• শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫২ অপরাহ্ন

মতামত

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা: ৮:০০ টা থেকে ২:০০

লেখক:ফয়সাল হাবিব
আপডেট: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো, ব্যানবেইসের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বর্তমানে মোট ২০ হাজার ৯৬০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৮৪টি, আর বেসরকারি বিদ্যালয় রয়েছে ২০ হাজার ২৭৬টি।এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রমে নিয়োজিত শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৬৮ জন। একই সময়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটি এক লাখ ৯০ হাজার ২২ জন, যার মধ্যে ছাত্রী রয়েছে ৫৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪৮ জন।বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় বিদ্যালয়ের সময়সূচি অনেক সময় প্রশাসনিক একটা বিষয় হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু এর প্রভাব শিক্ষার্থীর ঘুম, মনোযোগ, শেখার দক্ষতা, মানসিক চাপ, যাতায়াত, খেলাধুলা ও পারিবারিক জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত। স্কুলের সময় শুধু ক্লাসে বসে থাকার বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীর পুরো দিনের ছন্দ নির্ধারণ করে।বর্তমানে অনেক বিদ্যালয় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে। কিন্তু তার আগে অনেকে কোচিং করে, আবার স্কুল শেষেও কোচিং বা প্রাইভেট টিউটর থাকে। ফলে দিনের বড় অংশটাই আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় কেটে যায়। প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীকে দীর্ঘক্ষণ ব্যস্ত রাখলেই কি ভালো শিক্ষা নিশ্চিত হয়, নাকি সঠিক সময়ে কার্যকরভাবে শেখানোই বেশি জরুরি? এই চিন্তা থেকেই সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবটি গুরুত্ব পাওয়ার মতো।

এশিয়ার অন্যান্য দেশ কী করে?
আমাদের তুলনামূলক প্রেক্ষাপটে এশিয়ার অভিজ্ঞতা খুব কাজে দেয়। চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপানসহ সবখানেই পরীক্ষার চাপ ও বাড়তি পড়াশোনার প্রবণতা আছে, তাই তাদের সময়সূচি আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। চীনে ২০২১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নির্দেশ দেয়, নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে ক্লাস সাধারণত সকাল ৮টার আগে শুরু করা যাবে না। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, বিরতি ও দুপুরের বিশ্রামের ওপর জোর দেওয়া হয়। ২০২১ সালের শেষে ৯৭.৪ শতাংশ বিদ্যালয় এই নিয়ম মেনেছিল। এটি প্রমাণ করে, প্রতিযোগিতামূলক দেশেও তারা দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তে ঘুম ও বিশ্রামকে গুরুত্ব দেয়। সিঙ্গাপুরে অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয় সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে শুরু হয়ে দুপুর ২টার মধ্যে নিয়মিত ক্লাস শেষ করে। জাপানে সেখানে একটি পিরিয়ড সাধারণত ৫০ মিনিটের হয়ে থাকে। শ্রীলঙ্কার সরকারি ও অনুমোদিত স্কুলগুলোতে সাধারণ ক্লাস সকাল ৭:৩০ মিনিটে শুরু হয়ে দুপুর ১:৩০ মিনিটে শেষ হয়।ভারতে ২০২৩ সালের জাতীয় পাঠ্যক্রম কাঠামোয় সপ্তাহে প্রায় ২৯ ঘণ্টা শ্রেণিকেন্দ্রিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে, যা পাঁচ দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট।এই উদাহরণগুলো দেখায়, সকালভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল সময়সূচি এশিয়ায় নতুন নয়।বাংলাদেশে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মোট ছয় ঘণ্টা। বিরতি বাদ দিলে কার্যকর পাঠদানের সময় প্রায় ৫ ঘণ্টা ১৫ থেকে ৩০ মিনিট, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

কেন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা?
এই প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মোট সময় ছয় ঘণ্টাই থাকে; শুধু সময়ের স্থানান্তর ঘটে। সকালের দিকে কঠিন বিষয় পড়ালে শিক্ষার্থীরা সতেজ থাকে। দুপুরের পরের সময়টা তারা বিশ্রাম, খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ, পরিবার ও বাড়ির পড়ার জন্য পায়।একটি সম্ভাব্য সূচি: ৫০ মিনিটের ছয়টি পিরিয়ড। প্রথম তিনটি পিরিয়ড ৮টা থেকে ১০টা ৩০ পর্যন্ত, তারপর ২০ মিনিট টিফিন, এরপর তিনটি পিরিয়ড ১০টা ৫০ থেকে ১টা ২০ পর্যন্ত, এবং শেষ ৪০ মিনিট পুনরালোচনা, ব্যবহারিক বা দুর্বল শিক্ষার্থীদের সাহায্যের জন্য রাখা যেতে পারে। গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজির মতো মনোযোগসাপেক্ষ বিষয় প্রথম দিকে রাখা ভালো। অনেক এশিয়ান দেশে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে স্কুল শুরু হলেও বাংলাদেশের গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের কথা ভাবতে হবে। খুব ভোরে শুরু করলে তাদের যাতায়াত, ঘুম ও নাশতার ওপর চাপ পড়ে। সকাল ৮টা একটি মধ্যপন্থী সময়; এটি খুব তাড়াতাড়িও না, আবার দিনের সতেজতাও কাজে লাগে। চীনের ‘সকাল ৮টার আগে নয়’ নীতিও এই সময়কে সমর্থন করে।

সকালের ক্লাসের শিক্ষাগত সুবিধা
শিক্ষার্থীরা বিকেলের তুলনায় সকালে বেশি সতেজ থাকে, তাই বিশ্লেষণধর্মী বিষয় সকালে পড়ালে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। তবে খুব ভোরে স্কুল শুরু করলে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৈশোরে দেরিতে স্কুল শুরু করলে ঘুমের সময় বাড়ে। তাই সকাল ৮টার সময়সূচি কার্যকর করতে হলে ভোর ৬টা বা ৭টায় বাধ্যতামূলক কোচিং না রাখার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
কোচিংনির্ভরতা কমানোর সুযোগ
আমাদের দেশে কোচিং একটি বড় বিষয়। যদি একজন শিক্ষার্থী সকাল ৭টায় কোচিং করে, তারপর ১০টা থেকে ৪টা স্কুলে থাকে, তাহলে তার শিক্ষাকেন্দ্রিক সময় কমপক্ষে ৯ ঘণ্টা। এর সঙ্গে বাড়ির কাজ ও যাতায়াত যোগ করলে তার ব্যক্তিগত সময় প্রায় শেষ।সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টার সূচি বিদ্যালয়ের মধ্যেই পুনরালোচনা, অনুশীলন ও প্রস্তুতির ব্যবস্থা করার সুযোগ দেয়, যা বাইরের কোচিংয়ের চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে এর জন্য বিদ্যালয়ের পাঠদানের মান বাড়ানো জরুরি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়
সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিদ্যালয় পরিচালনা করলে প্রাকৃতিক আলো বেশি ব্যবহার করা সম্ভব হয়, ফলে শ্রেণিকক্ষে বৈদ্যুতিক আলো ব্যবহারের প্রয়োজন কমে। দুপুরের পর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যান, লাইট, কম্পিউটার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। ২০২৬ সালের ৩০ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ২টায় লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট, বিকেল ৩টায় ৩ হাজার ১৬৭ মেগাওয়াট এবং বিকেল ৪টায় ৩ হাজার ৮৫ মেগাওয়াট। তাই বিদ্যালয় দুপুর ২টায় ছুটি হলে বিকেলের উচ্চ বিদ্যুৎচাহিদার সময়ে ব্যয় কমানো সম্ভব। জাতীয় পর্যায়ের সাশ্রয় নিরূপণে গবেষণা প্রয়োজন হলেও বিদ্যালয় পর্যায়ে এটি পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগ।

শিক্ষার্থীর বিকেল ফিরে পাওয়া
শিক্ষা শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খেলাধুলা, শিল্প, সংগীত, বিজ্ঞানচর্চা ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সূচিতে স্কুল শেষে কোচিং ও বাড়ির পড়া যোগ হলে বিকেল পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। নতুন সূচি শিক্ষার্থীদের বিকেল ফিরিয়ে দিতে পারে, যা তাদের জীবনকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করবে।

শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বৃদ্ধি
সকালবেলা শিক্ষার্থীদের মন সাধারণত তুলনামূলকভাবে সতেজ ও মনোযোগী থাকে। রাতে পর্যাপ্ত বিশ্রামের পর বিদ্যালয়ে এসে তারা নতুন বিষয় শিখতে, শিক্ষকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে এবং শ্রেণিকক্ষের আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে বেশি সক্ষম হয়। সকাল ৮টায় বিদ্যালয় শুরু হলে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানসহ গুরুত্বপূর্ণ ও মনোযোগনির্ভর বিষয়গুলো দিনের প্রথম ভাগে পাঠদান করা সম্ভব হবে। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ, পাঠ বোঝার ক্ষমতা এবং শ্রেণিকক্ষের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। সময়মতো বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার অভ্যাসও তৈরি হবে। বিশেষ করে নিয়মিত উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে এবং পরীক্ষার ফলাফল উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

গ্রামীণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী দূরবর্তী এলাকা থেকে হেঁটে, সাইকেলে, নৌকায় বা অন্যান্য সীমিত যাতায়াত ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে আসে। তাদের অনেকের পরিবার কৃষিকাজ, গবাদিপশু পালন, ছোট ব্যবসা কিংবা গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিদ্যালয়ের সময় দীর্ঘ হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিদ্যালয় চললে তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ গ্রহণ শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারবে। এরপর বিশ্রাম, খাবার, বাড়ির কাজ এবং প্রয়োজনীয় পারিবারিক দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাবে। এ ধরনের সময়সূচি গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী রাখতে এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি কমাতে কার্যকর হতে পারে।
গরম ও জলবায়ুজনিত সমস্যা হ্রাস
বাংলাদেশে বছরের বড় একটি সময়ে, বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে দুপুরের পর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বেড়ে যায়। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ফ্যান, বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা কিংবা আরামদায়ক শ্রেণিকক্ষ পরিবেশ নেই। ফলে দুপুরের পর অতিরিক্ত গরমে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কমে, ক্লান্তি তৈরি হয় এবং পাঠ গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে। তীব্র গরমে মাথাব্যথা, পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়ে। দুপুর ২টার মধ্যে বিদ্যালয় ছুটি হলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েই দিনের সবচেয়ে অস্বস্তিকর সময়ের দীর্ঘ ক্লাস থেকে মুক্তি পাবেন। এটি একটি স্বাস্থ্যসম্মত, আরামদায়ক এবং শেখার উপযোগী শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে।
শিক্ষকদের মানসম্মত পাঠদানে সহায়তা
একজন শিক্ষককে শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পাঠ পরিকল্পনা তৈরি, পাঠ্যবস্তু প্রস্তুত, শিক্ষার্থীদের খাতা মূল্যায়ন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজও সম্পন্ন করতে হয়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হলে বিকেলের সময়টি শিক্ষকরা এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারবেন। ফলে পরবর্তী দিনের পাঠ আরও পরিকল্পিত, আকর্ষণীয় ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিকভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। নিয়মিত খাতা মূল্যায়ন ও শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ বাড়বে। এতে শিক্ষকদের কর্মচাপ তুলনামূলকভাবে সুশৃঙ্খল হবে এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার গুণগত মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ বৃদ্ধি
শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ কেবল পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভব নয়। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিতর্ক, স্কাউটিং, বিজ্ঞানচর্চা, পাঠাগার ব্যবহার, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম তাদের নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, শৃঙ্খলা ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। বিদ্যালয় দুপুর ২টার মধ্যে শেষ হলে শিক্ষার্থীরা বিকেলে এসব সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগ পাবে। বিদ্যালয় চাইলে নির্দিষ্ট সময়সূচির মাধ্যমে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনের আয়োজন করতে পারবে। আবার শিক্ষার্থীরা নিজ বাড়ি বা স্থানীয় পর্যায়েও গঠনমূলক কাজে অংশ নিতে পারবে। এতে পড়াশোনার চাপের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি তৈরি হবে এবং সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও বহুমুখী দক্ষতাসম্পন্ন নাগরিক গড়ে উঠবে।

ট্রাফিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সহজ হবে
বিদ্যালয়ের সময়সূচির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত নিরাপত্তার বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত। সকাল ৮টায় ক্লাস শুরু হলে শিক্ষার্থীরা দিনের আলোতে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারবে। আবার দুপুর ২টার মধ্যে ছুটি হলে তারা সন্ধ্যা নামার আগেই নিরাপদে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হবে। শহরাঞ্চলে বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে যানজট, জনসমাগম এবং সড়কে ব্যস্ততা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় বিকেলের পর যাতায়াতের যানবাহন সীমিত হতে পারে এবং কিছু এলাকায় সড়ক ও নৌপথ ব্যবহারে ঝুঁকি থাকে। তাই আগে ছুটি হলে অভিভাবকদের উদ্বেগ কমবে। শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত যানজট, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনা এড়িয়ে নিয়মিত ও নিরাপদভাবে যাতায়াত করতে পারবে।

স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসের উন্নয়ন
শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সময়মতো পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অবস্থান করলে অনেক শিক্ষার্থী দুপুরের খাবার দেরিতে খায় অথবা অস্বাস্থ্যকর বাইরের খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে পুষ্টির ঘাটতি, ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে। দুপুর ২টার মধ্যে বিদ্যালয় শেষ হলে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে ফিরে নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার সুযোগ পাবে। পরিবারের সঙ্গে বসে খাবার গ্রহণের অভ্যাসও তৈরি হতে পারে। পর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণের পর তারা বিশ্রাম, পড়াশোনা এবং খেলাধুলার জন্য শক্তি পাবে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শেখার সক্ষমতা, শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাস্তবায়নের পথ
সারা দেশে একবারে পরিবর্তন না করে প্রথমে নির্বাচিত কয়েকটি বিদ্যালয়ে (শহর, উপজেলা ও গ্রামীণ) পরীক্ষামূলকভাবে কমপক্ষে এক শিক্ষাবর্ষ চালানো উচিত। তারপর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, ফলাফল, ঘুমের সময়, কোচিং নির্ভরতা, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ, অভিভাবক ও শিক্ষকের মতামত এবং বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব তুলনা করতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় যাচাই করতে পরিবর্তনের আগে ও পরে মাসিক বিল মাপা দরকার।

পরিশেষে
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় সময়সূচি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, সকাল ৮টার কাছাকাছি স্কুল শুরু করা বাস্তবসম্মত। চীনে ৮টার আগে ক্লাস শুরু না করার নীতি আছে, জাপানে ৫০ মিনিটের পিরিয়ড, ভারত ও সিঙ্গাপুরেও সকালভিত্তিক সূচির উদাহরণ রয়েছে।সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টার মডেলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি মোট ছয় ঘণ্টার স্কুল সময় কমায় না, বরং পুনর্বিন্যাস করে। এতে দিনের প্রথম ভাগ শেখার জন্য ব্যবহার হয়, বিকেল শিক্ষার্থীর হাতে ফিরে আসে এবং বিদ্যালয়ের বিকেলকালীন বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর সুযোগ হবে। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষার্থী কত ঘণ্টা স্কুলে ছিল তার ওপর নয়, বরং সেই সময়ে সে কতটা শিখল এবং স্কুলের বাইরে তার বিকাশের জন্য কতটা সময় পেল তার ওপর। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টার সময়সূচি সেই ভারসাম্য তৈরির একটি সম্ভাব্য ও পরীক্ষাযোগ্য পথ হতে পারে।
লেখক:ফয়সাল হাবিব
প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ
বাঞ্ছারামপুর , ব্রাহ্মনবাড়িয়া


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০