• শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০২:১৭ অপরাহ্ন

মতামত

গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার এখন সময়ের দাবি

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো নিরাপদ, আধুনিক ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পায়ন, পর্যটন এবং নাগরিক জীবনের মান—সবকিছুই দক্ষ যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই একটি কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও বাংলাদেশের গণপরিবহন খাত নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাহীনতায় জর্জরিত।

প্রতিদিন লাখো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন। ফিটনেসবিহীন, জরাজীর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের চলাচল এখনো দেশের সড়কে একটি বড় বাস্তবতা। এসব যানবাহনের অনেকগুলোরই সড়কে চলাচলের উপযুক্ততা বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। তারপরও দুর্বল তদারকি, অনিয়ম ও আইন প্রয়োগের ঘাটতির কারণে এগুলো চলাচল অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

শুধু যানবাহনের অবস্থা নয়, গণপরিবহন পরিচালনার ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলার অভাব স্পষ্ট। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিদিন দেখা যায়, বাসগুলো নির্ধারিত স্টপেজ উপেক্ষা করে যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করায়। এর ফলে যানজট বাড়ে, সড়কের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। উন্নত বিশ্বের শহরগুলোতে যেখানে নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, সেখানে আমাদের দেশে এ ধরনের অনিয়ম অনেকটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

অতিরিক্ত যাত্রী বহনও একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বাসের ভেতরে আর কোনো জায়গা না থাকলেও অধিক মুনাফার আশায় আরও যাত্রী তোলা হয়। এতে যাত্রীরা অস্বস্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করতে বাধ্য হন। নারী, শিশু, প্রবীণ এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরা এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হন। গণপরিবহনে যাত্রীদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

দূরপাল্লার পরিবহন ব্যবস্থার অবস্থাও খুব একটা সন্তোষজনক নয়। অনেক শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসে এসি ঠিকমতো কাজ করে না, আসন ভাঙা থাকে, পরিচ্ছন্নতার অভাব থাকে এবং নির্ধারিত মানের সেবা নিশ্চিত করা হয় না। অথচ যাত্রীদের কাছ থেকে পূর্ণ ভাড়া আদায় করা হয়। সেবার মান ও ভাড়ার মধ্যে এই অসামঞ্জস্য যাত্রী অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

অন্যদিকে দেশের বহু সড়ক ও মহাসড়ক এখনো ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ছোট-বড় গর্ত, অসমান সড়ক এবং অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে যানবাহনের ক্ষতি যেমন বাড়ছে, তেমনি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিরাপদ ও মানসম্মত সড়ক অবকাঠামো ছাড়া কোনো উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

তবে আশার বিষয় হলো, গণপরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়নে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উত্তরা দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর মাধ্যমে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে মেট্রোরেলের পথ মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ এগিয়ে চলছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এই সম্প্রসারণ সম্পন্ন হলে রাজধানীর আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ দ্রুত, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন এবং সড়কের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

একই সঙ্গে রাজধানীতে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস চালুর সরকারি উদ্যোগও সময়োপযোগী। বৈদ্যুতিক বাস চালু হলে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি যাত্রীরা আরও আধুনিক, আরামদায়ক ও নিরাপদ পরিবহনসেবা পাবেন। পরিবেশ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টেকসই নগর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া বাস রুট রেশনালাইজেশন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, বিআরটি (Bus Rapid Transit) প্রকল্পের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, নারীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় বাসসেবা সম্প্রসারণ এবং গণপরিবহন খাতে নারী চালক ও নারী কর্মীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

সরকারের এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের যোগাযোগব্যবস্থাকে আধুনিক করার আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন। তবে শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তার সময়মতো ও মানসম্মত বাস্তবায়নের ওপর।

একই সঙ্গে গণপরিবহন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো প্রয়োজন। ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা, স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, জিপিএস-ভিত্তিক বাস পর্যবেক্ষণ, রিয়েল-টাইম যাত্রী তথ্যসেবা এবং অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। পাশাপাশি পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং যাত্রী—সব পক্ষের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতায় গণপরিবহন খাতে ব্যাপক সংস্কার এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন ধাপে ধাপে সড়ক থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। নির্ধারিত বাসস্টপ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের যৌক্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পরিবহন খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, গণপরিবহন খাতকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত, কার্যকর ও দৃশ্যমান সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হোক। কারণ নিরাপদ যাতায়াত কোনো বিলাসিতা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা যত উন্নত হবে, সেই দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক উন্নয়নও তত দ্রুত এগিয়ে যাবে।
একটি আধুনিক, নিরাপদ, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক গণপরিবহন ব্যবস্থা কেবল দুর্ঘটনা কমাবে না; এটি দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে, নগরজীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং নাগরিকদের জীবনমান উন্নত করবে। একটি উন্নত, স্মার্ট ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে গণপরিবহন খাতের সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। এখনই সময়—কথায় নয়, কার্যকর পদক্ষেপে পরিবর্তনের সূচনা করার।

লেখক: মো. হারুনুর রশীদ,
ফার্মাসিস্ট ও পিএইচডি গবেষক, জাপান।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার