শেরশাহ সুরি পাঁচ বছরের শাসনকালে যে সড়ক গড়ে তুলেছিলেন, ইতিহাসে তা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে বিখ্যাত। সোনারগাঁও থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত সেই পথের ধারে ধারে বসেছিল সরাইখানা, কূপ ও ছায়াঘেরা গাছ। আজকের ভাষায় বললে, তিনি শুধু রাস্তা বানাননি, গড়ে তুলেছিলেন একটি সংযোগ অবকাঠামো, যা বাণিজ্য, ডাকব্যবস্থা ও ভ্রমণকে একসূত্রে বেঁধেছিল। পর্যটন অর্থনীতির প্রথম পাঠ তাই আমাদের মাটিতেই লেখা আছে: পথ যত নিরাপদ ও আতিথ্যময়, অর্থনীতি তত গতিশীল।
ইতিহাস বলে, ভ্রমণ আমাদের পুরোনো সম্পদ
চতুর্দশ শতকে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা সোনারগাঁও হয়ে সিলেটে পৌঁছেছিলেন সুফি সাধক শাহজালালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তিনি লিখেছিলেন, বাংলায় জিনিসপত্র সস্তা ও প্রাচুর্য অপরিসীম, তবু একে তিনি বলেছিলেন প্রাচুর্যে ভরা নরক। অর্থাৎ ভোক্তা ও পথিকের চোখে সেদিনও বাংলা ছিল সম্পদশালী, কিন্তু পথের কষ্ট ছিল বাস্তব। পঞ্চদশ শতকে চীনা দূত মা হুয়ান ও ফেই সিন বাংলার বন্দর, বস্ত্র ও বাজারের বিবরণ রেখে গেছেন। ইলিয়াস শাহি ও হোসেন শাহি আমলে গৌড় ও পাণ্ডুয়ার স্থাপত্য, আদিনা মসজিদ, ছোট সোনা মসজিদ বা সোনারগাঁওয়ের পানাম নগর সেই সমৃদ্ধির সাক্ষী। মুঘল আমলে সুবাহ বাংলার রাজধানী ঢাকায় বিদেশি বণিক, মসলিনের ক্রেতা আর ইউরোপীয় পর্যটকের ভিড় ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। এই ঐতিহ্যকে আজ আমরা বলি হেরিটেজ ট্যুরিজম বা ঐতিহ্য পর্যটন।
মসলিন: যে পণ্য ছিল গন্তব্যের ব্র্যান্ড
ঢাকাই মসলিনের কথা ভাবুন। একে বলা হতো বোনা বাতাস। এত সূক্ষ্ম যে একটি পুরো শাড়ি আংটির ভেতর দিয়ে গলে যেত বলে লোককথায় প্রচলিত। সেই মসলিন ঘিরে রোম থেকে পারস্য পর্যন্ত যে বাণিজ্য গড়ে উঠেছিল, আধুনিক পরিভাষায় তা ছিল রপ্তানিমুখী মূল্যশৃঙ্খল। কারিগর, সুতাকাটুনি, নৌকাচালক, দালাল ও বণিক, সবাই এই শৃঙ্খলের অংশ ছিলেন। ২০১৩ সালে ঢাকাই জামদানি ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে, আর ইউনেসকো ২০১৪ সালে জামদানি বয়নশিল্পকে অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান দিয়েছে। এই পণ্যকে যদি আমরা কারখানা পরিদর্শন, তাঁতপল্লি ভ্রমণ ও কারিগরের সঙ্গে সরাসরি অভিজ্ঞতার অংশ করে তুলি, তবে পণ্য আর গন্তব্য একসঙ্গে বিক্রি হবে।
অভিজ্ঞতার অর্থনীতি ও সাহিত্যের আরশিনগর
পর্যটনবিদ্যায় এখন সবচেয়ে বহুল আলোচিত ধারণা এক্সপেরিয়েন্স ইকোনমি। জোসেফ পাইন ও জেমস গিলমোর দেখিয়েছেন, আধুনিক ভোক্তা পণ্য নয়, স্মরণীয় অভিজ্ঞতার মূল্য দেন। এখানে আমাদের হাতে আছে অফুরন্ত পুঁজি। লালন গেয়েছিলেন, বাড়ির কাছে আরশিনগর আছে, সেথায় এক পড়শি বসত করে। সেই আরশিনগরই আসলে আমাদের গ্রাম, আমাদের হাওর, আমাদের নদীপথ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, দেশ দেখা হয়নি, ঘর থেকে দুই পা ফেলে একটি ধানের শিষের ওপর একটি শিশিরবিন্দু দেখা হয়নি। জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, বাংলার মুখ দেখে তিনি পৃথিবীর রূপ খুঁজতে যান না। দুই কবির কথাই আসলে একই বার্তা দেয়: আমাদের আকর্ষণ আমাদের ঘরের কাছেই।
গুণক প্রভাব ও ক্ষরণের হিসাব
অর্থনীতিবিদেরা বলেন, পর্যটকের এক টাকা খরচ অর্থনীতিতে কয়েক গুণ প্রভাব ফেলে। একে বলা হয় গুণক প্রভাব বা মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট। হোটেলের টাকা যায় মাছচাষি, সবজি উৎপাদক, রিকশাচালক ও কারিগরের হাতে। সুন্দরবনসংলগ্ন ১৫টি রিসোর্টে ১৫৩ জন কর্মীর ১৩৫ জনই স্থানীয়, প্রায় ৮৮ শতাংশ, আর ৫৮টি ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এটি গুণক প্রভাবের জীবন্ত উদাহরণ।
কিন্তু এর উল্টো পিঠ হলো ক্ষরণ বা লিকেজ। খাবার, আসবাব, এমনকি কর্মী যদি বাইরে থেকে আসে, তবে মুনাফা গ্রামে না থেকে শহরে বা বিদেশে চলে যায়। আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের অনেক অল ইনক্লুসিভ রিসোর্টের বিরুদ্ধে ঠিক এই অভিযোগই উঠেছে। তাই নীতির মূল মাপকাঠি হওয়া উচিত, পর্যটকের প্রতিটি টাকার কত অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে থেকে যাচ্ছে।
বিদেশের আয়নায় আমাদের পথ
জাপানের ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট আন্দোলন দেখিয়েছে, প্রতিটি জনপদ একটি স্বাক্ষর পণ্য নিয়ে গর্ব করলে গ্রামই হয়ে ওঠে গন্তব্য। ভুটান সীমিত পর্যটক ও উচ্চমূল্য নীতির মাধ্যমে প্রতি রাতের জন্য টেকসই উন্নয়ন ফি নেয়। এই নীতির নাম হাই ভ্যালু লো ভলিউম। কোস্টারিকা বনসংরক্ষণকারীদের পরিবেশ সেবার মূল্য দেয়, ফলে ইকোট্যুরিজম সেখানে জাতীয় ব্র্যান্ড। রুয়ান্ডা গরিলা পর্যটনের পারমিট আয়ের একটি অংশ আশপাশের সম্প্রদায়ের উন্নয়নে ব্যয় করে। কেরালার রেসপনসিবল ট্যুরিজম মিশন স্থানীয় কৃষক ও নারী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে হোটেল শিল্পকে যুক্ত করেছে। স্পেনের কামিনো দে সান্তিয়াগো তীর্থপথ প্রমাণ করেছে, একটি পুরোনো পথও শত শত গ্রামের জীবিকার ভিত্তি হতে পারে। আমাদের জন্য শেরশাহের পথ, লালনের আখড়া বা সুন্দরবনের নদীপথ হতে পারে তেমনই এক সাংস্কৃতিক করিডর।
সুন্দরবন: ধারণক্ষমতার সীমানা মানতেই হবে
ইউনেসকো ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। এই বনে জীবিকা খুঁজে নেন জেলে, মৌয়াল, গোলপাতা সংগ্রহকারী ও কাঁকড়া আহরণকারীরা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও কালীগঞ্জের মানুষ এই সম্পর্কটা ভালো জানে। তাই এখানে অপরিহার্য ক্যারিং ক্যাপাসিটি বা ধারণক্ষমতার বিজ্ঞানসম্মত নির্ধারণ। দিনে কত নৌযান ঢুকবে, কোথায় রাত কাটবে, বর্জ্য কোথায় যাবে, তা আগেই ঠিক হতে হবে। অতিপর্যটন বা ওভারট্যুরিজমের কুফল দেখা গেছে ভেনিস ও বার্সেলোনায়, যেখানে বাসিন্দারাই নিজেদের শহরে অসহায় হয়ে পড়ছেন। মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ভ্রমণ কুসংস্কার ও সংকীর্ণতার প্রাণঘাতী শত্রু। কিন্তু সেই ভ্রমণ যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়, তবে সে নিজেই গন্তব্যের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।
সাধারণ মানুষের পর্যটন: কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম
পর্যটন যদি শুধু বড় বিনিয়োগকারীর হাতে যায়, তবে গ্রাম থাকবে দর্শক। কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজমে স্থানীয় মানুষই হোমস্টের মালিক, গাইড, রাঁধুনি ও কারিগর। এতে আয়ের পাশাপাশি সংস্কৃতি রক্ষার দায়ও স্থানীয়দের হাতে থাকে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি আত্মনির্ভরতার পথ। গ্রামের নারী যখন নিজের রান্না, নকশিকাঁথা ও লোকগান দিয়ে পর্যটকের মন জয় করেন, তখন তিনি শুধু উদ্যোক্তা নন, সংস্কৃতির দূতও।
কয়েকটি প্রস্তাব
প্রথমত, শেরশাহি পথ ধরে একটি হেরিটেজ করিডর, যেখানে সোনারগাঁও, পানাম নগর ও পুরোনো সরাইগুলোকে একটি ভ্রমণসূত্রে বাঁধা যায়। দ্বিতীয়ত, জামদানি ও নকশিকাঁথার তাঁতপল্লিতে কারিগর সফর। তৃতীয়ত, সুন্দরবনে কনজারভেশন ফি, যার হিসাব প্রকাশ্যে থাকবে। চতুর্থত, প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রে স্থানীয় পণ্যের স্থায়ী বাজার। পঞ্চমত, গ্রাম পর্যটন পাসপোর্ট, যেখানে পর্যটক প্রতিটি গ্রামের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করবেন। ষষ্ঠত, পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে আতিথেয়তা ও ইকোট্যুরিজমের সনদভিত্তিক প্রশিক্ষণ।
শেষ কথা
ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, যে জনপদ পথিককে সম্মান করে, সে জনপদ সমৃদ্ধ হয়। শেরশাহের সরাইখানা থেকে আজকের হোমস্টে, মসলিনের তাঁত থেকে ডিজিটাল বুকিং, একই সূত্রে গাঁথা এই যাত্রা। জীবনানন্দ বলেছিলেন, আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়। পর্যটক যেন সেই টানেই বারবার ফিরে আসেন, আর প্রতিবার ফেরার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের ঘরে একটু বেশি আলো জ্বলে ওঠে।
লেখক: মো: মামুন হাসান,বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।