্দের বই দিয়ে শুরু করতে পারে। পড়ার সময় নতুন শব্দ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, সুন্দর উক্তি এবং নিজের চিন্তা একটি খাতায় লিখে রাখলে পড়ার অভিজ্ঞতা আরও ফলপ্রসূ হবে। বন্ধুদের সঙ্গে বই বিনিময় করা, একই বই পড়ে আলোচনা করা এবং পাঠচক্রে অংশ নেওয়া বই পড়াকে আরও আনন্দদায়ক করে তুলতে পারে।
পরিশেষে বলা যায় যে “বই পড়ি, দেশ গড়ি”. এই চেতনা বাস্তবায়নে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের বই পড়া কর্মসূচি একটি মহৎ, শিক্ষাবান্ধব এবং সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আবু সাঈদের সাহিত্যপ্রেম, লেখকসত্তা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার আন্তরিক প্রচেষ্টা এ উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বাঞ্ছারামপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা যদি সক্রিয়ভাবে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বই পড়ার আলো তাদের ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু, সমাজ ও পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়বে। বই কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করতে সহায়তা করে না। এটি একজন তরুণকে চিন্তাশীল, সৃজনশীল, যুক্তিবাদী, মানবিক, আত্মবিশ্বাসী এবং দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কলেজ প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নিয়মিত পাঠঘণ্টা, পাঠচক্র, বই পর্যালোচনা, মাসের বই, পাঠাগার উন্নয়ন, বই দান কর্মসূচি এবং বই পড়া প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কলেজে একটি টেকসই পাঠসংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। একটি বই একজন মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে। আর বইপড়া শিক্ষার্থীদের একটি প্রজন্ম একটি কলেজ, একটি উপজেলা এবং সমগ্র দেশকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলোয় আলোকিত করতে পারে।
লেখক: ফয়সাল হাবিব
প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ,
বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।