• মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:১৮ অপরাহ্ন

আলুর বাজারে বস্তা সংকট: কৃষক কেন বারবার হারছে?

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

এইচ এম মিজানুর রহমান: বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো—ভালো ফলনও কৃষকের জন্য স্বস্তির নিশ্চয়তা নয়। বরং বহু সময় উৎপাদন যত বাড়ে, কৃষকের অনিশ্চয়তাও তত বাড়ে। রাজশাহীর আলুর বাজারে চলমান অস্থিরতা সেই পুরোনো বাস্তবতারই নতুন প্রকাশ। মাঠে ফসল আছে, কিন্তু কৃষকের ঘরে নেই নিশ্চিন্তি। ফলন ভালো, কিন্তু বাজারে ন্যায্যমূল্য নেই। আর সেই মূল্যপতনের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে একটি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ উপকরণ—চটের বস্তা।
রাজশাহী অঞ্চলে এবার আলুর উৎপাদন আশাব্যঞ্জক হয়েছে। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। গত বুধবার যে আলু ১৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তার দাম নেমে এসেছে ১৩ টাকায়। কোথাও কোথাও আরও কম দামে আলু বিক্রির কথাও শোনা যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে—এত দ্রুত দরপতনের পেছনে কি কেবল চাহিদা-জোগানের নিয়ম কাজ করছে? বাস্তবতা বলছে, না। এখানে বাজারের স্বাভাবিক প্রবাহের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সরবরাহশৃঙ্খলের অস্বচ্ছতা, কৃত্রিম সংকট এবং মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ন্ত্রণ।
এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আলু বহন ও সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত চটের বস্তা। গত বছর যে বস্তা ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটি সাধারণ বস্তার দামে এক বছরে এমন অস্বাভাবিক লাফ কেবল বাজারের সাধারণ ওঠানামা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পাটের দাম কিছুটা বাড়তে পারে, সরবরাহে সাময়িক চাপও থাকতে পারে; কিন্তু একটি কৃষিপণ্যের বিপণনব্যবস্থাকে এমনভাবে অচল করে দেওয়ার মতো মূল্যবৃদ্ধি নিছক অর্থনৈতিক ঘটনা নয়। এটি স্পষ্টভাবে একটি কৃত্রিম সংকটের গন্ধ বহন করে।
ফলাফল হচ্ছে, কৃষক সময়মতো আলু বাজারে তুলতে পারছেন না। অনেকেই বাড়ির পাশে আলুর স্তূপ করে রাখছেন। কেউ বৃষ্টির ভয়ে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখছেন, কেউ পচে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যেই আরও উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠছে—যেসব ব্যবসায়ী আগে ১৫–১৬ টাকা দরে আলু কেনার বায়না দিয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন “বস্তা নেই” অজুহাতে সেই আলু তুলতে আসছেন না। অর্থাৎ, বস্তার সংকট এখানে কেবল একটি উপকরণগত সমস্যা নয়; এটি বাজারে কৃষককে দুর্বল করে দিয়ে কম দামে বিক্রিতে বাধ্য করার একটি কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
এই চিত্র আমাদের কৃষি অর্থনীতির গভীরতর দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশে কৃষক সবচেয়ে বেশি হারেন শুধু মাঠে নয়, মাঠের পরের পর্যায়ে। উৎপাদনের পর সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, পরিবহন, বিপণন, হিমাগারে প্রবেশাধিকার এবং বাজারে দরকষাকষির ক্ষমতা—এই প্রতিটি জায়গায় কৃষক দুর্বল। আলুর মতো একটি সংবেদনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে এই দুর্বলতা আরও প্রকট। সময়মতো বাজারে তুলতে না পারলে, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারলে, কিংবা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলে ভালো ফলনও কৃষকের জন্য আশীর্বাদ নয়—অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।
খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক জাতিসংঘের সংস্থা FAO বহুদিন ধরেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষি খাতে “পোস্ট-হারভেস্ট লস” বা ফসল-পরবর্তী ক্ষতিকে একটি বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। তাদের পর্যবেক্ষণ হলো, উৎপাদন বাড়ানোই কৃষকের সমৃদ্ধির নিশ্চয়তা নয়; বরং উৎপাদনের পর যদি সংরক্ষণ, প্যাকেজিং, বাজারজাতকরণ ও মূল্য সুরক্ষা দুর্বল থাকে, তাহলে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করেন এবং মূল লাভের বড় অংশ চলে যায় সরবরাহশৃঙ্খলের মধ্যবর্তী স্তরে। একই সঙ্গে বাড়ে পণ্যের অপচয় ও কৃষকের আর্থিক অনিরাপত্তা।
বাংলাদেশের আলুর বাজারে এখন আমরা ঠিক এই দৃশ্যই দেখছি। গ্রামে কৃষক ১১ থেকে ১৩ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, অথচ শহরের ভোক্তা সেই আলুই কিনছেন ২৫ থেকে ৩০ টাকা কিংবা তারও বেশি দামে। অর্থাৎ, কৃষক হারছেন, ভোক্তাও লাভবান হচ্ছেন না। লাভের বড় অংশটি আটকে যাচ্ছে মাঝপথে। এটাই বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বাজারের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য—যেখানে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই চাপে, কিন্তু মধ্যবর্তী অংশ শক্তিশালী।
এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কারণ, আধুনিক কৃষি অর্থনীতিতে কৃষককে শুধু উৎপাদক হিসেবে দেখলে চলে না; তাঁকে বাজারেরও অংশীদার করতে হয়। আর সে জন্য দরকার ন্যায্যমূল্য সুরক্ষা, সরবরাহশৃঙ্খলে স্বচ্ছতা এবং মৌসুমি সংকটে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, আলুর মতো কৃষিপণ্যের বাজারকে “ছেড়ে দিলে” কৃষক রক্ষা পান না। ভারতে আলুর দরপতন দেখা দিলে বিভিন্ন রাজ্য সরকার প্রায়ই সরকারি ক্রয়, কোল্ড স্টোরেজ সহায়তা, পরিবহন সুবিধা, রপ্তানি সহায়তা এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সঙ্গে সংযোগ—এসব পদক্ষেপ নেয়। অন্যদিকে, Netherlands–এর মতো দেশে আলু কেবল একটি কাঁচা কৃষিপণ্য নয়; এটি একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক পণ্য, যার সঙ্গে যুক্ত আছে চুক্তিভিত্তিক চাষ, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং রপ্তানি। ফলে উৎপাদন বাড়লেও কৃষক পুরোপুরি ভেঙে পড়েন না। বাংলাদেশেও আলুকে সেই ধরনের সমন্বিত মূল্যশৃঙ্খলের আওতায় আনার সময় এসেছে।
এখন জরুরি হলো দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। প্রথমত, বস্তার বাজারে জরুরি তদন্ত ও অভিযান চালাতে হবে। কে কোথায় কত বস্তা মজুত করেছে, কীভাবে সরবরাহ কমে গেল, এবং কেন এক বছরে দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেল—এসবের জবাব জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষক পর্যায়ে সুলভ মূল্যে বস্তা সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, আলুপ্রধান জেলাগুলোতে অস্থায়ী সরকারি ক্রয়কেন্দ্র চালু করে কৃষকের কাছ থেকে ন্যূনতম সহায়ক দামে আলু কেনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। চতুর্থত, হিমাগার মালিকদের কার্যক্রম, ভাড়া ও সংরক্ষণব্যবস্থা কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। পঞ্চমত, বায়না দিয়ে পরে অজুহাতে সরে গিয়ে বাজারচাপ সৃষ্টি করার মতো অনৈতিক ব্যবসায়িক চর্চার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারও জরুরি। আলু উৎপাদনকারী অঞ্চলে কৃষক সমবায়ভিত্তিক প্যাকেজিং সেন্টার, সংরক্ষণ অবকাঠামো, প্রসেসিং শিল্প, রপ্তানি-সহায়ক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল কৃষি বাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। একই সঙ্গে পাটভিত্তিক বস্তা উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে, যাতে একটি মৌসুমি পণ্যের বিপণন একটি উপকরণের সংকটে আটকে না যায়।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা কেবল অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বও। কারণ, আজ যদি কৃষক লোকসানে আলু চাষ ছেড়ে দেন, আগামী মৌসুমে তার প্রভাব পড়বে সরাসরি ভোক্তার বাজারে। তখনই আবার দাম বাড়বে, সরবরাহ কমবে, এবং আমরা নতুন করে বাজার অস্থিরতার মুখোমুখি হব। অর্থাৎ, আজকের কৃষক-সংকটই আগামী দিনের ভোক্তা-সংকটের বীজ বয়ে আনছে।
রাজশাহীর মাঠে পড়ে থাকা আলুর স্তূপ তাই কেবল একটি মৌসুমি বাজার-চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষকের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, বাজারের অস্বচ্ছতা এবং নীতিগত শৈথিল্যের এক জ্বলন্ত প্রতীক। যে কৃষক দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তিনি যদি একটি বস্তার দামের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন, তাহলে সেটি শুধু কৃষকের দুর্ভাগ্য নয়—এটি রাষ্ট্রের বাজারব্যবস্থাপনারও ব্যর্থতা।
এখন সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
আলুর দাম পড়ে যাওয়ার আগেই রাষ্ট্রকে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে।

লেখক :এইচএম মিজানুর রহমান
সাংবাদিক, অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
Email:mizanur.Rahman.99318@gmail.com


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০