• শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন

মতামত

বরফের দেশে ইসলামের পদচিহ্ন

লেখক: আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ, ইউরোপ।
আপডেট: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

উত্তর ইউরোপের দেশ সূমি, বর্তমান ফিনল্যান্ডের কথা বললেই মনে পড়ে বরফ, তীব্র ঠান্ডা, হাড়কাঁপানো শীত আর নীরব প্রকৃতির কথা। কিন্তু এই বরফের দেশেও এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রয়েছে ইসলামের পদচিহ্ন। উনিশ শতকের শেষভাগে রাশিয়ার ভলগা অঞ্চল থেকে আসা তাতার মুসলিম ব্যবসায়ীদের হাত ধরে শুরু হয় এই ইতিহাস। মসজিদ, কবরস্থান, দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুসলিম ঐতিহ্য ধীরে ধীরে ফিনল্যান্ডের ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
এই অঞ্চলে বসবাসরত অনেক মুসলিমই হয়তো নিজেদের জনপদের এই ইতিহাস সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। আমার লেখা মুসলমানদের সোনালী অতীত বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডের শেষ অংশ থেকে ইতিহাসের এই অধ্যায়টি আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

শীতের কোনো এক সকালে হেলসিঙ্কির রাস্তায় বরফ জমে আছে। আকাশ ধূসর। বাতাসে তীব্র ঠান্ডা। সূর্য যেন অনেক দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের চলাফেরাও যেন প্রকৃতির এই কঠিন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।
এই দৃশ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে কেউ যদি হঠাৎ প্রশ্ন করে, এই বরফের দেশেও কি সিজদা করার মতো কোনো মসজিদ আছে? উত্তর আসবে, হ্যাঁ, আছে।
ফের প্রশ্ন করা হলো, এখানে প্রথম মসজিদ কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর শুনলে হয়তো অনেকেই বিস্মিত হবেন। এখানে শুধু মসজিদই নেই, রয়েছে মুসলিম কবরস্থান, শতবর্ষী ইসলামি সংগঠন, মুসলিম শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ঐতিহ্য। এমনকি ফিনল্যান্ডের জন্য যুদ্ধে প্রাণ দেওয়া মুসলিমদের কবর ও স্মৃতিচিহ্নও রয়েছে।
হ্যাঁ, ফিনল্যান্ডের মুসলিম ইতিহাস একবিংশ শতাব্দীর কোনো নতুন ঘটনা নয়।
ইউরোপের বহু দেশে আধুনিক মুসলিম অভিবাসনের ঢেউ ওঠার অনেক আগে থেকেই ফিনল্যান্ডের মাটিতে মুসলমানদের পদচিহ্ন তৈরি হয়েছিল। এই অঞ্চলে প্রথম দিকে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা আরব ছিলেন না, তুর্কিও ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন তাতার মুসলিম।
রাশিয়ার ভলগা অঞ্চলের ছোট ছোট গ্রাম থেকে আসা এসব মানুষ ছিলেন মূলত ব্যবসায়ী। তাঁরা প্রথমে পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে ফিনল্যান্ডে এসেছিলেন। কিন্তু কেউ ভাবেননি, তাঁদের এই সাময়িক যাত্রা একদিন একটি স্থায়ী মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্ম দেবে।
কেউ ভাবেননি, তাঁদের সন্তানরা একদিন ফিনল্যান্ডের নাগরিক হয়ে উঠবেন। আর হেলসিঙ্কির বুকে গড়ে ওঠা একটি মসজিদ তাঁদের শতবর্ষী ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। হ্যাঁ, বলছি ফিনল্যান্ডের সেই মুসলিম ইতিহাসের কথা, যা অনেকের কাছেই এখনো অজানা।
এই ইতিহাস বুঝতে হলে প্রথমে বর্তমান ফিনল্যান্ডের সীমান্ত পেরিয়ে যেতে হবে। ফিরে যেতে হবে রাশিয়ার ভলগা অঞ্চলে। সেখানেই ছিল মিসার তাতার জনগোষ্ঠীর বসতি। এই জনগোষ্ঠীর একাংশ ব্যবসার উদ্দেশ্যে একসময় ফিনল্যান্ডে এসে পৌঁছায়। তখন ফিনল্যান্ড স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। ১৮০৯ সাল থেকে এটি রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল। ফলে রাশিয়া ও ফিনল্যান্ডের মধ্যে যাতায়াতের সুযোগ ছিল।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তাতার ব্যবসায়ীরা ফিনল্যান্ডের বিভিন্ন শহরের বাজারে আসতে শুরু করেন। তাঁরা কাপড়, পশম, কার্পেট, পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি করতেন। ধীরে ধীরে তাঁদের ব্যবসা ও পরিচিতির পরিধি বাড়তে থাকে। একসময় তাঁদের মধ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রবণতাও তৈরি হয়। নানাবিধ কারণে ১৮৮০-এর দশকে তাতার ব্যবসায়ীরা ফিনল্যান্ডের সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে শুরু করেন। তাঁদের অপরিচিত পোশাক, ভিন্ন ভাষা, ধর্মীয় পরিচয় এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা ও গুজব ছড়িয়ে পড়ে।আজ আমরা ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ নিয়ে কথা বলি। কিন্তু ইতিহাসের সেই সময়েও ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি সন্দেহ, অবিশ্বাস ও নেতিবাচক মনোভাবের অস্তিত্ব ছিল। তবে তাতার মুসলিমরা থেমে যাননি। তাঁরা ব্যবসা চালিয়ে গেছেন, নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রেখেছেন এবং ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত মুসলিম সমাজ গড়ে তুলেছেন। তাঁদের এই দীর্ঘ পথচলাই পরবর্তী সময়ে ফিনল্যান্ডে মুসলিম প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের ভিত্তি তৈরি করে।

ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯১৫ সালে, যখন ইউরোপের মানচিত্র রক্তাক্ত সংঘাতে বিপর্যস্ত, তখন হেলসিঙ্কির তাতার মুসলিমরা একটি মুসলিম দাতব্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কাজও করা হতো।সংগঠনটির কার্যক্রমের মাধ্যমে শুধু মুসলমান নয়, অমুসলিমরাও উপকৃত হতেন।

এর মাত্র দুই বছরের মাথায়, ১৯১৭ সালে, রুশ সাম্রাজ্যে বিপ্লব ঘটে এবং একই বছর ফিনল্যান্ড স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তাতার মুসলিমদের জন্য এটি ছিল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। যে সাম্রাজ্য থেকে তাঁরা এসেছিলেন, সেই রুশ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছিল। আর যে ভূখণ্ডে তাঁরা বসবাস করছিলেন, সেটি এখন স্বাধীন ফিনল্যান্ড।
তাঁদেরও নতুন করে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে হলো। রাশিয়া থেকে আসা তাতার মুসলিমরা ধীরে ধীরে ফিনল্যান্ডের সমাজের অংশ হয়ে উঠলেন। তাঁদের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব, নতুন সামাজিক বাস্তবতা এবং নতুন ভবিষ্যৎ।
১৯২২ সালে ফিনল্যান্ডে ধর্মীয় স্বাধীনতাসংক্রান্ত আইন প্রণীত হওয়ার পর মুসলিমদের জন্য আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২৫ সালের ২৪ এপ্রিল ফিনল্যান্ডের মুসলিম তাতাররা তাঁদের ধর্মীয় সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করেন। সংগঠনটি পরবর্তী সময়ে Finnish Islamic Congregation নামে পরিচিতি লাভ করে।এর মাধ্যমে ফিনল্যান্ডের মুসলিম সম্প্রদায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্জন করে।এটি শুধু তাতার মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল না। ইউরোপের মুসলিম ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। ফিনল্যান্ড ছিল পশ্চিমা বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি, যেখানে একটি মুসলিম ধর্মীয় সম্প্রদায় আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করে।

হেলসিঙ্কিতে মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান:

১৯৬১ সালে হেলসিঙ্কির Fredrikinkatu সড়কে তাতার মুসলিমদের ইসলামি ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। ভবনটি শুধু ইবাদতের স্থান ছিল না, বরং মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।আজকের দিনে ভবনটিকে হয়তো বিশাল কোনো মসজিদ বলে মনে হবে না। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এর গুরুত্ব অপরিসীম।কারণ সেখানে শুধু ইট-পাথরের একটি ভবন দাঁড়ায়নি। দাঁড়িয়েছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও আত্মপরিচয় রক্ষার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর দৃশ্যমান স্মারক।ফিনল্যান্ডের মুসলিম তাতাররা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণেও সচেষ্ট ছিলেন। এই প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শিক্ষাব্যবস্থা।১৯৪৮ সালে হেলসিঙ্কিতে তাঁরা একটি দ্বিভাষিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তাতার ও ফিনিশ ভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা ছিল। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত চালু ছিল।
এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে, একটি সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী শুধু ধর্মীয় পরিচয় রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার বিষয়েও সচেতন ছিল।

যুদ্ধ, আত্মত্যাগ ও স্মৃতির ইতিহাস:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফিনল্যান্ডের জন্যও ছিল এক ভয়াবহ সময়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুদ্ধ, সীমান্তে সংঘর্ষ এবং দেশের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ, সব মিলিয়ে ফিনল্যান্ডের মানুষকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।
এই সময়ে ফিনল্যান্ডের তাতার মুসলিমদের একটি অংশও দেশের সামরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের কেউ কেউ দেশের জন্য যুদ্ধে অংশ নেন এবং প্রাণ হারান।
তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষিত রয়েছে হেলসিঙ্কির Hietaniemi Cemetery-তে। সেখানে তাতার মুসলিমদের জন্য পৃথক কবরস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধে নিহত তাতারদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ।
১৯৫০ সালে স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করা হয়।
এই কবরস্থান ও স্মৃতিসৌধ শুধু মৃত মানুষের স্মৃতি বহন করে না; বরং ফিনল্যান্ডের ইতিহাসে তাতার মুসলিমদের অবদান, আত্মত্যাগ এবং দেশটির সমাজের সঙ্গে তাঁদের গভীর সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

একক তাতার সমাজ থেকে বহুজাতিক মুসলিম সম্প্রদায়:

১৯৮০-এর দশকের আগপর্যন্ত ফিনল্যান্ডের মুসলিম সমাজ বলতে মূলত তাতার মুসলিমদেরই বোঝানো হতো। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে ছোট একটি জনগোষ্ঠী, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে আসছিলেন।
কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। সোমালিয়া, ইরাক, মধ্যপ্রাচ্য, কুর্দিস্তান, আফগানিস্তান এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে মুসলমানরা ফিনল্যান্ডে আসতে শুরু করেন।
ফলে ফিনল্যান্ডের মুসলিম সমাজ আর শুধু তাতার জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। বিভিন্ন ভাষা, জাতিগোষ্ঠী ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মুসলমানদের আগমনে দেশটির মুসলিম সমাজ ক্রমশ বহুজাতিক হয়ে ওঠে। নতুন নতুন মসজিদ, ইসলামি কেন্দ্র এবং ধর্মীয় সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে। মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিধিও বিস্তৃত হয়।

এভাবে ভলগা অঞ্চলের কয়েকজন তাতার ব্যবসায়ীর আগমন দিয়ে যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর মুসলিম সমাজের ইতিহাসে রূপ নেয়। আজ ফিনল্যান্ডে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় একলক্ষের বেশী এবং মসজিদের সংখ্যাও ১০০ প্লাস।
বরফে ঢাকা ফিনল্যান্ডের মাটিতে ইসলামের এই পদচিহ্ন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ই নীরবে রচিত হয়। আর সেই নীরব ইতিহাসের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে মানুষের সংগ্রাম, আত্মপরিচয় এবং অবদানের অমূল্য সাক্ষ্য।

লেখক: আবু নাঈম মু শহীদুল্লাহ, ইউরোপ।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৬৭৮৯১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১