সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—অভিযোগের বিচার, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের যথাযথ প্রক্রিয়া কি নিশ্চিত করা হয়েছিল? যদি অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রচারিত তথ্য সত্য হয়, তবে বিষয়টি অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
কিন্তু আমার প্রশ্ন আরও গভীর। সৌদি আরবে বছরের পর বছর নির্যাতনের শিকার হওয়া অসহায় বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের জন্য সেই বিচারব্যবস্থার ভূমিকা কোথায়?
একদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড, অন্যদিকে নির্যাতিত নারীদের কান্না—তাহলে ন্যায়বিচারের পাল্লা কার দিকে ঝুঁকে আছে?
২০১৮–১৯ সালে সৌদি আরব থেকে হাজার হাজার বাংলাদেশি নারী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁদের অনেকে শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, বেতন না পাওয়া এবং অমানবিক কর্মপরিবেশের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। ২০১৯ সালে বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল নির্যাতিত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের এমন কিছু হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা সভ্য সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আমেনা বেগমের অভিজ্ঞতার কথাই ধরা যাক। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, নিয়োগকর্তার যৌন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল, খাবার দেওয়া হয়নি, এমনকি তাঁর হাতও ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন কাজ করেও তিনি যথাযথ বেতন পাননি বলে অভিযোগ করেছিলেন।
খুলনার সালমা বেগমের বোনের মৃত্যুর ঘটনাও ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। পরিবারের অভিযোগ ছিল, নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে যাওয়ার পরও তাঁর বোনকে আবার সেই নিয়োগকর্তার কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবার মরদেহে আঘাতের চিহ্ন দেখার কথাও জানিয়েছিল।
প্রশ্ন হচ্ছে, এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হয়েছিল কি? দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল কি? নির্যাতিত নারীরা কি নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ পেয়েছিলেন?
আমরা শুধু অভিযোগ শুনে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করতে চাই না। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি। কারণ ন্যায়বিচার মানে কেবল শাস্তি দেওয়া নয়; ন্যায়বিচার মানে নির্যাতিত মানুষের অধিকার রক্ষা করাও।
এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশি নারীদের নয়।
২০২৫ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সৌদি আরবে কেনিয়া ও উগান্ডাসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভিবাসী গৃহকর্মীদের মৃত্যু, নির্যাতন এবং মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে অসংগতির অভিযোগ উঠে আসে। সেখানে এমন পরিবারের বেদনাও তুলে ধরা হয়, যারা প্রিয়জনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পারেনি, কিংবা মরদেহ ও বকেয়া মজুরির মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার মতো অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে।
এমন ঘটনাগুলো আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—বিদেশের মাটিতে একজন দরিদ্র শ্রমিকের জীবনের মূল্য কি কম? তাঁর শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন থাকলে, তাঁর মৃত্যু রহস্যজনক হলে, তাঁর প্রাপ্য মজুরি আটকে রাখা হলে, তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কোথায়?
সৌদি আরবে দিয়াত বা রক্তপণের মতো আইনি বিধান নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু এসব বিধানের অস্তিত্বের কথা বললেই তো প্রমাণ হয় না যে প্রত্যেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেয়েছেন। আইন বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, অভিযোগের তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হচ্ছে এবং ক্ষমতাবান ও দুর্বল মানুষের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড বজায় থাকছে কি না—সেটিই আসল প্রশ্ন।
যাঁরা সৌদি আরবের শরিয়াহ আইনকে ন্যায়বিচারের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেন, তাঁদের কাছেও আমার প্রশ্ন আছে।
যদি কোনো নারী ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হন, তবে তাঁর অভিযোগের ন্যায়সংগত তদন্ত কি নিশ্চিত করা হচ্ছে?
যদি কোনো অভিবাসী শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে, তবে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে কি যথাযথ তদন্ত হচ্ছে?
যদি কোনো নিয়োগকর্তা নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, বেতন আটকে রাখা কিংবা অন্য কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হন, তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধেও কি আইন সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
আর যদি ন্যায়বিচার সবার অধিকার হয়, তবে দরিদ্র, অসহায় ও বিদেশি শ্রমিকদের সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
আমি কোনো ধর্মকে আক্রমণ করতে চাই না। ইসলাম ন্যায়বিচারের কথা বলে, মানুষের মর্যাদার কথা বলে, জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। তাই কোনো রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার সমালোচনা মানেই ইসলামের সমালোচনা নয়। বরং ন্যায়বিচারের নামে যদি বৈষম্য, অবহেলা কিংবা বিচারহীনতা ঘটে, তবে সেই ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা ন্যায়বিচারেরই দাবি।
আমার আপত্তি শরিয়াহর নামে নয়; আমার প্রশ্ন ন্যায়বিচারের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে।
আইন যদি শুধু দুর্বলকে শাস্তি দেওয়ার সময় কঠোর হয়, কিন্তু ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে নীরব থাকে, তবে সেই নীরবতা অবশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচারের সব অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তার উত্তর প্রয়োজন। একইভাবে, সৌদি আরবে নির্যাতিত নারী শ্রমিকদের অভিযোগগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি প্রয়োজন।
আমরা প্রতিশোধ চাই না। আমরা চাই সত্য উদ্ঘাটিত হোক। আমরা অন্ধ সমর্থনও চাই না, অন্ধ বিদ্বেষও চাই না। আমরা চাই অপরাধীর পরিচয়, ধর্ম, নাগরিকত্ব কিংবা অর্থনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, অপরাধের বিচার হোক এবং নিরপরাধ মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকুক।
শেষ প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়—ন্যায়বিচার কি সবার জন্য সমান, নাকি গরিবের বেলায় আইন এক রকম আর ক্ষমতাবানের বেলায় অন্য রকম?
যে বিচারব্যবস্থা দুর্বলের কান্না শুনতে পায় না, যে আইন নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তার ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলা অন্যায় নয়—বরং সেটিই মানবতার দাবি।
ন্যায়বিচার কোনো দেশের একার সম্পদ নয়। কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের একক অধিকারও নয়। ন্যায়বিচার প্রতিটি মানুষের অধিকার।
লেখক: জান্নাতুন নূর লিজা
মিসেসাগা, কানাডা প্রবাসী।