• সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:

মতামত

“সবুজ উদ্ভাবনে তরুণদের পথচলা”

লেখক: মিজানুর রহমান, ঢাকা।
আপডেট: রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের দৃষ্টি এখন আর শুধু নীতিনির্ধারক বা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দিকে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যমী তরুণদের মাঝে। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের ছয়জন শিক্ষার্থীর কচু থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন উদ্ভাবন সেই সম্ভাবনারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

বর্তমান বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণ একটি মারাত্মক পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রচলিত পলিথিন মাটিতে পচতে সময় নেয় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর, যা মাটি ও পানির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। নদী-নালা ভরাট, জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি এবং খাদ্যচক্রে ক্ষতিকর উপাদানের প্রবেশ—সবকিছুই এই প্লাস্টিক নির্ভরতার ফল।

এমন প্রেক্ষাপটে কচুর মতো একটি সহজলভ্য কৃষিপণ্য থেকে পচনশীল পলিথিন তৈরি নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী উদ্যোগ। কচুর স্টার্চ, পানি, ভিনেগার ও গ্লিসারিনের সংমিশ্রণে তৈরি এই পলিথিন ব্যবহারের পর পানিতে ফেলে দিলে মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে তা মাছের খাদ্যে পরিণত হয় এবং মাটিতে ফেলে দিলে ১৫ দিনের মধ্যে জৈবসারে রূপ নেয়। অর্থাৎ, এটি শুধু পরিবেশের ক্ষতি করে না, বরং পরিবেশকে উপকৃত করে।
এই উদ্ভাবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ পেলে দেশের তরুণ সমাজই হতে পারে পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি। গৌরীপুর টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছে, উদ্ভাবন বড় শহরের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা গ্রামীণ বাস্তবতার মাঝেও জন্ম নিতে পারে।

তবে এই উদ্যোগকে জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হলে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা জরুরি। উৎপাদন খরচ হ্রাস, পণ্যের টেকসই মান নিশ্চিতকরণ, বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন এবং বাজারে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায়, এমন সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন প্রদর্শনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবন ল্যাব স্থাপন, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ সহায়তা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যে কর প্রণোদনা প্রদান—এসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এ ধরনের উদ্ভাবন দ্রুত বাস্তব রূপ পেতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।

“অবনী বাংলাদেশ” বা পরিবেশবান্ধব উন্নত বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন এমন উদ্ভাবনী চিন্তা ও কার্যকর উদ্যোগ। কচু থেকে পলিথিন তৈরির এই প্রচেষ্টা আমাদের সেই পথেই এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে।

সবশেষে বলা যায়, এই তরুণদের উদ্যোগ কেবল একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়; এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ ও উদ্যোক্তা মহলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যাতে এই উদ্ভাবন জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশ হয়ে ওঠে একটি টেকসই, উদ্ভাবনশীল ও পরিবেশবান্ধব দেশ।
লেখক:
মিজানুর রহমান
(গবেষক ও কলামিস্ট)


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০