• সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০২ অপরাহ্ন

হাইব্রিড বীজে বাড়ছে ফলন, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতাও 

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের কৃষিতে গত এক দশকে হাইব্রিড বীজের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে গত এক দশকে ভুট্টা, সবজি ও ধানের মতো বিভিন্ন ফসলে হাইব্রিড ও উন্নতমানের বীজের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে মানসম্মত বীজের সরবরাহ মোট চাহিদার প্রায় ১৩ শতাংশ থাকলেও ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ভুট্টায় প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং সবজি খাতে হাইব্রিড বীজের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর গবেষণা ও বিভিন্ন প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, হাইব্রিড বীজ দুটি নির্বাচিত পিতৃ ও মাতৃ লাইনের সংকরায়ণের মাধ্যমে উৎপাদিত প্রথম প্রজন্মের (এফ-১) বীজ। এই বীজ থেকে উৎপাদিত ফসল সাধারণত অধিক ফলন দেয়। তবে সেই ফসলের বীজ পরবর্তী মৌসুমে পুনরায় ব্যবহার করলে একই উৎপাদন বা গুণগত মান বজায় থাকে না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষকদের প্রতি মৌসুমেই নতুন হাইব্রিড বীজ সংগ্রহ করতে হয়।

বাংলাদেশের বাজারে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য অংশের হাইব্রিড সবজি বীজ ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। তবে বিদেশি কোনো জাত সরাসরি বাজারজাত করা যায় না। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিড উইং এর নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো নতুন জাত বাণিজ্যিকভাবে আমদানির আগে দেশের জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা যাচাই করতে একাধিক মৌসুমে পরীক্ষামূলক চাষ পরিচালনা করতে হয়। প্রত্যাশিত ফলন, অভিযোজন সক্ষমতা ও গুণগত মান নিশ্চিত হওয়ার পর নিবন্ধনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক অনুমোদন দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) জানিয়েছে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতই বীজ সরবরাহে ভূমিকা রাখলেও উচ্চমূল্যের অনেক হাইব্রিড সবজি বীজের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা এখনো উল্লেখযোগ্য। বাজারে বর্তমানে বিজলিপ্লাস মরিচ, বাহুবলী টমেটো, ময়না লাউ এবং পালসার মূলার মতো কয়েকটি হাইব্রিড জাত কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এসব জাত অধিক উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারে মানসম্মত সবজির সরবরাহ বাড়াতেও সহায়তা করছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বীজ নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা তাদের বীজব্যবস্থা ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করেছে, একটি দেশের কৃষি যদি অতিমাত্রায় আমদানিকৃত বীজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন কিংবা বৈশ্বিক বাণিজ্যগত অনিশ্চয়তার প্রভাব সরাসরি কৃষি উৎপাদনে পড়তে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের ঝুঁকিও বাড়ে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) হাইব্রিড বীজের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রকাশিত নীতিপত্রে উল্লেখ করেছে, হাইব্রিড প্রযুক্তি কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে গবেষণা, স্থানীয় বীজ উন্নয়ন এবং শক্তিশালী বীজব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

কৃষি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আই ফার্মার মনে করে হাইব্রিড প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে কোনো একটি উৎস বা প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ অধিকাংশ হাইব্রিড বীজ থেকে সংগৃহীত বীজ পরবর্তী মৌসুমে একই ফলন দেয় না, ফলে কৃষকদের প্রতি বছর নতুন বীজ কিনতে হয়। তাই হাইব্রিডের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি কৃষকদের বীজের ধরন সম্পর্কে সচেতন করা, উপযুক্ত ক্ষেত্রে দেশীয় ও ওপেন-পলিনেটেড জাত সংরক্ষণে উৎসাহ দেওয়া এবং স্থানীয়ভাবে উন্নত হাইব্রিড উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন সেই উৎপাদনের ভিত্তি—টেকসই বীজব্যবস্থা। হাইব্রিড প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এই প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি দেশীয় উদ্ভাবন, গবেষণা ও বীজ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করে ভবিষ্যতের কৃষিকে অধিক ফলনশীল, সহনশীল এবং আত্মনির্ভর করে তোলা।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০