• বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০১:২০ অপরাহ্ন

মতামত

জ্বালানি সংকটের সমাধান কী?

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
আপডেট: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আমার প্রাণ প্রিয় পাঠক বৃন্দ এবং দেশের নীতি নির্ধারক বৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আজকের জ্বালানি সমস্যার সমাধানকল্পে দুটি কথা উপস্থাপন করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। আপনারা সাথেই থাকুন।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি কেবল একটি একক কারণ বা কৃত্রিম সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা, বিশ্ব রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার একটি সম্মিলিত জটিল ফলাফল।

​১. এটি কি কৃত্রিম সংকট, বৈশ্বিক পরিস্থিতি নাকি সরকারি অযোগ্যতা?
​একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ থেকে মূল কারণগুলো তিনটি ভাগে দেখা যেতে পারে:

​নীতিগত ও পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা (অতীত ও অবকাঠামোগত দায়):

​আমদানিনির্ভরতা:

বিগত কয়েক দশকে নিজস্ব স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত জোর না দিয়ে আমদানিকৃত এলএনজি (LNG) এবং কয়লার ওপর অতি-নির্ভরশীল কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

​অতিরিক্ত সক্ষমতা ও ক্যাপাসিটি চার্জ:

চাহিদার তোয়াক্কা না করে দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। জ্বালানির অভাবে এসব কেন্দ্র অলস বসে থাকলেও চুক্তির কারণে কোটি কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দিতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ খাতকে দেউলিয়া ও বিশাল ঋণগ্রস্ত করে ফেলেছে।

​অনবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থবিরতা:

সৌর বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নজর না দিয়ে দামী জ্বালানি তেলে পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে।

​বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া (বাহ্যিক কারণ):

​আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা:

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

​ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট:

আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক সময়মতো এলএনজি ও জ্বালানি আমদানির ঋণপত্র (LC) নিষ্পত্তিতে ডলার জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে।

​সংকট ব্যবস্থাপনা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা (বর্তমান পরিচালনগত ঘাটতি):

​বকেয়া বিলের পাহাড়: বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকারী বিদেশি ও দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকা বিল বকেয়া পড়ে থাকায় নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

​রক্ষণাবেক্ষণ ও সিদ্ধান্তের ধীরগতি:

আমদানি বা সরবরাহ শৃঙ্খলে ঘাটতি দেখা দিলে বিকল্প বা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। এছাড়া কারিগরি ত্রুটি বা টার্মিনাল বিকল হওয়ার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ছিল।

​২. এই সংকট থেকে বের হওয়ার বা বাঁচার উপায়:

​সংকট কাটাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:

​জরুরি ও স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ:

​বকেয়া পরিশোধ ও এলএনজি সরবরাহ ঠিক রাখা: বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দ্রুত সামলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি খাতের আন্তর্জাতিক বকেয়া বিল মেটানো।

​অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো:

বিতরণ ব্যবস্থায় চুরি, অবৈধ সংযোগ ও সিস্টেম লস কঠোরভাবে বন্ধ করা এবং অফিসে-আদালতে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া।

​ভোলা ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎসের গ্যাস সংযোগ:

দেশের যেসব কূপ থেকে (যেমন ভোলা) গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু পাইপলাইনের অভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না, সেগুলোর দ্রুত বিকল্প সরবরাহ (CNG/LNG ট্যাংকার) নিশ্চিত করা।

​মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান:

​ব্যাপক স্থল ও অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান:

আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বঙ্গোপসাগর ও স্থলভাগের নতুন গ্যাসকূপ খননে চুক্তি ও কাজের গতি কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা।

​ছাদভিত্তিক ও বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎ (Solar Energy):

কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও আবাসিকের খালি ছাদগুলোকে দ্রুত সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা, যাতে দিনের বেলার পিক চাহিদার বড় অংশ সৌরশক্তি থেকেই মেটানো যায়।

​বিদ্যুৎ চুক্তি পুনঃমূল্যায়ন:

যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে বা ব্যয়বহুল, সেসব চুক্তি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পুনঃমূল্যায়ন বা বাতিল করা।

​আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা:

ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে গ্রিডকে আরও সাশ্রয়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ করা।

উপসংহার:
সুস্ঠ পরিকল্পনা গ্রহণ করা। পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম। ধন্যবাদ সবাইকে এতক্ষন সাথে থাকার জন্য।

লেখক: ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মনিরুল ইসলাম।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার