গাজীপুরে কাশিমপুর কারাগারের ফটকের সামনে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে স্বজনেরা অপেক্ষা করছিলেন। কারও চোখ ছিল কারাগারের প্রবেশপথে, কারও হাতে মোবাইল ফোন, কখন আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত খবর। অবশেষে দুপুরে অপেক্ষার অবসান হয়। ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া আটজন মুক্তি পেয়েছেন গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি ও মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে।
সাড়ে সাত বছর কারাভোগের পর দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট থেকে একে একে তারা কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন। এ সময় দীর্ঘ দিন পর স্বজনদের কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মুক্তিপ্রাপ্তরা। কারাগারের মূল ফটকের বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
মুক্তি পাওয়া আটজন হলেন- মো. শামীম, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, আফসার উদ্দিন, ইমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার উদ্দিন রানা, আব্দুর রহিম শরীফ ও কামরুন্নাহার মনি।
তাদের মধ্যে কামরুন্নাহার মনি কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন তার সাত বছর বয়সী মেয়ে মোবাশ্বেরা খানম রাথী। রাথীর জন্ম হয় কারাগারে।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ছাদে হাত-পা বেঁধে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
৮ এপ্রিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সোনাগাজী মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনী জেলা ও দায়রা জজ মামুনুর রশিদের আদালত ১৬ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে গত ২৪ আগস্ট অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড ও চারজন আসামি নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ও উম্মে সুলতানা পপির যাবজ্জীবন এবং ১০ জন আসামিকে খালাস দেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে এ মামলার আসামি সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম সাড়ে সাত বছর পর ফেনী জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান।
মাকসুদ আলম সোনাগাজী উপজেলার চর গণেশ এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত আহসান উল্যাহর ছেলে।
এ মামলায় খালাস পাওয়া আরেক আসামি রুহুল আমিন সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) চট্রগ্রাম জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান।
রুহুল আমিন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি এবং সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন গভর্নিং বডির সহসভাপতি। তিনি চরচান্দিয়া গ্রামের ভূঁইয়া বাজার এলাকার কোরবান আলী বাড়ির মৃত কোরবান আলীর ছেলে।
আট আসামির মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. জাকির হোসেন জানান, আদালতের আদেশের পর প্রয়োজনীয় জামিনের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে আটজনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
ছেলের মুক্তির খবর পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইফতেখার উদ্দিন রানার মা হাজেরা বেগম। তিনি বলেন, তার ছেলেকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। ছেলেকে ফিরে পাওয়ায় আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকেও ধন্যবাদ জানান হাজেরা বেগম।
কারাগার থেকে বের হওয়ার পর মুক্তিপ্রাপ্তরা স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে কিছু সময় কাটান। পরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তারা ফেনীর উদ্দেশে রওনা হন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।