রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বাংলাদেশের অন্যতম ব্যবসায়ী আকিজ উদ্দীন এর আকিজ গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। আকিজ উদ্দিন জীবিতকালে এই প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছিল মূলত অসহায়, দরিদ্র এবং প্রান্তিক পরিবারের নারী ও শিশুদের জন্য। পরবর্তীতে আকিজ উদ্দিনের মৃত্যুর পর তার সন্তান আফিল উদ্দিন, মহিউদ্দিন, বশির উদ্দিনসহ সব সন্তান হাসপাতালের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আকিজ উদ্দিনের মৃত্যুর পর এখানে বড় ধরনের পরিবর্তন হয় আর্থিক বিষয়ে। আকিজ সাহেবের জীবিতকালে মোটামুটি কম অর্থ ব্যয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা সেবার ফি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। অর্থ ব্যয় বেড়েছে।
একটা উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। আকিজ সাহেব থাকাবস্থায় ৫০০-৬০০ টাকা খরচ করে শিশুদের এনআইসিইউ ব্যবস্থা হতো, যেটা বর্তমানে ২৭০০-৩৫০০ টাকা প্রতিদিন। অপরদিকে রাজধানীর স্কয়ার, শমরিতা, বিআরবি, এভার কেয়ার, ল্যাব এইড, পপুলার হাসপাতালে সেই খরচ ৬০,০০০/- থেকে ১ লক্ষ টাকা। এই ক্ষেত্রে আদ দ্বীন হাসপাতাল আকাশচুম্বী খরচের ঢাকা শহরে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
আমি ২০২১ সালে একটানা ৬১ দিন এই আদ দ্বীন হাসপাতালের সেবা নিয়েছি। আমার বড় বোনের প্রিম্যাচিউর টুইন সন্তান হয়েছিল আদ দ্বীন হাসপাতালে। ১০৫০ গ্রাম ও ১২৫০ গ্রাম ওজনের দুইটা প্রিম্যাচিউর বাচ্চা নিয়ে এন আই সি ইউতে ৩১ দিন থাকতে হয়েছে। সবমিলিয়ে ৩ লাখ টাকার মধ্যে চিকিৎসা সেবা নিয়েছি যেটা রাজধানীর অন্য হাসপাতালে লাগতো মিনিমাম ১০-১২ লক্ষ টাকা।
একই ভাবে বারডেম হাসপাতালেও ৯ দিন ছিলাম। সেই ৯ দিনে ৩ লক্ষ টাকা হাসপাতালের বিল দিতে হয়েছে। রাজধানীর অন্য হাসপাতালের চেয়ে অপেক্ষাকৃত চড়া মূল্যে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। অধিকাংশ হাসপাতালই মূলত অর্থলগ্নিকারী ও ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
সম্প্রতি আদ দ্বীন হাসপাতালে এসির গ্যাস লিকের ঘটনায় ০৬ জন নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফলতির কারণে এই দূর্ঘটনা হতে পারে। তদন্তে প্রমাণিত হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।
অনেকেই হয়তো জানেন না যে, বাংলাদেশে হাসপাতাল গুলো সঠিকভাবে তদারকি করা হয় না। সরকারি দফতরের আমলারা কখনোই সঠিক নিয়ম মেনে কোন হাসপাতালের পরিবেশ, অবকাঠামো, চিকিৎসাসেবা নিয়ে রুটিনমাফিক রিপোর্ট করে না বা টাকার বিনিময়ে এসেসম্যান্ট রিপোর্ট সঠিক বলে চালিয়ে দেয়। ফলে, হাসপাতালের মালিকপক্ষ কম বিনিয়োগে বৃহৎ পরিসরে লভ্যাংশ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
আমার মতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, ডিজি স্বাস্থ্য সহ সকল দফতরই এই অবহেলার সাথে জড়িত। তাহলে কেন সকল দায়ীদের বিচারের পরিবর্তে পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করলো? কেন এত তাড়াহুড়ো? জনগণের স্বার্থে নাকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে থাকা আকিজ উদ্দিনের এক সন্তানের কারণে রাগ-ক্ষোভে এই বিধ্বংসী সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
রাজধানীর চাকচিক্যময় আকাশচুম্বী খরচের ভেতরেও আদ-দ্বীন হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম খরচে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে পুরো বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার এই হাসপাতালের উপর নির্ভরশীল। ফলে, সরকারের তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্তে সুফল বয়ে আনবে নাকি সাধারণ জনগণের চিকিৎসা সেবা ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে, সেটা অতি দ্রুতই জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে।
যদি একটি দুর্ঘটনার দায়ে পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের অধিকাংশ হাসপাতাল বন্ধ করে দিতে হবে। স্কয়ার, ইউনাইটেড বা ল্যাব এইডেও বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে। অতি সম্প্রতি ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজে এক ছোট ভাইয়ের ভুল চিকিৎসায় তার পুরো শরীর ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে অদ্যবধি ছোট ভাইটি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বেডে দিনরাত কাটাচ্ছে। অসহায় আর্তনাদ আর নিরব কান্না আমি দেখেছি। বহু তদ্বির করে হাসপাতাল থেকে এখন বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। তারপরও প্রায় ৩০ লাখ টাকা শেষ ছোট ভাইটির।
এখন চাইলেই হাসপাতাল বন্ধ করার যৌক্তিকতা আসে না। পৃথিবীর বহু দেশে বহু হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা হয়। সেই সব দেশে মেডিকেল নেগলিসেন্সের উপর ব্যাপক নজরদারি করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক, আমাদের বাংলাদেশে এসব নজরদারি তো দূরের কথা, অধিকাংশ হাসপাতাল চালায় সরকার দলীয় ও বিরোধী দলীয় নেতারা। ফলে, দুই পক্ষ লাভের আশায় সবকিছু ম্যানেজ করে চলতে থাকে। অপরদিকে সাধারণ জনগণের গলাকাটার মত অবস্থা বিরাজ করে।
একটি আদর্শ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে অপরাধীর বিচার হওয়া উচিত; কোন প্রতিষ্ঠানের নয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে পুরো প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে বা ধারাবাহিকভাবে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবেই জনগণ সুচিকিৎসা পাবে।
এই যে আদ দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করলো, এখানে কী সুস্পষ্টাভাবে তদন্ত করা হয়েছে? খোঁজ নিয়ে যতটুকু জেনেছি, তাতে মনে হচ্ছে সঠিক তদন্ত হয়নি! তাই প্রতিটি নাগরিকের জানার অধিকার আছে কোন যুক্তিতে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে? তদন্তে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে? শুধু কি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাকি আরো সরকারি ব্যক্তিবর্গ জড়িত আছে? সব দায়ীদের বিচারের পরিবর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা করা হলো? এই সিদ্ধান্ত কি শুধুই প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে নেওয়া হয়েছে? নাকি পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বীজ কাজ করেছে?
লেখক: মোঃ ওবাইদুল্যাহ আল মামুন সাকিব,
রাজনীতি বিশ্লেষক এবং
অ্যাডভোকেট,
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।