• শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন

রূহের জগতে আল্লাহ ও মানুষের প্রথম সংলাপ: চিরন্তন অঙ্গীকার

দ্য ইকোনোমিপোস্ট রিপোর্ট
আপডেট: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

মানুষ পৃথিবীতে আসে একদিন, আবার একদিন চলে যায়। জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়টুকুই আমাদের দৃশ্যমান জীবন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের অস্তিত্বের সূচনা পৃথিবীতে নয়; এরও আগে ছিল এক রহস্যময় জগৎ—আলামে আরওয়াহ বা রূহের জগৎ। সেই জগতে মহান আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির কাছ থেকে এমন একটি অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, যা মানুষের ঈমান, নৈতিকতা এবং পরকালীন জবাবদিহির ভিত্তি হয়ে আছে। কুরআন এই ঘটনাকে এমনভাবে তুলে ধরেছে যে, তা শুধু একটি ঐতিহাসিক বিবরণ নয়; বরং মানবজীবনের উদ্দেশ্য বোঝার অন্যতম চাবিকাঠি।
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-আরাফে বলেন—
“আর স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তানের পিঠ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী করেছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলেছিল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’—যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো, ‘আমরা তো এ বিষয়ে অবহিত ছিলাম না।’”
(সূরা আল-আরাফ, ৭:১৭২)
এই আয়াতকে ইসলামী পরিভাষায় ‘মীসাক’ বা ‘আহদে আলাস্ত’ বলা হয়। আরবি “أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ”—অর্থাৎ, “আমি কি তোমাদের রব নই?”—এই প্রশ্ন থেকেই এর নামকরণ। মানবজাতির উত্তর ছিল একটাই—”বালা, শাহিদনা”—”হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সাক্ষ্য দিলাম।”

এই সংক্ষিপ্ত সংলাপের মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য, আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং কিয়ামতের দিনের জবাবদিহির ভিত্তি।
রাসুলুল্লাহ ﷺ এই ঘটনার আরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সুনান আত-তিরমিযী ও মুসনাদ আহমাদের বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-এর পিঠ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগত সব মানুষের রূহ বের করে তাদের সামনে উপস্থিত করেন। এরপর তাদের কাছ থেকে তাঁর রব হওয়ার স্বীকৃতি গ্রহণ করেন। এ কারণেই ইসলামী আকীদায় বলা হয়, আল্লাহকে অস্বীকার করা মানুষের প্রকৃত স্বভাব নয়; বরং তাঁর রব হওয়ার স্বীকৃতি মানুষের অন্তর্নিহিত সত্য।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—যদি আমরা সবাই সেই অঙ্গীকার করে থাকি, তবে আজ তা আমাদের মনে নেই কেন?
এর উত্তরও ইসলাম দিয়েছে। আল্লাহ মানুষকে সেই ঘটনার সচেতন স্মৃতি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠাননি; কিন্তু দিয়েছেন ফিতরাহ—অর্থাৎ আল্লাহকে চিনতে ও তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার সহজাত প্রবণতা।

এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। পরে তার বাবা-মা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে দেয়।”
(সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
অর্থাৎ, মানুষের অন্তরে আল্লাহকে রব হিসেবে স্বীকার করার একটি সহজাত বোধ বিদ্যমান থাকে। পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব সেই স্বাভাবিক প্রবণতাকে আচ্ছন্ন করতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারে না।
কুরআন আরও জানিয়ে দেয়, এই সাক্ষ্য নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল যাতে কিয়ামতের দিন কেউ বলতে না পারে—”আমরা জানতাম না”, কিংবা “আমাদের পূর্বপুরুষরা শিরক করেছিল, আমরাও তাদের অনুসরণ করেছি।” (সূরা আল-আরাফ, ৭:১৭২–১৭৩)। অর্থাৎ মানুষের ওপর আল্লাহর হক প্রতিষ্ঠার জন্য এই অঙ্গীকার ছিল এক চূড়ান্ত প্রমাণ।
প্রখ্যাত মুফাসসির ইবন কাসীর, ইমাম তাবারী ও ইমাম কুরতুবী এ আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর এই সাক্ষ্য গ্রহণ মানুষের বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রতিষ্ঠার জন্যই ছিল। কেউ যেন অজ্ঞতা বা পরিবেশের দোহাই দিয়ে দায় এড়াতে না পারে।

দুঃখজনকভাবে আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব বা কিছু ওয়াজে রূহের জগৎ নিয়ে নানা অলৌকিক গল্প প্রচার করা হয়। কোথাও বলা হয়, রূহ প্রথমে আল্লাহকে অস্বীকার করেছিল; কোথাও বলা হয়, হাজার বছর শাস্তি দেওয়ার পর রূহ স্বীকার করেছিল; আবার কোথাও দীর্ঘ সংলাপ উদ্ধৃত করা হয়। অথচ এসবের অধিকাংশেরই কুরআন বা সহীহ হাদিসে কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। ইসলামী জ্ঞানচর্চার মূলনীতি হলো—যেখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ নীরব থেকেছেন, সেখানে অতিরঞ্জন বা কল্পনা নয়; বরং সংযমই উত্তম।

আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি, ভোগবাদ ও আত্মকেন্দ্রিকতার ভিড়ে মানুষ যখন নিজের পরিচয় ও উদ্দেশ্য ভুলে যাচ্ছে, তখন ‘আহদে আলাস্ত’-এর শিক্ষা নতুন করে স্মরণ করার প্রয়োজন রয়েছে। মানুষ কেবল অর্থনৈতিক সত্তা নয়, কেবল রাজনৈতিক প্রাণীও নয়; সে সর্বাগ্রে একজন বান্দা। তার পরিচয়ের সূচনা হয়েছে এই স্বীকৃতি দিয়ে—”হ্যাঁ, আপনি-ই আমাদের রব।”
এই স্বীকৃতিই মানুষের নৈতিকতার ভিত্তি। কারণ যে ব্যক্তি জানে, সে একদিন তার রবের সামনে দাঁড়াবে, সে অন্যায়, প্রতারণা, দুর্নীতি ও জুলুম থেকে নিজেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট হবে। আর যে ব্যক্তি এই অঙ্গীকার ভুলে যায়, তার কাছে পৃথিবীই হয়ে ওঠে সবকিছুর শেষ গন্তব্য।

রূহের জগতের সেই সংক্ষিপ্ত সংলাপ তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়; বরং প্রতিটি মানুষের অন্তরের গভীরে অনুরণিত এক চিরন্তন আহ্বান। কুরআনের ভাষায় সেই আহ্বান ছিল—”আমি কি তোমাদের রব নই?” আর মানুষের উত্তর ছিল—”হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।”
সময়ের প্রবাহে মানুষ সেই দৃশ্য ভুলে গেছে, কিন্তু আল্লাহ ভুলে যাননি। কিয়ামতের দিন সেই সাক্ষ্যই হবে মানুষের ঈমান, দায়িত্ব ও জবাবদিহির অন্যতম ভিত্তি। তাই জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি ইবাদতে এবং প্রতিটি নৈতিক আচরণে আমাদের মনে রাখা উচিত—আমরা সেই অঙ্গীকারবদ্ধ মানবজাতিরই অংশ, যারা একদিন নিজেদের রবকে চিনে তাঁর সামনে সাক্ষ্য দিয়েছিল।

লেখক: হাফেজ মাওলানা কামাল হোসাইন।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১