• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৪ অপরাহ্ন

মতামত

“ব্যক্তি বনাম প্রতীকঃ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদের কার্যকারিতা”

মোঃ ওবাইদুল্যাহ আল মামুন সাকিব রাজনীতি বিশ্লেষক এবং অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।।
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একসময় দুইটা বৃহৎ রাজনৈতিক দল ছিল। ০৫ই আগস্ট ২০২৪ সালে হাসিনার পলায়নের পর আওয়ামী লীগের পরাজয়ের মাধ্যমে এখন একটি বড় রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বিদ্যমান। বাকী রাজনৈতিক দলগুলোর সামগ্রিক অবস্থান জন সম্পৃক্ততায় পিছিয়ে থাকছে। ফলে, বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে নিজস্ব প্রতীক ও জোটবদ্ধ হয়ে।

গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭৩ এর অধীনে সকল নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। কমিশন কমিশন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রদানের পর প্রতীক বরাদ্দ দেয় নির্বাচনে ভোট প্রদানের জন্য। জনগণ প্রতীক দেখেই চিনতে পারেন, কে কোন দলের প্রার্থী কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনগণ প্রার্থীকে ভুলে গিয়ে প্রতীকের প্রতি নজর দেন। এখানেই মূল সমস্যা সৃষ্টি হয়। বিগত ৫৫ বছরে ১২টি সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ প্রতীক দেখেই ভোট দিয়েছে। কিন্তু জনগণের কোন পরিবর্তন হয়নি!

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতীক নাকি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সামগ্রিক পরিচিতি, ব্যক্তি ইমেজ, সৎ এবং ন্যায়পরায়ণ চরিত্র প্রাধান্য পাবে নাকি দলীয় প্রতীকের প্রাধান্য পাবে, সেটা নিয়ে জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গণতন্ত্রের জন্য প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তির অবস্থানই প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত।

জনগণ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোটদানের সুযোগ পেলে ব্যক্তিকেই বেছে নিতে পারে। নীরব বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ ভোটের রাজনীতি হয়তো ঠিকই বুঝিয়ে দিতে পারে। জনগণ যদি প্রকৃত ন্যায় বিচার, শাসন এবং উন্নয়ন পেতে চায়, তবে তাদেরকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হওয়া যাবে না।

বর্তমানে নির্বাচন মানে প্রার্থীদের রাজনৈতিক বিনিয়োগ। দলীয় নমিনেশন, ভোটের প্রচারণাসহ প্রায় সবগুলো কাজে কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন। এটা রাজনৈতিক বিনিয়োগ। ফলে, নির্বাচনে জয়লাভের পর নেতারা প্রথমেই তাদের বিনিয়োগ তুলতে চেষ্টা করবেন। তারপর দেশের জনগণ ও উন্নয়ন!

যদি নির্বাচনটা গণমুখী ও উন্নয়ন বান্ধব করতে হয়, তবে সবার আগে টাকার ছড়াছড়ি বন্ধ করতে হবে। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে সদাচরণ, ভালোবাসা ও সম্মান দিয়ে। টাকার ছড়াছড়ি দিয়ে ভোট কেনাবেচা করে জয়ী হওয়া যাবে এটা যেরকম সত্য ঠিক, পরবর্তী ০৫ বছর জনগনকে দুঃখ, দুর্দশা এবং বঞ্চনা নিয়ে থাকতে হবে।

একটা উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারবেন। গ্রামের রাস্তাগুলো সংষ্কার ও নির্মাণের জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হয় তার কিন্তু ৫০% ও কাজ করে না নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। যে পরিমাণ বরাদ্দ হয় রাস্তা নির্মাণের জন্য, সেটা যদি ঠিক মত কাজে লাগানো হতো, তাহলে একটা রাস্তার স্থায়িত্ব মিনিমাম ০৫ বছর হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য এদেশের জনগণের, ওই রাস্তা ০৩ মাসও ঠিক মতে টিকে না! এই যে মাঝখানে টাকাটা হাওয়ায় উড়ে গেলো, সেটার হিসাব কিন্তু সেই নির্বাচনের নেতার বিনিয়োগ!

টাকা খরচ হয় কোথায়? বড় বড় সমাবেশ করা, শোডাউন করা, মিছিল মিটিং করা, ভোট কেনাবেচা করা। এসবই একজন প্রার্থীর জয় পরাজয়ের মাপকাঠি হয়ে উঠে। জনগণের দোরগোড়ায় যাওয়ার জন্য একটা কৌশল অবলম্বন করতে হবে কিন্তু মাঠে ময়দানে নির্বাচনী সমাবেশ করতে যে পরিমাণ আর্থিক ও মানসিক চাপ থাকে তা রোধ করতে কেউ চিন্তিত নয়! ফলে, টাকার ছড়াছড়িই নির্ধারণ করে কে জয়ী হবে আর কে পরাজিত হবে!

০৫ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল। পারস্পরিক সুসম্পর্ক, শ্রদ্ধা এবং শিষ্টাচার বহির্ভূত সম্পর্ক এখন চলমান। অবিশ্বাসের রাজনীতি নিয়ে রাষ্ট্র বহুদূর যেতে পারে না। একটা সময় সেটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনে রূপ নেয়। প্রার্থীরা যদি নির্বিঘ্নে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গণসংযোগ করতে পারে, ভোটারদেরকে আশ্বস্ত করতে পারেন যে, তিনিই সেরা। তিনি যদি নির্বাচনে জয়ী হন, তাহলে উন্নয়ন জনগণের দোরগোড়ায় চলে আসবে, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে, জনগণ সরকারি বরাদ্দ সঠিকভাবে পাবে, তবেই জনগণ ভোট দিলে জনগণের উন্নতি হবে। অন্যথায়, নয়!

ভোটের মাঠে যে নেতা সবচেয়ে কম পরিমাণ টাকা খরচ করবে নির্বাচনে তিনিই কিন্তু জনগণের নেতা হবেন। কেননা, যার রাজনৈতিক ভোট কেনাবেচা ও বিনিয়োগের চিন্তা নেই, তার টাকা চুরি/আত্মসাৎ করারও টেনশন নেই, যার সুফল জনগণই ভোগ করতে পারবে। ব্যয়বহুল নির্বাচনই জনগণকে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে সুবিধা পেতে বাঁধা সৃষ্টি করে। কেননা, প্রার্থীরা আগে তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলবেন, পরে জনগণের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা করবেন, এটাই চলছে এদেশের রাজনীতিতে।

শুধু প্রতীক নয়, প্রতীকের সাথে নেতার চরিত্র ও আদর্শই হোক নির্বাচনে জয় পরাজয়ের মাপকাঠি। প্রতীকের আবেগ দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্য কৌশল অবলম্বন করতে চাইলে সেটা এড়িয়ে যেতে হবে জনগণকে। ব্যক্তি ইমেজই হোক আগামীর সংসদ নির্বাচনের মূল শক্তি। কালো টাকার ছড়াছড়ি, ভোট কেনাবেচা ও জনগণকে বোকা বানানোর কৌশলকে রুখে দিতে হবে, তবেই গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। অন্যথায়, জনগণের ভাগ্যাকাশে ঘোর অমানিশা নেমে আসতে পারে!

মোঃ ওবাইদুল্যাহ আল মামুন সাকিব
রাজনীতি বিশ্লেষক এবং
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০