দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত: প্রিয় পাঠক বৃন্দ, সচেতন নাগরিক এবং নীতিনির্ধারক বৃন্দ। একটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং মানবিক প্রশ্ন নিয়ে আজকের আলোচনা। সাথেই থাকুন।
বাংলাদেশে মাজার বা দরগাহগুলোতে যে পরিমাণ দান-সদকা আসে, তার ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক এবং আলোচনা রয়েছে। আলোচনার প্রেক্ষিতে বিষয়টি কয়েকটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন:
১. কবরে শায়িত ব্যক্তির কি এই অর্থের প্রয়োজন আছে?
ইসলামী শরীয়ত এবং সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান—উভয় দিক থেকেই উত্তর হলো ‘না’। যিনি কবরে আছেন, তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে গেছেন। পার্থিব কোনো অর্থ বা মুদ্রার প্রয়োজন তার নেই। তাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য টাকা বা দানবাক্সে পয়সা ফেলার কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। মূলত মাজারে আগত দর্শনার্থীরা বা ভক্তরা নিজেদের মানত বা সওয়াব অর্জনের নিয়তে এই দান করে থাকেন।
২. দানবাক্সের অর্থের সঠিক ব্যবহার কী হওয়া উচিত?
ইসলামী বিধান এবং মাজার পরিচালনার সরকারি নীতিমালা (ওয়াকফ সম্পত্তি অনুযায়ী) অনুসারে, এসব দানকৃত অর্থ সাধারণত তিনটি খাতে ব্যবহার হওয়ার কথা।
মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ: স্থাপনার সংস্কার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা।
আগত মুসাফির ও অভাবীদের সেবা: যারা দূর-দূরান্ত থেকে আসেন এবং যারা দরিদ্র।
জনকল্যাণমূলক কাজ: বিশেষ করে শিক্ষা (মাদ্রাসা/এতিমখানা) এবং স্বাস্থ্যসেবা।
৩. হাসপাতাল ও চিকিৎসা সেবায় দানের প্রয়োজনীয়তা
আপনি যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন—অর্থাৎ হসপিটালে চিকিৎসা বঞ্চিতদের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা—তা বর্তমান সময়ের জন্য সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ এবং সওয়াবের কাজ।
মানবসেবাই বড় ইবাদত: ইসলামে আর্তমানবতার সেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা করা বা ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া মাজারের দেয়ালে চাদর চড়ানোর চেয়ে বহুগুণ বেশি সওয়াবের কাজ।
সম্পদের সঠিক বন্টন: বাংলাদেশের বড় বড় মাজারগুলোতে (যেমন সিলেট বা চট্টগ্রামের প্রধান মাজারগুলো) প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা জমা হয়। এই বিপুল অর্থ যদি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ বা গরীব রোগীদের ওষুধের পেছনে ব্যয় করা হয়, তবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।
৪. বর্তমান পরিস্থিতি ও বাস্তবতা
বাস্তবতা হলো, অনেক মাজার পরিচালনা কমিটি এসব অর্থের সঠিক হিসাব রাখে না বা জনকল্যাণে তেমন একটা ব্যয় করে না। তবে কিছু কিছু মাজার কর্তৃপক্ষ এতিমখানা বা লঙ্গরখানা চালায়, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু হসপিটালের মতো জটিল ও ব্যয়বহুল খাতে এই অর্থের ব্যবহার এখনো বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি।
আমার চিন্তার প্রতিফলন (উপসংহার)
আপনাদের মনেও এমন ধারণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। দান করা হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আর আল্লাহর সৃষ্টি যখন অসুস্থতায় বা অর্থের অভাবে কষ্ট পায়, তখন তাদের সাহায্য করাই প্রকৃত দান হওয়া উচিত।
মাজারে টাকা ফেলার চেয়ে হাসপাতালে বেডে শুয়ে থাকা অসহায় রোগীর হাতে ওষুধ তুলে দেওয়া,
অথবা অপারেশনের খরচ দিতে না পারা পরিবারকে সহায়তা করা অনেক বেশি যৌক্তিক।
এভাবে যদি সামাজিক সচেতনতা তৈরি হয় এবং মাজারের অর্থগুলো পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হয়, তবে সমাজ থেকে অভাব ও বঞ্চনা অনেকটাই কমে আসবে।
আমাদের উচিত আবেগের চেয়ে বিবেককে বেশি প্রাধান্য দেওয়া এবং যেখানে মানুষের জীবন বাঁচানোর সুযোগ আছে, সেখানেই আমাদের দান পরিচালনা করা।
লেখক:
ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত